ঐক্যে নিহিত অনৈক্যের দ্বন্দ্বে-সংকটে বিএনপি

  আহমদ রফিক

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

কিছুদিন আগে বিএনপি তাদের রাজনৈতিক শক্তির বিস্তার ঘটাতে ড. কামাল হোসেন ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি. চৌধুরী) সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যজোট গঠন করে। ঠিক তখনই একাধিক কাগজে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয় কলামে লিখেছিলাম এর অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব ও বাধা-বিপত্তিগুলোর কথা। এটা ছিল মূলত নির্বাচনী ঐক্য, যদিও বিএনপির মনোগহনের লক্ষ্য ছিল একে পুরোপুরি রাজনৈতিক ঐক্যজোটে পরিণত করা, যাতে ক্ষমতাসীন সরকারি দল থেকে আসা ধাক্কাটি সবাই মিলে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে পারে।

বিএনপির এ উদ্দেশ্যটি ড. কামাল হোসেন ও ডা. বি. চৌধুরীর মতো বুদ্ধিমানদের না বোঝার কথা নয়। তারা বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী স্বার্থের ঐক্যে যতটা সোচ্চার হোন না কেন, রাজপথে, মাঠে-ময়দানে বিএনপির জনসংহতির পক্ষে এ ক্ষেত্রে বাস্তবে কতটা সহায়ক হবেন তা নিঃসন্দেহে প্রশ্নসাপেক্ষ এবং এটা রাজনৈতিক বাস্তবতা।

কারণ সাম্প্রতিক ঐক্যজোটের চরিত্রটি ইস্যুভিত্তিতে গঠিত। ইস্যুর প্রয়োজন অবসানে প্রকৃত ঐক্যের বাস্তব অবসান, বহিরঙ্গে যদি বা তা থাকেও, তা একে অন্যের পরিপূরক শক্তি নয়। প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব জনপ্রিয়তার হিসাব-নিকাশ। বিএনপিও এটা বোধহয় ভালো করেই জানে। তাই ধানের শীষের সমৃদ্ধি ঘটাতে ধানগাছের গোড়ায় সার দিয়ে মাটিকে উর্বর করার পুরোটাই তাদের নিজস্ব দায়-দায়িত্ব।

কিন্তু সেখানে তাদের জন্য নানা সমস্যার কাঁটা তীক্ষ্ম হয়ে আছে তাদের বিভ্রান্তিকর অতীত রাজনীতির কারণে। যেমন নির্বাচনী সংলাপে তাদের তৎকালীন নেতিবাচক ভূমিকা, ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটানোর মাঠপ্রক্রিয়ায় জনভোগান্তির জ্বালাও-পোড়াও কর্মকা-, হরতাল বৈনাশিক তৎপরতা, পেট্রলবোমায় আক্রান্ত নিরীহ মানুষের দগ্ধ যন্ত্রণার আর্তনাদ ইত্যাদি। সর্বোপরি জামায়াত-আঁতাত।

সবকিছু মিলিয়ে বিএনপি ‘ভাবমূর্তির সংকটে’ আক্রান্ত। সে সংকট একদিকে সাংগঠনিক, অন্যদিকে ক্ষমতা লাভের পথে অগ্রসর হওয়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নের কর্মকা-ভিত্তিক। কিন্তু এ সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক পাথর ছড়ানো, ক্ষেত্রবিশেষে তাতে রয়েছে কাঁটারও চরিত্র। অঙ্গে রয়েছে দলীয় রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সংকটও। যেমন একুশে আগস্টের (২০০৪) গ্রেনেড হামলাসংক্রান্ত মামলার রায়।

এ রায় আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক অঙ্গনে কয়েক পা এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে এবং তা নির্বাচনী ইস্যুটির পালে কিছুটা সুবাতাস লাগাতেও পারে, বলা চলে সহানুভূতির সুবাতাস। অতি বিচক্ষণদের আলোচনায় এমন ইঙ্গিত মিলছে যে, রায় প্রকাশের সময়ক্ষণ কাকতালীয় নাও হতে পারে। হতে পারে হিসাব-নিকাশের পরিণাম।

সেসব আলোচনা বা তর্ক-বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, এ রায়ের দুই বিপরীত দিকÑ একের জন্য সুসংবাদ, অন্যের জন্য দুঃসংবাদ। শেষোক্তের জন্য তা শুধু দলীয় সাংগঠনিক নেতিবাচক প্রভাবই নয়, বর্তমান পথচলায় এক ধরনের সাময়িক আঘাতও বটে এবং তা নির্বাচনকে একেবারে সামনে রেখে। সত্যি বলতে কী রাজনৈতিক বিচারে বিএনপি এখন মহাসংকটে।

সংকটের আদিকারণ অবশ্য তাদের হাতেই তৈরি। নির্বাচনী গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পরিবারতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা যে মাঝেমধ্যে অঘটনের কারণ হতে পারে, সুশাসন ব্যাহত করতে পারে, ত্রিধাবিভক্ত ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি তেমন একাধিক উদাহরণের জন্ম দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাদ পড়ে না ভারতীয় গণতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা।

তবে বাংলাদেশে তার চরম প্রকাশ দেখা গেছে নতুন সহস্রাব্দে বিএনপি আমলের দ্বৈত শাসনে। সন্তানস্নেহে দ্বিতীয়বার অন্ধ কুরুক্ষেত্রের বৃদ্ধ নায়করাজের মতোই বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া একই রকম ভূমিকা পালন করেছেন। ওই বৃদ্ধ রাজার মতো রাজনৈতিক দিক বিচারে সন্তানকে শাসন করতে পারেননি। তার ভূমিকায় দূরদৃষ্টির পরিচয় ছিল না।

তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় মূল ঘটক হাওয়া ভবনের নায়ক তারেক রহমানের কী দাপট! দলে এবং ক্ষমতাসীনদের মধ্যে একটি বড়সড় অংশ, বিশেষত তরুণ ও যুবকরাই প্রকৃত শাসক এবং দল পরিচালনায় নায়ক। জোট ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা, এমনকি প্রবীণ উপদেষ্টারাও নীরব, পাছে ক্ষমতার বলয় থেকে সরে যেতে হয়। চরম এ নৈরাজ্যিক অবস্থার সমালোচনা তখন নিঃশব্দে মানুষের মুখে মুখে। তারা ভীত, বিরোধী দলেও একই অবস্থা।

শাসকব্যবস্থার এ পর্বটি ছিল চরম দুর্নীতিপরায়ণ, তেমনি সন্ত্রাসবাদী চরিত্রের। তখনকার জনমনের স্মৃতি এবং সংবাদপত্রের কিছু সংবাদ ও প্রতিবেদনে তেমন প্রমাণ মিলবে। জনগণ এ দুঃসহ পরিস্থিতির জবাব দিয়েছিল ভোটের মাধ্যমে এবং রাজনীতির বিচিত্র ঘটনায় ছিল তার প্রতিফলন। অন্তত প্রকাশ্যে সন্ত্রাসমূলক গ্রেনেড হামলার সুবিচার যদি তখন হতো, তা হলে আজ বিএনপিকে সে দায় বহন করতে হতো না, দুর্নীতির দায়ে দলীয় প্রধানকে কারাগারে যেতে হতো না। কিন্তু বিএনপির দলীয় প্রধানের পক্ষে সুশাসন প্রবর্তন যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি ওই সন্ত্রাসী হামলার সুবিচার করাও ছিল অসম্ভব। তাই ঘটনা আপন নিয়মে ঘটে চলেছে তাৎক্ষণিক ক্ষমতার দাপটে, পরবর্তী সময়ের নেতিবাচক পরিস্থিতিতে, সমস্যা সংকটের জটিলতায়। তখনো রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের সঠিক পথ ধরে চলতে শেখায়নি, অর্থাৎ তারা শেখেননি। আশ্চর্য যে, দলের সব শীর্ষ নেতাই স্থবির ভূমিকায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিএনপি তাদের সেই নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এখনো তারা সে অপরাজনীতিকে ভুল বা অন্যায় বলে স্বীকার করেন না।

আমার বিবেচনায় এটাই বিএনপির রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট। সংকট অপ্রিয় সত্যকে না মানা। গ্রেনেড মামলার রায় প্রত্যাখ্যানে সে সত্যকে অস্বীকার করা হয়েছে, দলের মহাসচিব ও কারো কারো বক্তব্যে। সরকারের মধ্যে সরকার প্রতিষ্ঠা ও তার কৃতকর্মের দায় বরং তারা অস্বীকার করতে পারতেন (খালেদা জিয়া না করলেও; তিনি অবশ্য নীরব)।

দুই

এ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের কারো কারো কাছে প্রত্যাশিত ছিল। ছিল বিচক্ষণ উপদেষ্টা কারো কারো কাছ থেকেও। কিন্তু তাদের কেউ সত্য স্বীকারের সৎ সাহস দেখাতে পারেননি। বরং জনগণ প্রত্যাখ্যাত যুবরাজের পক্ষই সমর্থন করে গেছেন, বিচারের রায়ে তার শাস্তি প্রদান প্রসঙ্গে। অথচ তৎকালীন জ্যেষ্ঠ নেতারা তো হাওয়া ভবনের অপকর্মের কথা বাইরে থেকে হলেও জানতেন, অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা যদি বা নাও জানতেন। রাজনীতির এজাতীয় অনাচার কোনো বিচারে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

বিএনপির রাজনীতির এ পরিণাম-সংকটে সদ্য গঠিত জোট মিত্রদের প্রতিক্রিয়া স্বভাবতই রাজনীতিমনস্ক ব্যক্তিদের জন্য কৌতূহলের বিষয়। এ ব্যাপারে সাবেক বিএনপি নেতা বি. চৌধুরীর প্রতিক্রিয়াও জানার মতো। কিংবা প্রবীণ আইনজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের বক্তব্য? কিন্তু বিএনপির এ সংকট সামনে রেখে তারা পাওনাসম্ভাব্য সম্ভাবনা নিয়ে দরদস্তুর করে চলেছেন, বিশেষ করে বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা।

দিনকয় আগে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তারা, বিশেষ করে বিএনপি নির্বাচন সামনে রেখে তাদের নির্বাচনবিষয়ক দাবি-দাওয়া আদায়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছিল। এ বিষয়ে কর্মসূচি তৈরির বৈঠকে দেখা গেল লোভের-লাভের প্রত্যাশা নিয়ে টানাপড়েনÑ কর্মসূচি প্রণয়নের বৈঠক স্থগিত হয়ে গেল। এর মূল দায় বিকল্পধারার। তর্ক-বিতর্ক মূলত জেএসডির নেতা রবের সঙ্গে। কী করবেন এখন মান্না। বড় অসহায় দেখাচ্ছে তাকে। বিব্রত ড. কামাল হোসেন।

এ ব্যাপারে আমাদের পূর্বোক্ত সতর্কবাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব ও নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি নিয়ে টানাপড়েনের সম্ভাবনার কথা। এখন শেষোক্ত বিষয়টি নিয়েই চলছে অবাস্তব দাবি ও তাতে গ্রহণ-পরিত্যাগের জটিলতার প্রকাশ। বিকল্পধারা কি ভেবে দেখেছে, তাদের জনসমর্থনের পাল্লা কতটা ভারী? আর সে হিসাবে কতটা আসন তাদের প্রাপ্য? কিন্তু মহা-অযৌক্তিক দাবি তাদের।

অন্যদিকে জোট একাংশের এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত যে, এতগুলো শরিক দলের আসন ভাগাভাগির বিতর্কটি এ মুহূর্তের নয়। দাবি-দাওয়াসংক্রান্ত কার্যক্রম শেষে পরিস্থিতি বিচারে হিসাব-নিকাশটির তখনকার জন্যই তুলে রাখা। আমাদের রাজনীতির বড় সমস্যা হলো তাদের অনেকেই বাস্তব অবস্থার হিসাবটা মেনে নিতে চায় না, বাস করে প্রাপ্তির এক কল্পজগতে।

উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে প্রধান নেতৃত্ব নিয়ে ড. কামাল হোসেন ও ডা. বি. চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। বিকল্পধারা সমস্যা তৈরি করেছে আসন বণ্টন ও ক্ষমতার ভারসাম্যেÑ এ শব্দ দুটোর ওপর অস্বাভাবিক মাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করে এবং তাৎক্ষণিক ফয়সালার দাবি তুলে। যৌথ কর্মসূচির ঘোষণাপত্রই যেখানে তৈরি হয়নি সেখানে পিঠা ভাগের বিষয় তৈরি করেছে সমস্যা।

বহুদলীয় জোটে এ জাতীয় সমস্যা নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বে এ দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে এ সমস্যা বহুলদৃষ্ট। একমাত্র বাস্তবতাবোধ ও যুক্তির প্রাধান্যই সমস্যা মেটাতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ বিষয়টির বড় অভাব। সত্য দর্শন ও সত্য গ্রহণের অভাব বড় প্রকট।

বিএনপি জোটের সম্ভাব্য আন্দোলন ও দাবি-দাওয়া নিয়ে আওয়ামী লীগ শিবিরে যে শঙ্কা ও অস্বস্তি দেখা গিয়েছিল তার বিপরীতে আদালতের রায় ও বিএনপি জোটের কোন্দল সম্ভবত আওয়ামী লীগকে স্বস্তি দিয়ে থাকবে।

এখন দেখার বিষয় বিএনপি তার দুই ফ্রন্টের সংকট কীভাবে মোকাবিলা করে এবং সামাল দেয়। শক্তি বাড়াতে গিয়ে সমস্যা-সংকট আমদানি কতটা যুক্তিযুক্ত তা বিএনপির জন্য ভেবে দেখার মতো। বিপরীতে আত্মশক্তির ওপর নির্ভরতার দিকটি বিবেচনার যোগ্য। তাৎক্ষণিক ভবিষ্যৎ সময় বলবে, এ বিতর্কের পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

য় আহমদ রফিক : কবি, প্রাবন্ধিক, রবীন্দ্রগবেষক ও ভাষাসংগ্রামী

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে