sara

সুস্থ থাকতে প্রয়োজন সচেতনতা

  ড. রাকিব ইসলাম

০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুস্থ থাকতে হলে সঠিক খাওয়া-দাওয়া, শৃঙ্খল জীবনযাপন খুবই জরুরি। এ সময়ে ডায়াবেটিস বেশ প্রচলিত একটি রোগ। ডায়াবেটিস মানে রক্তে শর্করা বা গ্লুকোজের আধিক্য। যদি একটু আগে সচেতন হতেন তাহলে হয়তো অনেকের জীবনে ওষুধ, ইনসুলিন ও খাওয়া-দাওয়ার এমন কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ত না। এবং হয়তো একটা জটিল রোগের হাত ধরে আরও পাঁচটা জটিল রোগের শিকার হয়ে পড়তেন না। শুধু অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবেও বহু তরুণ ও যুবক এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

ডায়াবেটিস তখনই দেখা দেয়, যখন আমাদের শরীর ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না কিংবা ইনসুলিন তৈরি করলেও তা শরীরের জন্য পর্যাপ্ত নয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইনসুলিন আসলে কী? ইনসুলিন হচ্ছে এক ধরনের হরমোন, যা আমাদের প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ে তৈরি হয়। ইনসুলিন উৎপাদনের ধরনের ওপর নির্ভর করে ডায়াবেটিসকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়Ñ টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস। যাদের শরীরে প্যানক্রিয়াস একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তারা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। ফলে টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগীদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন ইনসুলিন নেওয়া বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে যাদের শরীরে প্যানক্রিয়াস পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না অথবা উৎপাদিত ইনসুলিন সঠিকভাবে কাজ করে না, তারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। টাইপ-২ ডায়াবেটিস খুবই কমন এবং শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এ ছাড়া গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (এবংঃধঃরড়হধষ উরধনবঃবং) খুবই পরিচিত, যা কিছু কিছু নারীর গর্ভধারণের শেষ দিকে হয়ে থাকে এবং সন্তান জন্মের পর পরই প্রসূতি সাধারণত ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব গর্ভবতী মেয়ের এ ডায়াবেটিস হয় তাদের ১০-১৫ শতাংশ সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যেই টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইনসুলিনের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক কী? বিষয়টি জানার আগে আমাদের গ্লুকোজ বা সুগার বা শর্করা সম্পর্কে জানা দরকার, যা ডায়াবেটিসের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, আমরা যেসব খাবার খাই তা প্রথমে পাকস্থলীতে হজম হয়ে গ্লুুকোজে রূপান্তরিত হয় এবং এই গ্লুুকোজ শরীরের বিভিন্ন কোষে গিয়ে এনার্জি বা শক্তি উৎপাদন করে, যা শরীরের পেশি ও কোষসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কাজ করতে সাহায্য করে। এখন একটা সহজ উদাহরণের মাধ্যমে আমরা জেনে নিই কীভাবে ইনসুলিন ও গ্লুুকোজ আমাদের শরীরে কাজ করে। ইনসুলিন ও গ্লুুকোজ একই সঙ্গে আমাদের শরীরে তৈরি হয়ে থাকে। ধরা যাক, শরীরের কোষগুলো হলো তালা আর ইনসুলিন হলো চাবি। কাজেই পাকস্থলীতে উৎপন্ন গ্লুকোজ যখন কোষগুলোয় প্রবেশ করতে চায়, ইনসুলিনের কাজ হলো কোষের মুখ খুলে দেওয়া, যাতে করে গ্লুকোজ বা সুগার এনার্জিতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের শরীরের পেশি ও কোষসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে কাজ করতে সাহায্য করে। কিন্তু আমাদের শরীর যখন পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তখন পাকস্থলীতে উৎপন্ন গ্লুকোজ কোষের প্রবেশপথে বাধাগ্রস্ত হয়ে কোষের ভেতরে প্রবেশের পরিবর্তে রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ ইনসুলিন চাবি হিসেবে কোষের মুখগুলো খুলে দিতে পারে না। ফলে রক্তে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়, চিকিৎসাশাস্ত্রে যাকে বলা হয় হাইপারগ্লাইসেমিয়া বা ডায়াবেটিস। কাজেই একজন ডায়াবেটিস রোগীর শরীর কখনই সঠিকভাবে গ্লুুকোজ শোষণ করতে পারে না, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে এবং রোগী মারা যায়।

টাইপ-১, টাইপ-২ ও গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো প্রায় একই ধরনের হলেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে। তবে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কমন লক্ষণগুলো হলোÑ দ্রুত শারীরিক ওজন কমে যাওয়া, বহুমূত্র (ঘন ঘন প্রসাব করা), ক্লান্তিবোধ করা, তৃষ্ণার্তবোধ করা, চোখে ঝাপসা দেখা এবং শরীরের কোথাও কেটে গেলে সহজে ঘা না শুকানো। এই উপসর্গগুলো সাধারণত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণীয়।

এখন পর্যন্ত ডায়াবেটিসের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানা না গেলেও গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৫০ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিস স্থূলতা বা অতিরিক্ত শারীরিক ওজনের কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া নিম্নোক্ত শ্রেণির ব্যক্তিদের মাঝে ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশিÑ

ক.যাদের পরিবারে, বিশেষ করে মা-বাবা বা রক্ত-সম্পর্কিত নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস রয়েছে; খ. যারা ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের কোনো কাজ করে না; গ. যাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস রয়েছে; ঘ. যারা ধূমপান বা মাদক সেবন করে; ঙ. যেসব নারীর গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ছিল; চ. যাদের উচ্চরক্তচাপ এবং রক্তে (খউখ) কোলেস্টেরল বেশি রয়েছে।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের নেতিবাচক দিক হলোÑ উন্নত দেশে যেখানে মানুষ ৪০ বছর বয়সের পর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (বাংলাদেশসহ) মানুষ সেখানে গড়ে ৩০ বছরের পর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে থাকে। আমাদের জন্য নেতিবাচক এই অর্থে যে, সঠিকভাবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করা হলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যেই ব্যাপক শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, যারা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তাদের প্রায় ৫০ শতাংশ হৃদরোগ ও স্ট্রোকে মারা যায় এবং ১০-২০ শতাংশ কিডনিজনিত জটিলতায় মারা যায়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা সাধারণ মানুষের (নন-ডায়াবেটিক) তুলনায় ছয় থেকে নয় বছর কম বাঁচে।

টাইপ-২ ডায়াবেটিস প্রতিরোধের প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা। অথচ আধুনিকায়ন ও নগরায়ণের ফলে আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, যা প্রায় ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত শারীরিক ওজনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্বাভাবিক শারীরিক ওজন শুধু ডায়াবেটিসই নয়, অন্যান্য আরও ক্রনিক রোগের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পরও সুস্থ থাকতে হলে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্যান্য যে বিষয়গুলো আমাদের মেনে চলা উচিত তা হলোÑ নিয়মিত ব্যায়াম করা ও সুষম খাবার খাওয়া, বিশেষ করে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, শর্করা ও মিষ্টিজাতীয় খাবার কম খাওয়া, একসঙ্গে অনেক্ষণ বসে না থাকা, অলস জীবনযাপন না করা এবং ধূমপান না করা।

য় ড. রাকিব ইসলাম : শিক্ষক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

পোস্ট-ডক্টোরাল রিসার্চ ফেলো, বেকার হার্ট অ্যান্ড ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউট, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে