sara

ইয়েমেনে হত্যাকা- ও ঘুমন্ত বিশ্ববিবেক

  চিররঞ্জন সরকার

০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘নাহ্, কোনো কারণেই সৌদি আরবে মারণাস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা যাবে না, এটা করে অযথাই নিজেকে শাস্তি দেব নাকি? আমেরিকা না বেচলে পুতিন বা জিনপিং ঠিকই অস্ত্র বিক্রির সুযোগটা হাতিয়ে নেবে...’

সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে তুরস্কের সৌদি দূতাবাসের ভেতর খুন করে তার শরীর হাড্ডি কাটার করাত দিয়ে কেটে (তুরস্কের সরকারি ভাষ্যমতে) গুম করে ফেলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সৌদি আরবে আমেরিকার অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা হবে কিনা জানতে চাইলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেন তার সারমর্মটা মোটামুটি এ রকমই দাঁড়ায়।

আর এই কারণেই কখনো কখনো ট্রাম্পের কথা শুনলে আমার ভালোও লাগে। উনি যে রকম অনায়াসে তিলকে তাল করতে পারেন, ঠিক তেমনই আমেরিকার পেশাদার রাজনীতিকরা যে কথাগুলো মুখে বলার সাহস করেন না, সেগুলোও অনায়াসে বলে দিতে পারেন। তিন মিনিট পর সেই কথাটাই যে আবার উল্টে যাবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু মাঝে মাঝে অকাট্য সত্যিটা বলে যে দেন তাতেই এক ধরনের স্বস্তি হয়। অন্তত আজকের সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়নের ভিত্তি বা চালিকাশক্তিটা যে কী, সেটা নিয়ে রাখঢাকের চাদরটা খসে পড়ে!

এ জায়গায় বারাক ওবামা হলে কয়েকটি গালভরা আদর্শের কথা বলতেন। সৌদি আরবকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যায় সেটা নিয়ে সাতকাহন করে আমেরিকার ‘মহান’ বিদেশনীতির জয়গান করতেন, কয়েক মাস হয়তো হাই প্রোফাইল কিছু মিটিং বন্ধ রাখতেন, কংগ্রেসেও হয়তো একটা নামমাত্র বিল পাস করিয়ে নিতেন নিন্দা জানিয়ে। আমরাও আধুনিকোত্তর বিবেকের দংশন থেকে মুক্তি পেতাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প যা করছেন ওবামাও ঠিক তা-ই করতেন। তাদের সবচেয়ে কাছের মিত্র হিসেবে সৌদি আরবের কাছে আমেরিকার শত শত কোটি ডলারের আধুনিক অস্ত্র বিক্রিটা অব্যাহত রাখতেন। ট্রাম্প প্রায়ই এত সবের তোয়াক্কা করেন না। অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর কোনো কথা নেই, টাকা এবং ক্ষমতাই সব, একশ দশ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তির সামনে কোনো এক খাশোগি কেন, যে কোনো খুনই যে তুচ্ছÑ সাফ সাফ এই কথাগুলো বলে দিতে মোটেও লজ্জিত নন তিনি। কারণ যাঁদর ভোটে উনি ক্ষমতায় এসেছেন, তারাও একই নীতিতে বিশ্বাসী।

জামাল খাশোগি সাবেক সৌদি সরকারি সাংবাদিক। অনেকে তাকে মহান সংস্কারক বলে চালানোর চেষ্টা করলেও তিনি আসলে রক্ষণশীল সৌদি বাদশাহীর খুব কাছের লোক ছিলেন। কিন্তু খাশোগি প্রবল প্রতিপত্তিশালী নব্য ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের কর্মকা-ের বিরোধিতা করতে শুরু করলে রাজকুমারের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়ান। আর এমবিএস (মোহাম্মদ বিন সালমান) সামান্য কোনো বিরোধিতাও সহ্য করতে পারেন না, পথের কাঁটা তিনি যে কোনো উপায়ে সরিয়েই ছাড়েন। তাই খাশোগি ২০১৭ সালে প্রাণভয়ে সৌদি আরব থেকে আমেরিকায় পালিয়ে যান। তিনি আমেরিকার বড় কাগজে লেখালেখি করতেন, ওয়াশিংটন ডিসি এবং লন্ডনের বহু নামকরা রাজনীতিবিদ ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার ওঠাবসা। ২ অক্টোবর তিনি ইস্তানবুলের সৌদি দূতাবাসে ডিভোর্সের কাগজপত্র আনতে গেলে সেখানেই সৌদি আরব থেকে পাঠানো ১৫ জনের এক স্পেশাল ‘কিলিং স্কোয়াড’ তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে।

খাশোগির খুন নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় রীতিমতো হট্টগোল পড়ে গেছে। খাশোগির হাই প্রোফাইল বন্ধুরা এবং প্রিন্স সালমানের জাতিশত্রু তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এত হৈচৈ শুরু করেছেন যে, অনেক প-িতই মনে করছেন সৌদি রাজকুমারের আরশ বুঝি এবার টলে উঠল। অথচ তিন বছর ধরে ইয়েমেনের যত্রতত্র অত্যাধুনিক বোমারু বিমান হামলা এবং কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে সৌদি আরব ইয়েমেনে যে অমানবিক বিভীষিকার জন্ম দিয়েছে, সেটার দিকে আমাদের ‘সভ্য’ বিশ্বের নজর কীভাবে যেন এড়িয়ে গেছে।

পশ্চিম এশিয়ার রাজনীতি জটিল। একদিকে তেলের রাজনীতি; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ব্রিটেন, ফ্রান্সের প্রভাব বিস্তার এবং অস্ত্র বিক্রির প্রতিযোগিতা; আর অন্যদিকে সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে ক্ষমতা বিস্তারের লড়াই। ঠা-া যুদ্ধ-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী টানাপড়েন তো আছেই; শিয়া, সুন্নি এবং ইহুদিদের তিক্ত জাতিগত দ্বন্দ্ব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। আর এসব ক্ষেত্রে ধর্ম ব্যাপারটার উপযোগিতা ঐতিহাসিকভাবেই খুব কার্যকর। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের ওপর একটা ধর্মীয় তকমা লাগিয়ে দিতে পারলেই ব্যাপারটা খুব সহজে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায়।

তবে ইয়েমেনের এই হুতি বিদ্রোহের সার কথাটা হয়তো এভাবে বলা যায়, বিশ্বের সব ধনী এবং প্রভাবশালী দেশগুলোর মতোই সৌদি আরবও বহুদিন ধরেই তার দক্ষিণে অবস্থিত আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কলকাঠি নেড়ে আসছে। কিন্তু সংখ্যালঘু শিয়া জায়দিরা নব্বইয়ের দশকে ইয়েমেনের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে, যারাই আবার পরে হুতি বিপ্লবী নামে পরিচিত হয়।

স্থানীয় সুন্নি সরকার এবং সৌদি আরব মূলত একে ইরানের শিয়া প্রভাব বিস্তারের চক্রান্ত এবং শিয়া-সুন্নি ধর্মযুদ্ধ বলে অভিহিত করলেও হুতি বিদ্রোহীদের দাবি, তারা জাতিগত নিপীড়ন, দুর্নীতি, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রসহ সব সাম্রাজ্যবাদী চক্র এবং তাদের পুতুল সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হলেও ২০০৪ সালে এই বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ২০১৪ সালে বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের তদানীন্তন রাজধানী দখল করে নিলে সৌদি এবং যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত তথাকথিত ‘বৈধ’ সরকার এবং হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

এখনো পর্যন্ত হাজার হাজার সাধারণ ইয়েমেনি নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন সৌদি এবং আরব আমিরাতের যৌথ বোমা হামলায়। লাখ লাখ ইয়েমেনি তাদের বাসস্থান থেকে উৎপাটিত হয়েছেন। এক পুরনো হিসাব অনুযায়ী দশ হাজার ইয়েমেনির মৃত্যু হয়েছে বলে খবর এলেও রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং যুদ্ধ বিশেষজ্ঞদের মতে, মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে। বিমান হামলা থেকে হাসপাতাল, জেলখানা, অন্ত্যেষ্টি, বিয়ের অনুষ্ঠান কিছুই বাদ যাচ্ছে না। সৌদি আরব আধুনিক বিশ্বের সব মানবাধিকার আইনকে কলা দেখিয়ে ইচ্ছে করেই এগুলো টার্গেট করছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব হামলায় যে যুক্তরাষ্ট্রের এবং বিলাতি অস্ত্র ও ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা নিয়েও সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

এখানেই শেষ নয়। ইয়েমেনে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ চলছে। আশি লাখ মানুষ আপৎকালীন খাদ্য সাহায্যের ভরসায় বেঁচে আছেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের সংখ্যা অচিরেই এক কোটি আশি লাখ অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার অর্ধেকে পৌঁছতে পারে। কুড়ি লাখ শিশু অনাহারে, অপুষ্টিতে ভুগছে। গত বছর কলেরার মহামারী ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী, প্রায় এগারো লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন।

জাতিসংঘের হিসাব মতে, ইয়েমেনে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে। অর্ধেকের বেশি মানুষ দুর্ভিক্ষপীড়িত হওয়ায় দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে বলে সতর্ক করে জাতিসংঘ। এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৬ হাজার ৮শ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১০ হাজার ৭শ জন এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ।

এই দুর্ভিক্ষের কারণ খাদ্য সংকট নয়। সৌদি আরব এবং তার সুন্নি আরব কোয়ালিশন ইয়েমেনের তথাকথিত ‘বৈধ’ সরকারের সঙ্গে মিলে সর্বাধুনিক বোমা হামলার পাশাপাশি এক কৃত্রিম অর্থনৈতিক যুদ্ধেরও সূচনা করেছে। দেশে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি তৈরি করা হয়েছে, হুতি বিপ্লবীদের অধিকার-করা জায়গাগুলোতে (যেখানে ইয়েমেনের বেশিরভাগ নাগরিক বসবাস করেন) সরকারি চাকুরেদের বেতন দেওয়া বন্ধ হয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকেছে। সঙ্গে যুদ্ধকবলিত সারা দেশে দেখা দিয়েছে চরম দুর্নীতি এবং বিশৃঙ্খলা। ফলে দেশটি খুব সহজেই জঙ্গি তৈরির কারখানায় পরিণত হয়ে উঠছে।

ইয়েমেনের নির্মম হত্যাকা- আমাদের বিশ্ববিবেকের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে, কারণ সাধারণ ইয়েমেনি জনগণ জামাল খাশোগির মতো নামজাদা নন, পৃথিবীর অভিজাত ও ক্ষমতাবান শ্রেণির সঙ্গে ওঠাবসাও নেই তাদের। কারণ এই সাধারণ মানুষের খুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কর্ণধাররা খাশোগির খুনের মতো নিজেদের জীবননাশের হুমকির অনুরণন শোনেন না, তাই তারা এ নিয়ে সরব হওয়ার তেমন প্রয়োজনও বোধ করেন না। এটাই আমাদের একুশ শতাব্দীর ‘মানবতা’। তাই ট্রাম্প যখন বুক ফুলিয়ে বলেন, যে কোনো খুনের চেয়ে করপোরেট আমেরিকার অস্ত্র খাতের মুনাফা এবং চাকরি বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন দীর্ঘশ্বাসমিশ্রিত এক ধরনের স্বস্তি এসে ভর করে।

য় চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে