এরশাদের নতুন জোট এবং রাজনীতির হিসাব-নিকাশ

  আলম রায়হান

১৯ মে ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১৯ মে ২০১৭, ০০:৪৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদ বিমানের রাডার ক্রয় মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন ১৯ এপ্রিল। মামলার বিচারে খালাস পাওয়া কেবল নয়; বিচারিক আদালতের সাজা থেকেও রেহাই পেয়েছেন তিনি উচ্চ আদালতে। রাষ্ট্রপতি থাকাকালে প্রাপ্ত উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার মামলায় এরশাদের তিন বছরের সাজা হয়েছিল। এ দ-ের বিরুদ্ধে আপিল গ্রহণ করে তাকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট ৯ মে। সাজা বাড়াতে রাষ্ট্রপক্ষের দুটি আবেদনও খারিজ করে দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এরশাদের আইনজীবী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এ রায়ে খুশি।’ তবে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান এ রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দুদকের আইনজীবী কতদূর কী করবেন তা পরের বিষয়। আর এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ বলেও বিবেচনা করার কারণ নেই; আসামির পক্ষে যাওয়া রায় উল্টে গিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে যাওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।

ফলে দ- থেকে এরশাদের খালাস পাওয়া নিয়ে দুদকের আইনজীবীর মন্তব্য নিয়ে তেমন কেউ ভাবছেন বলে মনে হয় না। বরং এ রায়ের আগে এরশাদের একটি কাজ নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। তিনি ‘সম্মিলিত জাতীয় জোট’ নামে রাজনৈতিক জোট ঘোষণা করেছেন ৭ মে। এটি জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে করা হয়েছে, তা সবার কাছে স্পষ্ট। ঘোষণার সময় এ জোটে রয়েছে ৫৬টি দল। দলের সংখ্যা আরও বাড়বেÑ এমনটাই জানিয়েছেন জোট গঠনের সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ। এ সময় তিনি আরও জানান, জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে নেই। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, মন্ত্রিসভায় আছে জাতীয় পার্টি। যদিও মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা বহুবার দিয়েছেন এরশাদ। কিন্তু সরকার থেকে জাতীয় পার্টি বেরিয়ে আসার ঘটনা এখনো ঘটেনি। হয় এ ঘোষণা তিনি কৌশলগত কারণে দিয়েছেন; না হয় দলের নেতাদের ‘এতবড় ত্যাগ’ স্বীকার করাতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ দলের ওপর এরশাদের নেই। তবে এ প্রসঙ্গ সাধারণের কাছে আলোচ্য নয়।

এরশাদকেন্দ্রিক আলোচ্য হচ্ছে, ঘোষিত ঢাউস জোট। দলের সংখ্যার হিসাবে এটি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জোট। বিশ্ব প্রেক্ষাপটেও এটি রেকর্ড হতে পারত! কিন্তু জোট গঠনের ৯ দিনের মাথায় ভাঙনের মুখে পড়েছে নামসর্বস্ব দল নিয়ে গড়া এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ)। যদিও আগামী নির্বাচনকেন্দ্রিক ইকোয়েশনে এরশাদের নতুন জোটের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে বাংলাদেশের বিরাজমান বাস্তবতায়। যে কারণে অনেকেই মনে করেন, গতবারের মতো আগামী জাতীয় নির্বাচনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এইচ এম এরশাদের। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, খেলারাম এরশাদ এবার কোন খেলা খেলবেন? নানান ছলচাতুরি এবং বন্দুকের জোরে ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী এরশাদকে আগেভাগে রিড করা কঠিন। ক্ষমতা দখলের আগেই তিনি রাজনীতি নিয়ে খেলেছেন, এর পর তিনি রাজনীতির লেজেগোবরে অবস্থা করে ছেড়েছেন। আর ইতিহাসের তিনি বিরল সামরিক স্বৈরশাসক, যিনি নিজের পায়ে হেঁটে ক্ষমতার মসনদ থেকে নামার সুযোগ পেয়েছেন। যে সুযোগ পাননি জেনারেল জিয়াউর রহমান। পাকিস্তানের জেনারেল জিয়াউল হকও এ সুযোগ পাননি। এ বিচারে এরশাদ সৌভাগ্যের বরপুত্র। কিন্তু রাজনীতিতে তেমন সুবিধা করতে পারেননি। কেবল তার গুরুত্ব বাড়ে নির্বাচন এলে। এদিকে নির্বাচনের সময় রাজনীতিতে আদর্শ অধিকতর গৌণ হয়ে যায়। রাজনীতির এ মজ্জাগত বৈশিষ্ট্যের কারণে এরশাদের গুরুত্বের পারদ হঠাৎ ওপরে উঠে গেছে। সাধারণভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষেই খেলছেন খেলারাম এরশাদ। কিন্তু শেষতক তিনি কোন দিকে গোল দেবেন তা আগেভাগে বলা কঠিন। তার সহোদর জিএম কাদেরও মনে করেন, ‘এরশাদ মোস্ট আনপ্রেডিক্টটেবল।’

এরশাদ সম্পর্কে দেশবাসীর ধারণা ও তার সহোদরের মূল্যায়ন একাধিকবার সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির খালেদা সরকারের চরম নিগ্রহের শিকার এরশাদ ’৯৬-এর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক জোট বেঁধেছিলেন বিএনপির সঙ্গেই। ১৯৯৬-২০০১ সালের হাসিনা সরকারের সময় চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে একত্রে থাকবেন বলে বিএনপির সঙ্গে লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ। সে চুক্তিতে প্রধান কথা ছিল একত্রে আন্দোলন ও একত্রে সরকার গঠন করা। কিন্তু এ লিখিত চুক্তিও অবলীলায় ভঙ্গ করেছেন তিনি। আর চুক্তি ভাঙতে গিয়ে তার দলই ভেঙে গিয়েছিল। আদর্শগত কারণে দলের মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতির সামনে প্রকাশ্য ওয়াদা ভঙ্গ করতে চাননি। আর এরশাদ বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ত্যাগ করার ব্যাপারে অনড় থাকলেন। ফলে জাতীয় পার্টিতে সৃষ্টি হলো বড় ধরনের ভাঙন। নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে জন্ম নিল নতুন দল, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি। দলে ভাঙনের পরও কপাল ভাঙার ধারা ঠেকাতে পারেননি এরশাদ। কারণ ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হয় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট। ফলে এরশাদের জন্য আবার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল জেল আতঙ্ক। এর সঙ্গে জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলায় তাকে দ্রুত তাড়িয়ে বেড়ালো ফাঁসির দড়ি! তবে চুক্তিমতো বিএনপির জোটে থাকলেও যে এরশাদের খুব একটা প্রাপ্তিযোগ হতো তাও নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। স্মরণ করা যেতে পারে, নীতিগত কারণে এরশাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দল ভেঙে বিএনপির জোটে থেকে যাওয়া নাজিউর রহমানের কোনোই প্রাপ্তি ঘটেনি বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকারের আমলে। তার এ বঞ্চনার পেছনে জামায়াত-বিরোধিতাকে কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। যেমনটি ঘটেছে কর্নেল অলি ও জেনারেল মীর শওকতের বেলায়। তবে বিএনপির জোটে থাকলে জেনারেল এরশাদ জামায়াতের বিরোধিতা নিশ্চয়ই করতেন না। তবে এটিও নিশ্চিতভাবে বলা চলে, এর পরও খালেদা সরকারে তার প্রাপ্তি তেমন হতো না; যেমনটি হয়নি হাসিনা সরকারে।

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে জি এম কাদের শুধু বেঁকে বসেননি, জেনারেল এরশাদ দৃশ্যত বেঁকে বসেছিলেন। তবে ‘অসুস্থ হয়ে’ হাসপাতালে ভর্তি হওয়াসহ অনেক নাটকের পর এ নির্বাচনে আংশিক অংশ নেয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। এর পর মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির অর্জন এক থেকে বেড়ে দাঁড়ায় দুই। তবে এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ও আছে জাতীয় পার্টির প্রাপ্তির তালিকায়। এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তবে তিনি কতটা এরশাদ অনুগত, আর কতটা অন্য দিকে অনুরক্তÑ তা বলা কঠিন। তবে সামরিক শাসক এরশাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসের এবার পানিসম্পদমন্ত্রী হওয়াটা বেশ উজ্জ্বল অর্জন। কিন্তু এরশাদের নিজের অর্জন বিবর্ণই থেকে গেছে। অনেকেই বলেন, এরশাদের নিজস্ব হিসাবের খাতা শূন্য, আর বুকভরা কেবল না পাওয়ার হাহাকার। স্মরণ করা যেতে পারে, পতিত হওয়ার পর তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্নও দেখেছেন বহুবার, তার এ বাসনা তিনি গোপন রাখেননি। ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্রপতির পদে থাকার পরও প্রায় ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি হতে চেয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু তার ভাগ্যের সিকে ছেঁড়েনি। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, একবার দলের বাইরে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি করে শেখ হাসিনার যে তিক্ত শিক্ষা হয়েছে তার ফলে তিনি আর ঝুঁকি নিতে চাননি। আর জেনারেল এরশাদকে নিয়ে ঝুঁকি নেওয়া যে কত বড় বিপদের সূতিকাগার হতে পারে তা নিশ্চয়ই শেখ হাসিনা জানেন। ফলে বহু অপেক্ষা করেও আবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার এরশাদের ‘আশা না পুরিল’। শুধু তাই নয়, দশম জাতীয় সংসদে জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও এরশাদকে বিরোধী দলের নেতা করার ভরসা পাননি ক্ষমতার কুশীলবরা। সংসদে বিরোধী দলের নেতা করা হলো এরশাদের ওপর চির অসন্তুষ্ট স্ত্রী রওশন এরশাদকে।

আবার রাষ্ট্রপতি হওয়া যে আর সম্ভব নয়Ñ এক পর্যায়ে তা বুঝে অন্য কিছু হতে চেয়েছিলেন এরশাদ। এমনকি সর্বশেষ তিনি হতে চেয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ দূত। কিন্তু এসব কিছুই হলো না তার। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের তকমা প্রাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে জেনারেল এরশাদের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব-নিকাশ। না পাওয়ার ক্ষোভ জেনারেল এরশাদ বহুবার প্রকাশ করেছেন। বঞ্চিত হওয়ার বেদনায় কাতর হয়ে তিনি একাধিকবার আওয়ামী লীগের জোট ছাড়ার আওয়াজ দিয়েছেন, বলেছেন মন্ত্রিসভা থেকে বেরিয়ে আসার কথা। তবে তার দল এখনো সরকার থেকে বেরিয়ে আসেনি। জোট ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে তিনি আওয়ামী জোটে নেই বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

এর আগে তিনি বহুবার ক্ষমতাসীন মহাজোট ও সরকার ছাড়ার ঘোষণা দিলেও তা ছাড়েননি। কারণ জেনারেল এরশাদকে সব সময় কারাগার আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে বলে মনে করেন অনেকে। তবে জেনারেল এরশাদ যাত্রাগানের বিবেকের মতো বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তিনি সেই নির্বাচনে যাবেন না। আবার বিএনপির সমালোচনাও করেছেন তিনি। সমালোচনায় ছাড়েননি সরকারকেও। জেনারেল এরশাদ এ-ও বলেছেন, ‘সরকার যেভাবে আচরণ করছে তাতে ক্ষমতা স্থায়ী হয় না।’ তিনি আরও বলেছন, ‘জীবনের শেষ সময় কারো দালালি করার ইচ্ছা নেই।’

কিন্তু এরশাদের এ কথা কেউ তেমন আমলে নেননি। কারণ তার বলা এবং করার মধ্যে যে কোনো ধারাবাহিকতা নেইÑ তা সর্বজন বিদিত। সঙ্গে এটি অনেকেই বিবেচনায় রাখেন, এরশাদ শুধু প্রেমের খেলোয়াড় নন; তিনি রাজনীতিরও বড় খেলোয়াড়। এখন দেখার বিষয় হচ্ছে, আগামী জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক তিনি কোন খেলা খেলেন। তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, জেনারেল এরশাদের সব খেলাই শেষতক মাঠে মারা যায় তার জেল আতঙ্কের কারণে। বিভিন্ন মামলায় কারেন্ট জালে আটকা পড়ার মতো তিনি এতই জড়িয়ে আছেন যে, তাকে জেলে পাঠানো খুবই সহজ কাজ। এমনকি জেনারেল মঞ্জুর হত্যা মামলায় ফাঁসির রজ্জু তার গলা থেকে খুব দূরে নয় আইনের দৃষ্টিতে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, এ আতঙ্ক এবং অতিমাত্রায় প্রেম-রিপুর কারণেই এইচ এম এরশাদ দেশের রাজনীতিতে প্রধান নিয়ামক হতে পারলেন না; উচ্ছিষ্টভোগী ও ক্ষমতার সহায়ক শক্তিই রয়ে গেলেন এরশাদ। ফলে তিনি যত খেলাই খেলেন না কেন, তাকে ক্ষমতাসীন দলের বঞ্চিত শরিক হিসেবেই বাকি জীবন কাটাতে হবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ক্ষমতাসীন জোটের বঞ্চিত শরিক, না হয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠÑ এভাবেই নির্ধারিত হয়ে গেছে প্রধান সামরিক শাসক থেকে রাষ্ট্রপতি হওয়া জেনারেল এইচ এম এরশাদের ভাগ্য!

আলম রায়হান : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে