ডেঙ্গু : ইতিহাসের ফিরে আসা রোগ

  ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:২৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডেঙ্গু ও ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভার চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের যে কোনো একটির সংক্রমণে ঘটে। এডিস, বিশেষ করে এডিস ইজিপটাই মশার কামড়ে ভাইরাসটি মানবশরীরে প্রবেশ করে। প্রতিবছর আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া ও ওশেনিয়া অঞ্চলে কয়েকশ হাজার ডেঙ্গু এবং ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভারে আক্রান্ত রোগীর রিপোর্ট পাওয়া যায়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকা অঞ্চলের দেশগুলোয় ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৬৩২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর কথা জানা যায়।

ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক ধরন ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভার। এটি ১৯৮১ সালে কিউবায় মহামারীর আকারে দেখা দেয় এবং ১৯৮৯ সালে দেখা দেয় ভেনিজুয়েলায়। ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভার সবচেয়ে বেশি ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট মতে, ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে সাত লাখ ৯৬ হাজার ৩৮৬ জন এবং ডেঙ্গুর কারণে মারা গেছে ৯ হাজার ৭৭৪ জন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ডেঙ্গু মহামারী আকারে প্রথম ঘটে ফিলাডেলফিয়ায় ১৭৮০ সালে। দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকার বিভিন্ন অংশে ডেঙ্গু মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে উনিশ ও কুড়ি শতকে। ডেঙ্গু মহামারী আকারে দেখা দেয় লুসিয়ানায় ১৯৪৫ সালে। ১৯৫০ ও ১৯৬০ সালে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় ব্যাপক হারে এডিস ইজিপটাই মশা নির্মূল করার মধ্য দিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকায় এই মশার প্রজাতি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

১৯৮০ এবং ১৯৮৬ সালে আমেরিকার টেক্সাসে ডেঙ্গু ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে। পরে দেখা গেছে, এই ডেঙ্গুর কারণ হলো এডিস এলবোপিকটাস মশা যা এশিয়া থেকে এসেছে। মশার এই প্রজাতি আবিষ্কৃত হয় টেক্সাসে ১৯৮৫ সালে। এভাবে ডেঙ্গু হওয়ার কারণ হলো মশাগুলোর এক দেশ থেকে অন্য দেশে অনুপ্রবেশ। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আমেরিকা ও হাওয়াইতে ১ হাজার ৪৫৭ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে বলে সন্দেহ করা হয় এবং ২৭৬ জনের রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রথম দেখা দেয় ১৯৬৪ সালে। রোগ নির্ণয় সম্ভব হয়নি বলে তখন এটাকে ‘ঢাকা ফিভার’ বলা হতো। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে আবার ডেঙ্গু দেখা দেয় এরপর সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং মারা গেছে অনেকে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে নতুন রোগ চিকুনগুনিয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষণীয়।

ইতিহাস

ডেঙ্গুর প্রাথমিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অন্যান্য জ্বরজনিত অসুস্থতার সঙ্গে ডেঙ্গুজ্বরের মিল থাকার কারণে আলাদাভাবে ডেঙ্গুকে নিয়ে চিন্তা করা হয়নি। ডেঙ্গুর মতো মহামারী প্রথম ঘটে ১৭৭৯ সালে মিসর এবং জাভায়। তবে সত্যিকার অর্থে তার জন্য দায়ী ছিল চিকুনগুনিয়া ভাইরাস। ডেঙ্গু কিংবা ডেঙ্গুসদৃশ মহামারীর প্রথম রিপোর্ট পাওয়া যায় উনিশ থেকে এবং কুড়ি শতকের প্রথম দিকে। এই মহামারী ঘটে আমেরিকা, দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায়। ভারত মহাসাগর, প্রশান্ত মহাসাগর এবং ক্যারিবিয়ান সাগরের কিছু কিছু দ্বীপেও ডেঙ্গুর সন্ধান মেলে। এসব মহামারী আকারে ডেঙ্গু ছিল প্রাণঘাতী নয় এমন জ্বরজনিত অসুস্থতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যেসব উপসর্গ ছিল তা হলো র‌্যাশ এবং হয় মাংসপেশিতে ব্যথা নতুবা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা। ডেঙ্গুর কারণে প্রথম মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটে ১৮৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়ায় এবং ১৯২৮ সালে গ্রিসে। সে সময় এক হাজারেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটে। হেমোর‌্যাজিক ডেঙ্গু অর্থাৎ ডেঙ্গুতে রক্তক্ষরণ ঘটনার মধ্যে রয়েছে পাকস্থলী ও অন্ত্রে রক্তক্ষরণ। সেটা মহামারী আকারে প্রথম ঘটে ১৯২২ সালে টেক্সাস ও লুসিয়ানায়। বিশ শতকের প্রথম ভাগে ডেঙ্গু উপসর্গ এত মারাত্মক ছিল না। তখন সাধারণ জ্বর এবং মাঝে মাঝে রক্তক্ষরণের উপসর্গ থাকত। ত্বকে লাল লাল দাগ, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, মাঢ়ি দিয়ে রক্ত পড়া এবং মেয়েদের যোনিপথে রক্ত পড়া উপসর্গ থাকলেও মৃত্যুর ঘটনা খুব কম ছিল। ১৯৪৪ সালে ডক্টর আলবার্ট সাবিন ডেঙ্গুর ভাইরাস শনাক্ত করেন এবং ডেঙ্গু-১ ও ডেঙ্গু-২ নামে দুটো ভাইরাসকে পৃথক করেন। ১৯৫৬ সালে হ্যামন এবং তার সহকর্মীরা আরও দুটো নতুন ডেঙ্গু ভাইরাসকে শনাক্ত করেন, যাদের নাম দেওয়া হয় ডেঙ্গু-৩ ও ডেঙ্গু-৪। এ সময় ফিলিপিন্সের শিশুদের মারাত্মক আকারে হেমোর‌্যাজিক ডেঙ্গু দেখা দেয়। হেমোর‌্যাজিক ডেঙ্গুর কারণ রোগী শকে চলে যায়, রক্তচাপ কমে যায়। রোগীর মৃত্যু ঘটে।

কবে ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত করা হয়?

ডেঙ্গু প্রথম শনাক্ত করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর উপকূল অঞ্চলে। ডক্টর আলবার্ট সাবিন ইউএস আর্মি কমিশনে এ সময় ডেঙ্গু এবং স্যান্ডফ্লাই ফিভারের ওপর কাজ করতে গিয়ে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত করেন।

ডেঙ্গুর প্রাকৃতিক বাহক কী?

ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহক হলো এডিস মশা ও মানুষ। ডেঙ্গুর চার ধরনের ভাইরাসই জরাজীর্ণ এলাকায় এডিস ইজিপটাই মশা থেকে মানুষ এবং মানুষ থেকে এডিস ইজিপটাই মশাতে সঞ্চালিত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই ভাইরাসগুলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে বিমান ভ্রমণকারীদের মাধ্যমে। ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রথম বাহক বানর ছিল নাকি মশা ছিল তা জানা যায়নি। তবে এটা জানা গেছে, ডেঙ্গু ভাইরাস এশিয়ার জঙ্গলগুলোয় মশা-বানর-মশা চক্রাকারে আবর্তিত হয়েছে। তাই বলে বর্তমান বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে জঙ্গলের এই ধারাটির কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছেÑ সাক্ষ্যপ্রমাণ সে কথা বলতে নারাজ।

য় ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল : স্বাস্থ্যবিষয়ক নিবন্ধকার এবং সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে