শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনই সবার কাম্য

  আব্দুল হাই রঞ্জু

০৮ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ মানুষের মৌলিক অধিকার। সে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জাতিকে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সে অধিকার আজ পর্যন্ত পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। সার্বিক অর্থে গণতন্ত্র হচ্ছে, দেশের সাধারণ ভোটাররা স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের রায় নিয়ে সরকার গঠিত হবে, যা আমাদের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু আমাদের দেশে কোনো দল বা জোট একবার ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতাসীন হতে পারলে জনরায়ে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার ঝুঁকি সহসাই নিতে চান না। শুরু করে কূটকৌশলের ষড়যন্ত্র। ফলে হুমকির মুখে পড়ে দেশের গণতন্ত্র, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য অনড় অবস্থা গ্রহণ করে। ক্ষমতাসীন জোট দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিতে সব দল ও জোটকে আহ্বান জানায়। শুরু হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন। চলে জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল, অবরোধের মতো সহিংস কর্মসূচি। শেষ পর্যন্ত ২০ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। রায় যা হওয়ার তাই হয়। মহাজোট পুনরায় সরকার গঠন করে। ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির নেতাকর্মীদের মামলার জালে পড়তে হয়। কোণঠাসা হয়ে পড়ে ২০ দলীয় জোট। সেই প্রতিকূল অবস্থা থেকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি, যা দেশের মানুষের কারো কাছেই অজানা নয়। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০ দলীয় জোট বর্জন করলেও স্থানীয় সরকার কাঠামোর নির্বাচনগুলোয় অংশগ্রহণ করা অব্যাহত রেখেছে। যদিও স্থানীয় সরকারের ভোটের ক্ষেত্রে অধিকাংশ স্থানেই স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধ ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি মর্মে অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলেও ভোট কারচুপির অভিযোগে ভোটের দিন পূর্বাহেœই প্রার্থিতা প্রত্যাহার পর্যন্ত করে, যা কোনো অবস্থায়ই বুদ্ধিসম্মত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে বিশিষ্টজনরা মনে করেন।

তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের অংশগ্রহণকে ইতিবাচকই বলব। যদিও শত ক্ষতে আক্রান্ত বিএনপি নাসিক নির্বাচনে মুখ চেনা পরীক্ষিত ঝানু কোনো প্রার্থীকে হেভিওয়েট প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বিপক্ষে দাঁড় করতে পারেনি। আগের নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খন্দকার তৈমুর আলমকে কেন মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তা আমাদের জানার কথা নয়। তবে আমরা শুনেছি, ভোট স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধ হবে না, এই অজুহাতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেছেন। গোটা দেশের মানুষের দৃষ্টি ছিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন কেমন হয়, তা নিয়ে। বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বরাবরই দাবি করেছিলেন সেনা মোতায়েনের। একপর্যায়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীও বলেছেন, আমি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন চাই। সেনা মোতায়েন করা হলে আমার কোনো আপত্তি নেই মর্মে তিনি মন্তব্য করেছিলেন। শেষ অবধি সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্মরণকালের মধ্যে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণনা শেষে দেখা গেল, মোট ভোট পড়েছে ২,৯৬,০৩৫। এর মধ্যে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী পেয়েছেন ১,৭৫,৬১১ ভোট, যা মোট ভোটের ৫২ শতাংশ, অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত পেয়েছেন ৯৬,০৪৪ ভোট, যা মোট ভোটের ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল ভোটে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বিজয়ী হন। এ নির্বাচনের ফলাফল বিএনপি প্রত্যাখ্যান না করলেও অনিয়মের অভিযোগ তুলতে কালবিলম্বও করেনি। কিন্তু পর্যবেক্ষকসহ গোটা নারায়ণগঞ্জবাসী দেখেছেন, ভোট অবাধ ও সুষ্ঠুভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বচ্ছ ও অবাধ ভোট অনুষ্ঠিত হলেও কারচুপির মতো অভিযোগ করার গতানুগতিক ধারা থেকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, কাউন্সিলরদের মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে ১৫ জন ও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১২ জন নির্বাচিত হয়েছেন। এই ফলাফলে স্পষ্ট, ভোটে জাল-জালিয়াতি হলে বিএনপির একজন কাউন্সিলরও জিতে আসার কথা নয়। যদিও শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নাসিকের নির্বাচনে বিএনপির আংশিক বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। তার এ বক্তব্য যথার্থই। কারণ সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনেও ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ভালো মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, যা সত্য। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী একজন তারকা রাজনীতিক। আমাদের দেশে নির্বাচন করে একবার কেউ বিজয়ী হলেও পরবর্তীকালে জনরায়ে সহসাই নির্বাচিত হতে পারেন না। অথচ ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের যে প্রান্তেই ভোটারদের কাছে গেছেন, সেখানেই ভোটাররা তাকে ফুল ছিটিয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্তত আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। এখানে স্পষ্ট, আইভী জনমানুষের নেতা। তিনি সন্ত্রাসের জনপদ নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তার বাবাও একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। অর্থাৎ পারিবারিকভাবেই ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী একজন পরীক্ষিত জননেত্রী। সেই হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনের রাজনীতিতে নবীন অথচ সাত খুনের মামলার আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের ভূমিকা নারায়ণগঞ্জে প্রশংসিত থাকার কারণে ভালোভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন। যে সুবাদে তিনিও প্রায় লাখো ভোটারের ভোট পেয়েছেন। যাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। সে কারণে মীর্জা ফখরুল ইসলামের মন্তব্য যথার্থই।

বিশেষ করে, এবারের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যতিক্রম ও শিক্ষণীয় কিছু বিষয় চোখে পড়ার মতো ছিল। বিজয়ের রাত পোহালে অতি সকালেই বিজয়ী প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে ছুটে গেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের বাসায়। সেখানে দুই প্রার্থীর মধ্যে চমৎকারভাবে কুশল বিনিময় হয়েছে। একে অপরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সহযোগিতা চেয়েছেন এবং অন্যজন সহযোগিতা করার আশ্বাসও দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা আমাদের দেশের রাজনীতিতে বিরল। এ জন্য ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী একজন ব্যতিক্রমধর্মী রাজনীতিক। যার রক্তে, শিরায়-উপশিরায় রয়ে গেছে বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মানুষের হৃদয় জয় করার এক জাদুমন্ত্র। আমরাও চাই, সেলিনা হায়াৎ আইভীর রাজনৈতিক এই শিষ্টাচার গোটা রাজনীতির যে কালিমা আষ্টেপৃষ্ঠে জাতীয় রাজনীতিকে কুলষিত করে রেখেছে, তার অবসান হোক। অর্থাৎ রাজনীতিতে জাতীয় স্বার্থে সরকার, বিরোধী দলসহ সব দলকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করার মানসিকতা লালন করতে হবে, যার কোনো বিকল্প নেই। নিখাদ সত্য, এই কথাটি মুখে আমরা যেভাবে আওড়াই, কার্যত তা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনই ছিল বর্তমান নির্বাচন কমিশনের শেষ নির্বাচন। আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কারণ আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশন ইচ্ছা করলেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। অপ্রিয় অথচ সত্য, এই কথাটি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদা, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন বারবার উল্লেখ করেছেন। অতিসম্প্রতি বিবিসি আওয়ামী লীগের তরফে সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। সেখানে উপস্থাপকের দুজনের কাছে প্রস্তাব ছিল সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের বিষয়টিকে বৃহৎ দুই দল কেন পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে? জবাব সন্তোষজনকভাবে কোনো পক্ষই দিতে পারেনি। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত দেশের বৃহৎ দলগুলো স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কথা বললেও বাস্তবে আন্তরিকতা দেখায় না। কারণ স্বাধীন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে এই বিষয়টি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে। যেমন অতিসম্প্রতি বিএনপির উত্থাপিত ১৩ দফা সুপারিশেও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন প্রণয়নের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যাহোক আমাদের দেশের নির্বাচন কাঠামো শক্তিশালী করতে হলে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের যে কোনো বিকল্প নেই, যা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এ জন্য বিশেষ করে দেশের বৃহৎ দলগুলোকেই আন্তরিক হতে হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। এ নিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শুরু করেছেন। প্রথমেই তিনি বৃহৎ বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসেছেন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দশ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রপতির তরফেও বলা হয়েছে, বিএনপির পরামর্শ একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনে সহায়ক হবে। দেশবাসীও চায়, রাষ্ট্রপতির পদটি সাংবিধানিক। তিনি জাতির শেষ আশ্রয়স্থল। আশার শেষ জায়গাটুকুর প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তা আওয়ামী লীগও মেনে নেবে বলে ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে। যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে রহিত করা হয়েছে, সেহেতু দলীয় সরকারের অধীন ছাড়া নির্বাচনের অন্য কোনো গত্যন্তর নেই। তাই একটি নিরপেক্ষ শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠিত হলে, যার ছায়াতলে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা সম্ভব। আর সরকার যদি কোনোরূপ হস্তপেক্ষ না করে তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করাও কঠিন হবে না।

পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সম্ভব। আগামী দিনের নির্বাচনগুলো শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনেই অনুষ্ঠিত হোক, এটাই দেশের সব মানুষের কাম্য।

 

য় আব্দুল হাই রঞ্জু, শিক্ষক ও কলাম লেখক

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে