প্রযুক্তির সঙ্গে রাজনীতিটাও গতিপ্রাপ্ত হোক

  শহীদ ইকবাল

০৯ জানুয়ারি ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৭, ০৯:৩৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের দেশটার একটা চরিত্র আছে। তা কী? বাঙালিকে স্বভাবে চেনা যায়, চলনে চেনা যায়, আবেগে চেনা যায়। গলাতেও চেনা যায়। সর্বদা, সব কিছুতে তার একটা অসাম্প্রদায়িক চরিত্র আছে। যতই জ্বলুক, খা-বদাহন ঘটুক; আত্মীয়তা-আতিথেয়তা এ বাঙালির ভেতরে প্রবল। বিচ্যুতি হলেও সে স্বউদ্যোগে নিজ স্বভাবে ফিরে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে আজ পর্যন্ত যে সময় গড়িয়েছে তাতে প্রজন্মান্তর ঘটেছে। এ প্রজন্ম এখন পূর্ণবয়স্ক। পরের দ্বিতীয় প্রজন্মও ক্রমবিকাশমান। ব্যবসা-বাণিজ্যে, বেসরকারি-সরকারি প্রতিষ্ঠানে এদের অনেকেই এখন কর্মের অংশীদার। আর তা শুধু দেশেই নয়, প্রবাসেও। প্রবাসে কর্মোদ্যোগ গ্রহণের ফলে বাঙালির আলাদা পরিচয়ও গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিস্তর অংশ নানাভাবে তরুণদের সংশ্রবে আকৃষ্ট। এ আকর্ষণ থেকে তাদের একটি চেতনাও গড়ে উঠেছে। এ চেতনার ধর্মও বাঙালির স্বভাব-অনুগত ধর্ম। এ ধর্মের ভেতর-বাইরে সহজাত ও সর্বধর্মের-সম্প্রদায়ের সম্মিলিত একটি রূপের পরিগ্রহণ আছে। সমন্বয়ী এ রূপটি এখন নেতৃস্থানীয় তরুণরা লালন করেন এবং তাদের ভেতর দিয়েই তো পরের প্রজন্মের হাতে তা প্রসারিত হচ্ছে। এর প্রমাণ নববর্ষসহ বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের তুমুল জনস্রোত। এই উদযাপনগুলো এখন বেশ বাড়তি জলুস অর্জন করে ফেলেছে। চাকচিক্য ও সৃজনশীলতায়ও পেয়েছে নতুন অনুষঙ্গ। এ অনুষঙ্গ শ্রেণিহীন-বর্ণহীন-গোত্রহীন। জনস্রোতের ভেতরে উৎসবমুখরতার যে বৈচিত্র্য তাও ক্রমেই বাড়ছে, তাতে গড়ে উঠছে মাত্রিক ঐক্য ও নতুন তাৎপর্য। প্রসঙ্গত, এ কথাগুলো বলছি নতুন বছরে রাজনীতির ভেতরে একটা ইতিবাচক ঐক্য ও সংঘবদ্ধ গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষা নিয়ে। এ আকাক্সক্ষাটুকু অনুমান করা যায়Ñ ওই প্রজন্মের ভেতর কর্মশক্তির স্বপ্ন-ধারণা পরিশ্রুতি। বিশেষত, তা গত দশকের সময়সীমার মধ্যে পুনর্গঠিত। এ পুনর্গঠন অবশ্যই ইতিবাচক অর্থে। এখানে স্বল্পপরিসরে তারই ব্যাখ্যা করতে চাই। কারণ সামষ্টিক অগ্রযাত্রার স্বার্থে এটা অ-জরুরি নয়।

আমরা সবাই জানি, এ শতাব্দীর শুরুতে একটা নতুন পরিবর্তন শুরু হয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তির যোগাযোগে যে নতুন সম্পৃক্ততা, তা

ঘন-জনবসতিপূর্ণ এ দেশের চালচিত্রই বদলে দিয়েছে। দ্রুততর এ বদলে মানুষের মনোজগৎ পাল্টে গেছে। জীবনযাপনের সব পৃষ্ঠা বদলে গেছে। প্রত্যেকটি মানুষ এর নতুন স্বাদও গ্রহণ করেছে। সর্বোপরি এতে করে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে বিশ্বের সঙ্গে। বাংলাদেশের প্রবাসীরা দেশের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে ফেলেছে। যোগাযোগের সীমাহীন দৌরাত্ম্য ঠিক যেন অলৌকিক কোনো ‘জাদুর চেরাগ’ এখন। এর মধ্যেই রাজনীতির চর্চা ও এর অভিমুখগুলোও বদলেছে। আমাদের প্রায় সবারই জানা যে, কোন প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছিল। তখনকার চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতালিপ্সু প্রবণতাই তার জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিল। কারণ ওই আর্মি পৃষ্ঠপোষকতার সরকার যখন ক্ষমতা নেয়, তখন এ দেশের অন্তত আশি ভাগ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। যদিও পরে তা কমে যায়Ñ প্রকারান্তরে মানুষের মনে বিরক্তিও আসে। শেষদিকে তো রাজনৈতিক সরকারের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে অনুভব করতে থাকে জনগণ। এগুলো সময়ের এক একটা অভিজ্ঞতার স্মৃতিফলক। যার ভেতর দিয়ে এই তরুণ প্রজন্ম এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে বেশ কিছু কাজ হাতে নেয়। সেখানে এ তরুণদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়টি। আমাদের মনে আছে, প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদে সংসদে বিরোধী দলের তেমন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংসদে অধিক সময় তারা যাননি। ঠিক তার আগের মেয়াদে বিরোধী দলও প্রায় একই কাজ করেছিল। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নেতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও বিষোদ্গারও কম হয়নি। যেটি গণতান্ত্রিক রীতিপরিপন্থী। এ সময়টায় ভেতরেই প্রযুক্তির তীব্রতর উত্থান ও সম্প্রসারণ ঘটেছে। দেশে-বিদেশে যোগাযোগ বেড়েছে। কর্মসংস্থান ও কর্মউদ্যোগীদের সক্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু রাজনীতিটা সঠিক পথে চলেনি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে রাজনীতির মাঠ কিছুটা হলেও উত্তপ্ত ছিল। বিরোধীরা তাদের দাবি-দাওয়ায় ছিলেন অনেকটা গতানুগতিকভাবে সোচ্চার। তবে সরকার বেশ সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। বিদেশ কূটনীতিতেও আগের বিএনপি জোটের চেয়ে তারা বেশি আস্থা ও সাফল্য বয়ে আনে। হয়তো দেশের রাজনীতি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের একাধিপত্য ও নানা পর্যায়ে কর্তৃত্ব ছিল কিন্তু সেটা বিরোধী দল প্রত্যাঘাত করতে তেমন সক্ষম হয়নি। এর মাঝে গত সরকারের মেয়াদের অন্তিমকালে সমঝোতার বদলে দুই প্রধান দলই মুখোমুখি অবস্থান করে। এখানেও রাজনীতি তেমন সম্মুখগামী হয়নি। তবে জনসমর্থন এবং রাজনৈতিক কূটকৌশলে সরকারি দলের নেত্রীই

নানাভাবে যোগ্যতার সঙ্গে এগিয়ে থাকেন। কারণ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েও কোকোর জন্য সমবেদনা কিংবা আগে টেলিফোন করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানানোÑ এমন কাজগুলো ইতিবাচক অর্থে হয়েছে এবং যার ফল একতরফাভাবে সরকারের ঝুলিতেই পড়েছে। এ ধারাবাহিকতায় পাঁচই জানুয়ারির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে। খুব তুমুল ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে তখন। আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ানো কিংবা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপকৌশলÑ স্মরণকালের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ঘটনা। দুই মাস জনমনে নাভিশ্বাস ও অনিরাপদ যে পরিবেশ ছিল, তা অস্বীকার করা যে কোনো বিবেকবান মানুষের পক্ষে অসম্ভব।

দেশে বিরোধী দল দরকার। জনসমর্থিত বিরোধী দল প্রয়োজন। এটা কেউই অস্বীকার করবে না। এ পর্যায়ে সেই জনসমর্থিত দলটি পরাস্ত হয়Ñ এমন ঘৃণ্য রাজনীতির অপকৌশলের কাছে। আরও তার বিস্তৃতি মাত্রিকতা পায় যখন স্বাধীনতাবিরোধীদের নির্বিচারে বিচার সংঘটিত হয়, জাঁদরেল নেতাদের ট্রাইব্যুনালে বিচার হয় এবং তার কার্যকর অপ্রত্যাশিত ফল জনসমাজ দেখতে পায়। আজকে বিএনপি জোটের এ পরিণতির পূর্বাপর কারণ এর মধ্যেই নিহিত। বর্তমান তরুণ সমাজেও এখন তাদের প্রতি সংশয় অনুপস্থিত নয়। অকার্যকারিতার নেতৃত্ব কার্যহীনতার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। ফলে গত দুই বছরে রাজনীতির মাঠ শূন্য এবং ফাঁকা বুলির মধ্যে আচ্ছন্ন। এখন প্রশ্ন, কোনো একদলীয় শাসন কেউ চায় না। গণতন্ত্রহীনতাও কেউ চায় না। ঠিক একইভাবে এটাও ঠিক, কোনো দলই স্বেচ্ছায় ক্ষমতাও ছাড়বে না। কারণ প্রতিবাদহীন-প্রতিরোধহীন ক্ষমতায় বহাল থাকার অর্থ জনসমর্থন বজায় থাকা। সরকার সেটিই জানবে এবং সেভাবেই পরিকল্পনার ভেতর দিয়ে সে সম্মুখে এগোবে। কিন্তু বিরোধীদের এ পর্যায়ে কার্যকর থাকা জরুরি। এখানে প্রশ্ন, তারা কি ইতিবাচক রাজনীতির পথ পাচ্ছে না? সঠিক রাজনীতি কোনটা, গণতন্ত্রের পথ কোনটা, জনরায় অভিমুখী পথ কোনটাÑ তা কি চিনতে পারছে না? নাকি সহজ পথ খুঁজছে? অবশ্য ইতোমধ্যে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে তেরো দফা নিয়ে হাজির হয়েছে। নির্বাচন কমিশন বিষয়ে তারা মত দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে অংশ নিয়েও সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায়ও তাদের সংযমী হতে দেখা গেছে। এখন বুঝি তারা ‘ব্যাকফুটে’ খেলছে। খেলার নিয়মই অনেক সময় তাই। কিন্তু বলটা বোঝার ক্ষমতা ও যোগ্যতা দরকার। রাজনীতিতে এগোতে হলে, শুধু বিরোধিতা নয়, বিদেশি আনুগত্য নয়, ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের স্বার্থ নয়Ñ দেশের মানুষের সামষ্টিক ও সমর্থনশীল পথের মূল্য দিতে হবে। তার কোনো বিকল্প কী আছে! বিরোধী দল দরকার। শক্তিশালীরূপেই দরকার। কিন্তু তা শক্তিশালী করার পথÑ নিঃসন্দেহে গণমুখিতারই পথ। তাতে করে রাজনীতি এগোতে পারে। গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে। গঠনমূলক কিছু করলে, সরকারেরও জনরায় উপেক্ষিত হতে পারে। কিন্তু অপরাজনীতি এখন আর রাজনীতি নয়।

যেমনটা বলছিলাম, প্রযুক্তি সক্ষমতা ও তরুণ প্রজন্মের কথা। তার সঙ্গেই রাজনীতির সামর্থ্য জড়িত। এটি অর্জনের জন্য যে কোনো দলের তরুণ প্রজন্মকে সঙ্গে নিতে হবে। কর্মক্ষম, রোজগারপ্রবণ তরুণরাই এখন দেশের চালিকাশক্তি। সরকারের উন্নয়ন তৎপরতারও অংশীদার। কিন্তু সমর্থন তো স্বাধীন। তাই মৌলিক সেন্টিমেন্ট এখানে গুরুত্বপূর্ণ। উগ্রতা নয়, মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা নয়, কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই চির-বাঙালির স্বভাব। সেই স্বভাবটি যেমন সহজাত, তেমনি রাজনৈতিকভাবে মীমাংসিতও। সেটি ধরেই ইতিবাচক রাজনীতি করতে হবে। রাজনীতির পথে ভিন্নতা থাকতে পারে, হতে পারে মতপার্থক্য কিন্তু দেশ-জাতি-রাষ্ট্র পরিচয় ও মূলনীতি অস্বীকার করে কেউ সঠিক রাজনীতি করতে পারবে না। চলতেও পারে না। চলতি ভুল জনতা ভুলে যেতে পারে কিন্তু দেশ ও অস্তিত্ব লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে কেউ তা মেনে নেয় না, নেবেও না, আর কোনো রাষ্ট্রও সেভাবে চলে না। তাই ‘চালাকি’ বা ‘ফন্দি’ সবাই বোঝে। যে প্রযুক্তির বন্ধন ছেয়ে ফেলেছে মানুষের মনকে, সেখানে সত্য আরও এখন চিরসত্যে পরিণত। ভ্রান্তিতে চললে ব্যর্থতাই সত্য হবে। আর এ ব্যর্থতা কোনো বড় দলে ঘটুকÑ তা কেউ চাইবে না। কারণ কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল ও ইতিবাচক রাজনীতি গণতন্ত্রেরই রক্ষাকবচ।

 

য় শহীদ ইকবাল, অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

"

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে