ডিজিটাল রূপান্তর এবং স্বপ্নকাতর তরুণ প্রজন্ম

  ড. আতিউর রহমান

১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:১৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত কদিন ধরেই প্রযুক্তি, শিক্ষা, উদ্ভাবন ও তারণ্য বিষয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইংলিশ অলিম্পিয়াড’ আয়োজিত আন্তর্জাতিক কর্মশালায় এক হাজারেরও বেশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা অংশগ্রহণ করেছিল।

তরুণদের এই সংগঠনটি মাতৃভাষার পাশাপাশি বিশ্ব যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষা শেখার দক্ষতা অর্জনের জন্য দারুণ সব কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের সমাবেশ ছাড়াও তারা ঢাকায় জাতীয় সম্মেলনেরও আয়োজন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই সংগঠনের পক্ষ থেকে ‘অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ দিয়ে তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া তাদের রয়েছে শক্তিশালী অনলাইন মঞ্চ। সারাবিশ্বের পঁয়ত্রিশটি দেশে রয়েছে তাদের গুণগ্রাহী ও সদস্য। অচিরেই তারা বিদেশেও এ ধরনের সম্মেলন করতে যাচ্ছে। আমি সুযোগ পেলেই এই তরুণদের উজ্জীবিত করতে এগিয়ে যাই। আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য স্মার্ট নেতৃত্ব তৈরির এই উদ্যোগকে মনেপ্রাণেই উৎসাহ দিয়ে থাকি।

আমার মনে পড়ে, আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগে এক ফ্লাইটে কানাডার টরেন্টো যাওয়ার পথে প্লেইনভর্তি চৈনিক কিশোর-বিশোরীদের কিচিরমিচির শুনছিলাম। তারা সবাই মূলত ইংরেজি শেখার জন্য পশ্চিমে যাচ্ছিল। এই তরুণরাই আজকের গতিময় চীনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। চমৎকার তাদের ইংরেজি বলা ও লেখার সক্ষমতা। অন্যতম এক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটছে চীনের। ইংরেজি জানা কূটনীতিক ও নানা পর্যায়ের দক্ষ ও চৌকস নেতৃত্ব বিকাশে কত আগে থেকেই না তারা তৎপর ছিলেন।

আরেকটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম বসুন্ধরা কনভেনশন হলে। ‘দি ইয়ং’ আয়োজিত তরুণ উদ্যোক্তাদের এক সম্মেলনের উদ্বোধন করার সময় লক্ষ করলাম প্রায় ৬শ তরুণ অংশগ্রহণকারীর উৎসাহ ও উদ্দীপনা। এদের শতকরা আশি ভাগই আগামী দিনের উদ্যোক্তা। বাদবাকি ২০ শতাংশ বর্তমানে উদ্যোক্তা হিসেবে সক্রিয়। খুব ভালো লাগল যখন একাধিক পড়–য়া তরুণ প্রশ্ন তুলল ট্রেড লাইসেন্স, অর্থায়ন, বাজারজাতকরণ, রপ্তানিবিষয়ক জটিলতা কী করে দূর করা সম্ভব। ডিজিটাল এই যুগে সারাবিশ্বের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে হলে কী ধরনের দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয় সে প্রশ্নটিও ছিল আগ্রহোদ্দীপক। আমার উত্তর ছিল আরও ডিজিটালাইজেশন। আর সর্বদাই ‘লেগে থাকো।’

এর পরের অনুষ্ঠানটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার হলে। শপাঁচেক তরুণ প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে আমার কথা শুনল। নানা প্রশ্নে আমাকে ব্যস্ত রেখেছিল। এই তরুণদের সংগঠনের নাম ‘ড্রিম ডিভাইজার’। স্বপ্ন দেখা ও দেখানোই তাদের মূল কাজ। তারা নেতিবাচক কোনো কিছু সমর্থন করে না। সর্বক্ষণ ইতিবাচক কথা বলে। তাদের অনলাইন সাইটের নাম ‘স্বপ্ন সন্দেশ’। তাদের পোর্টালের সবকটি বিভাগ ‘স’ দিয়েই শুরু।

স্বচ্ছতা, সততা, সম্ভাবনাসহ এমন ডজন ডজন বিষয় তারা সুশিক্ষার প্রসারে বেছে নিয়েছে। তারাও প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে তরুণদের সদাই স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাখতে ব্যস্ত। আমি তাদের ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ বলে সম্বোধন করে আমার মূল বক্তৃতা শুরু করেছিলাম। স্বপ্নের নানামাত্রিক আলাপ-আলোচনায় ওইদিনের সন্ধ্যাটি হয়ে উঠেছিল আসলেই স্বপ্নময়। এর মাঝখানে গিয়েছিলাম সাভারে বাংলাদেশ জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। দেশের সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তারা (সচিব, সিনিয়র সচিব, মুখ্যসচিব, ক্যাবিনেট সচিব) সেদিন সমবেত হয়েছিলেন ‘চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়টি নিয়ে আলাপ করার জন্য।

আমি এ বিষয়ে একজন প্যানেলিস্ট হিসেবে প্রশাসনে ডিজিটাল রূপান্তর তথাপ্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তনের কিছু দিক তুলে ধরেছিলাম। দেখে ভালো লাগল, আমাদের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও প্রযুক্তির ব্যবহারে যথেষ্ট উৎসাহী। জনগণকে গণসেবা প্রদানে তরুণ কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিনির্ভরতা তারা বেশ ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। ক্যাবিনেট সচিব তো বলেই বসলেন, এখন আর আগের মতো সরকারি কর্মকর্তারা ‘না’ বলে নথির সূত্রপাত করেন না। মাঠ প্রশাসন সমসাময়িক সামাজিক মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে স্বচ্ছ ও দ্রুত সেবা প্রদানের নয়া নয়া উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বলে তিনি জানালেন। অন্য কর্মকর্তারাও তাদের প্রশ্ন ও মন্তব্যে দিনবদলের চলমান ধারার কথাই বললেন।

ওপরে অতিসম্প্রতি যে চারটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি সেগুলোতে প্রায় একটিই ভাবনা নানা আঙ্গিকে উচ্চারিত হয়েছে। আর তা হলো ডিজিটাল এই যুগে শিক্ষা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কী করে তরুণদের উদ্যোক্তা বানানো যায় এবং তারা যেন উপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে পারে সে রকম একটি আশার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। নিঃসন্দেহে শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারেই স্বদেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। চাই মূল্যবোধসম্পন্ন ভালো মানুষ গড়ার শিক্ষা। আর সে জন্য দুই শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার কথা স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়।

আজীবন গণমানুষের পাশে থাকা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মাতৃভাষার মর্যাদা, বিজ্ঞানমনস্কতা, উদার সংস্কৃতি বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে দেখেছেন। তাই ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শিক্ষা আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আইনিবলে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন, সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে উদারনৈতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনাকে অন্তরে ধারণ করতেন। রবীন্দ্রনাথ বরাবরই শিক্ষাকে জীবনের খাদ্য হিসেবে দেখতেন। তার কাছে বৃহত্তর মানবসমাজই ছিল মানুষ গড়ার বড় পাঠক্রম। তিনি চাইতেন প্রাণস্পর্শী শিক্ষা, মনুষ্যত্ববোধ ও হৃদয়বৃত্তিচর্চার শিক্ষা। নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও ভালোবাসাচর্চার শিক্ষা। তিনি মনে করতেন, ‘শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যায় নয়, তার সম্পূর্ণতায়, তার প্রবলতায়।’ তার মতে, ‘ভাবের পণ্য বোঝাই করাই শিক্ষার কাজ।

প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চাপে চাপা পড়ে যাওয়া শিক্ষিত মানুষ কারো জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না।’ তিনি আরও ভাবতেন, ‘আমরা কী হইব এবং কী শিখিব এই দুটি কথা একেবারে গায়ে গায়ে সংলগ্ন। পাত্র যত বড় জল তাহার চেয়ে বেশি ধরে না।’ আর সে কারণেই রবীন্দ্রনাথ শিক্ষার মাধ্যমে আশা করার ক্ষেত্রকে বড় করার পক্ষে ছিলেন। বিজ্ঞানচর্চার ওপরও তিনি খুব গুরুত্ব দিতেন। সবার মাঝে প্রযুক্তির প্রসারে তিনি সবার জন্য বিজলি বাতি চাইতেন। বিজ্ঞানী জগদীশ বসু, সত্যেন বসুর সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক। তাদের বিজ্ঞানভাবনাকে সাহিত্যের অঙ্গনে এনে তিনি তা সর্বজনীন করার চেষ্টা করেছেন।

তাই আজকের বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাভাবনার ঐতিহ্য মাথায় রেখে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে উদ্যোগী হতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, চলমান পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে ডিজিটাল প্রযুক্তি এরই মধ্যে তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। আর তরুণরাই এখন উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা হিসেবে এই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে তারা ই-কমার্সের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে।

তবে এখনো এই খাতের আইনি কাঠামো, অর্থায়ন, বাজারজাতকরণ, পণ্য ও সেবার মান সংরক্ষণের বিষয়গুলো মিলে উপযুক্ত বিনিয়োগ ও ব্যবসায়ী ‘ইকোলজি’ বা প্রতিবেশ গড়ে তোলা অনেকটাই বাকি। ই-কমার্স ছাড়াও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের গুণে অর্থনীতি ও সমাজের ব্যাপক রূপান্তর ঘটে চলেছে। সব মিলেই সমাজে ডিজিটাল সংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নও ঘটছে। তবে এখনো আমাদের অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।

বিশেষ করে আমরা উদ্ভাবনের কথা খুব বলছি, নয়া নয়া ধারণাও তুলে ধরছি, সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বাজেট থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থও খরচ করছে। তার পরও ব্যাটে-বলে কেন জানি সেভাবে মিলছে না। বাস্তবে দক্ষ ডিজিটাল উদ্যোক্তা সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। আর এখানেই আমাদের শিক্ষালয়ে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিষয়টি যুক্ত করা খুব জরুরি হয়ে পড়ছে। আমাদের প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক থেকে বের হওয়া স্নাতকের পরিমাণ মোট স্নাতকের ১৪ শতাংশ। এক যুগ আগেও ছিল তা দুই শতাংশ। কিন্তু এরা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তেমন করে পাচ্ছে না। এদের ভেতর থেকে সফল উদ্যোক্তা বের করে আনা এখনো বেশ চ্যলেঞ্জিং।

অথচ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শেষ বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের নয়া নয়া বিষয়ের ওপর উদ্ভাবনীমূলক প্রকল্প জমা দিতে হয়। চার বছর ধরে প্রযুক্তি জ্ঞান আহরণ শেষে তারা বেশ সম্ভাবনামূলক প্রকল্প পেশ করে। এসব প্রকল্পের মাত্র দশ শতাংশও যদি বাস্তবে বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ পেত তা হলে অনেক নয়া উদ্যোক্তা সৃষ্টি হতে পারত।

তবে আশার কথা বিদেশি টেলিফোন কোম্পানি ও ব্যাংকসহ বেশ কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান তাদের সামাজিক দায় থেকে এ ধরনের উদ্ভাবনীমূলক প্রকল্পের জন্য পুরস্কার হিসেবে ‘সিডমানি’ দিচ্ছে। সেই অর্থ দিয়ে তারা নয়া উদ্ভাবনকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এ ধরনের সামাজিক দায়ভিত্তিক সমর্থন আরও বেশি মাত্রায় বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ইনোভেশন ল্যাব’ গড়ে তোলা উচিত।

সরকারের উন্নয়ন ও গবেষণা তহবিল থেকে এ ধরনের কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। ‘রবি’র ম্যানেজার শান্তর কাছ থেকে জানতে পেরেছি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে (চুয়েট) সরকার এরই মধ্যে এ ধরনের একটি উদ্ভাবনকেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য দু’শ কোটি টাকা দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় অনুষদেও অনুরূপ একটি ‘ইনোভেশন ল্যাব’ গড়ে তোলার জন্য ইতোমধ্যে সিন্ডিকেট অনুমোদন দিয়েছে। কোরীয় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘কোইকা’ এই কেন্দ্রটিকে আর্থিক ও কারিগরি সমর্থন দিয়ে গড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।

এ দুটো ছাড়া শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবনমূলক অনেক গবেষণা হচ্ছে। তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বিকশিত হওয়ার অনেক ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। তরুণ শিক্ষক ও উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা মিলে সম্ভাবনাময় অনেক প্রকল্প প্রণয়ন ও রূপায়ণ করছে। উদাহরণ হিসেবে, বুয়েটের রসায়ন প্রকৌশল বিভাগের একজন সহকারী শিক্ষক মহিদুল খান ও তার ছাত্রদের একটি কিডনি সমস্যা সমাধানে কাগজভিত্তিক ‘ইউরিক অ্যাসিড’ চেক করার প্রকল্পের কথা বলা যায়। তারা এমন একটি ‘টুলকিট’ তৈরি করেছে যা ব্যবহার করে মাত্র পাঁচ টাকা খরচ করেই ঘরে বসে কোনো রোগী তার কিডনি সমস্যা কতটা প্রকট তা বোঝার জন্য কাগজ দিয়েই তার প্রস্রাবের ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বিপদসীমার কাছাকাছি কিনা তা বুঝতে পারবেন।

এর সঙ্গে স্মার্ট মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ যুক্ত করলে এই তথ্য যে কোনো দেশে বা বিদেশে বিশেষজ্ঞদেরও মেইল করা যাবে। যে কোনো প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে এর জন্য খরচ হবে আড়াইশ টাকা। এখন দরকার এই প্রকল্পটির জন্য কপিরাইট, ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা। আর সে জন্যই দরকার হবে ‘ইনোভেশন ল্যাবে’র। শান্ত জানাল এমন আরেকটি আবিষ্কারের কথা। শান্তই জানাল, চোখের সামনে একটি ক্যামেরার মতো যন্ত্র ধরলেই রক্ত সংগ্রহ না করেই কোনো রোগীর ‘হিমোগ্লোবিন’ মাপা যাবে। এটিও একটি ভালো প্রকল্প। এখন একে বাণিজ্যিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত ‘ইনোভেশন ল্যাব’ থেকে উদ্যোগ নেওয়া গেলে এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমেই অনেক নয়া উদ্যোক্তা তৈরি করা সহজ হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তিসহায়ক পরিবেশ কাক্সিক্ষত গতিতে সক্ষমতা আনা না গেলেও ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা স্ব-উদ্যোগেই ডিজিটাল রূপান্তরে অংশগ্রহণ করছে। অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনচলার ধরন। কাজের ধরনও বদলে যাচ্ছে খুবই দ্রুত। পেশাগত কাজেও আসছে পরিবর্তন।

প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা সেভাবে বাড়াতে না পারলেও আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম কিন্তু বসে নেই। আমাদের লাখ লাখ তরুণ এখন অনলাইনে কর্মসংস্থান খুঁজে পেয়েছে। সারাবিশ্বের ইন্টারনেটভিত্তিক কর্মসংস্থানের ১৫ শতাংশই বাংলাদেশের তরুণদের দখলে। বেশিরভাগই ‘আউটসোর্সিং’ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ বছরের বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উৎপাদন খাতে দ্রুতই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। প্রযুক্তি পণ্য ও সেবার বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। সামাজিক অংশগ্রহণও বাড়ছে।

দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। সে কারণেই আমাদের শিক্ষালয়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রমে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তা না হলে প্রযুক্তি, বিশেষ করে ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ (এআই)-এর ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে তাতে অদক্ষ কর্মীর কাজের সুযোগ বরং কমবে। তাদের নতুন প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনরায় দক্ষ করে তোলা এবং শিক্ষালয় থেকে দক্ষ কর্মীর জোগান দেওয়ার চ্যালেঞ্জ আমাদের অবশ্য গ্রহণ করতে হবে। সে জন্য সরকারি বিনিয়োগকে পুনর্বিন্যাস করতেই হবে। এযাবৎ সামাজিক খাতে আমরা বেশ ভালো করেছি। এই ধারাকে বজায় রাখতে হলে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বাড়তি বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

এ প্রেক্ষাপটেই তরুণ প্রজন্মকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তাদের দক্ষ ও যোগ্য করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। তারাই আগামীর প্রতিনিধি। তারাই হবে ডিজিটাল উদ্যোক্তা। তারাই দেবে নেতৃত্ব। তারা হবে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন মানুষ। আমাদের প্রত্যাশা, ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে তারা সর্বদাই লেগে থাকবে। তাদের সব উদ্যোগ হবে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক। এক লাফে নয়, ধাপে ধাপে তারা বেড়ে উঠবে। তারা হবে ‘রেজিলিয়েন্ট’ বা সহিষ্ণু এবং ‘টিম-সেন্ট্রিক’ বা দলবদ্ধ।

আরও বড় হওয়ার আকাক্সক্ষা তাদের নিরন্তর তাড়া করে বেড়াবে। সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই তারা এগোবে। সে কারণেই তারা হবে নমনীয়, বৈচিত্র্যময় এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আগামী দিনে সেবা প্রদানকারীদের সর্বদাই জবাবদিহিতার জন্য নাগরিক তথা গ্রাহকদের আয়নার মতো বিবেচনা করতে হবে। সেই আয়নায় নিজেদের সেবার মান তাদের মনমতো হয়েছে কিনা তা দেখার চোখ তৈরি করতে হবে উদ্যোক্তাদের। তাই নয়া সময়ের নয়া উদ্যোক্তাদের সর্বদাই সামনের দিকে হাঁটতে হবে। আমাদের চোখ দুটো যে সামনে। তাই সম্মুখপানেই চাইতে হবে। এই নয়া চোখ তৈরিতে আমাদের শিক্ষালয়ের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষাকে জীবনের খাদ্য করাটা এতটা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ড. আতিউর রহমান : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ

[email protected]

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে