এক ছাদের নিচে যুগের পর যুগ

  অনলাইন ডেস্ক

১২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

-আপনি নাকি অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন?

-কই, আমি তো জানি না, আপনি কোথায় শুনলেন?

-শুনিনি, এক মডেল-অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকারে পড়েছি।

-কার? কী?

-অমুকের। তিনি বলেছেন, ‘বিশেষ দিবস ছাড়া নাটক তেমন করা হয় না। আগামী ঈদের জন্য একটি বা দুটি নাটকে কাজ করব। এর মধ্যে একটি চূড়ান্ত হয়েছে। এতে আমার সহশিল্পী মোশাররফ করিম। এর শুটিং হবে অস্ট্রেলিয়ায়। কিছুদিনের মধ্যেই আমরা অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি।’

-আমি জানি না। আর অমুক মানে তমুকের বউ না? (মডেল ও তার স্বামীর নাম উল্লেখ না করার কারণ নিশ্চয় বুঝতে পারছেন)

-হুম, সাবেক! এখন তো আলাদা।

-শোনেন, এখন এত সাবেক হচ্ছে কেন জানেন?

-না।

-তা হলে একটা গল্প বলি। অবশ্য এটা গল্প না। সত্যি ঘটনা।

-জি বলেন।

-গ্রামে তো ছিলেন?

-হুম।

-তা হলে পিঠা তৈরির আগে, পরে কী কী হয় সেটা তো জানেন?

-ঠিক বুঝতে পারছি না।

-আচ্ছা, আগে গ্রামে থাকাকালীন সময়ে মা পিঠা তৈরির জন্য রাতে চাল ভিজিয়ে রাখতেন। সেই চাল সকালে বা দুপুরে গুঁড়া করা হতো। বাবা যেত বাজারে গুড়, চিনি বা পিঠা তৈরি করতে অন্য যা লাগে সেগুলো কিনতে। সব কিছু শেষে বিকালে পিঠা তৈরি শুরু হতো। একটা উৎসব উৎসব ভাব। আর আমরা যারা ছোট তাদের কিন্তু উৎসব শুরু হতো মা যখন পিঠার চাল ভিজিয়ে রাখত তখন থেকে। তার পর পিঠা খেতে বসে হাতে, শরীরে মাখামাখি অবস্থা। সে এক দারুণ আনন্দ।

-হুম, সারাদিন মনে আনন্দ নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম। বন্ধুদের দাওয়াতও দিতাম।

-আচ্ছা। আর এখনকার ছেলে-মেয়ে? দোকানে গেল। দোকানদারকে বলল, একটা পাটিসাপটা দেন। দোকানদার দিল। হয়তো একটা কামড় দিল, কিন্তু ভালো লাগল না, ফেলে দিল। আরেকটা নিল। তার পর খেয়ে হাঁটা শুরু করল। কিছু বুঝলেন?

-জি বুঝতে পেরেছি।

-শোনেন, আগে বুঝতে হবে একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে কী কী করতে হয়। একজন ছেলেরই তো আরেকজন ছেলেকে বুঝতে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। আর সেখানে একটি মেয়েকে বুঝতে তো যুগ পার হওয়ার কথা। একই কথা মেয়ের ক্ষেত্রেও। কিন্তু না বিয়ে করলাম, ভালো লাগল না ছেড়ে দিলাম। যেন পিঠা কিনলাম, পছন্দ হলো না নতুন একটা কিনলাম। যদি জানত এ পিঠা তৈরির আগে কত কিছু করা হয়েছে, তা হলে ফেলে দিত না।

কোনো এক আড্ডায় এ প্রতিবেদককে কথাগুলো বলেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা মোশররফ করিম। কথাগুলো কিন্তু ঠিকই, যারা পিঠা তৈরির আগে ও পরের কাজগুলো জানেন, তারাই দিব্যি সুখে-শান্তিতে সংসার করে যাচ্ছেন। বর্তমানে বিনোদন অঙ্গনে যেখানে বিচ্ছেদের খবর হরহামেশাই শোনা যাচ্ছে, সেখানে যুগের পর যুগ একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দিয়ে সবার কাছে হয়ে উঠেছেন দৃষ্টান্ত অনেকে। এমনই ১০ তারকা দম্পতিকে নিয়ে এ আয়োজন।

সৈয়দ হাসান ইমাম-লায়লা হাসান

১৯৬৫ সালের ৩০ জুন ভালোবেসে বিয়ে করেন সৈয়দ হাসান ইমাম ও লায়লা হাসান। তাদেরকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব বলা যায়। বাংলাদেশের সফল ও আদর্শ দম্পতিদের তালিকায় তাদের নাম প্রথম দিকেই থাকবে। এক ছেলে ও দুই মেয়ের সফল পিতা-মাতা সদা হাসিখুশি এই তারকা দম্পতি ইতোমধ্যে বিবাহিত জীবনের হাফ সেঞ্চুরি পার করেছেন।

রামেন্দু মজুমদার-ফেরদৌসী মজুমদার

বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনের দুটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম রামেন্দু মজুমদার ও ফেরদৌসী মজুমদার। ১৯৬১ সালে একই সঙ্গে দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ফেরদৌসী বাংলায়, রামেন্দু ইংরেজিতে। সাবসিডিয়ারি ছিল সমাজবিজ্ঞান। সেখানেই তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো। কিন্তু তৎকালীন সময়ে ধর্মের বেড়াজাল পেরিয়ে একে অন্যের গলায় মালা পরানো সহজ ছিল না। শত বাধা ডিঙিয়ে ১৯৭০ সালে তারা বিয়ে করেন। প্রায় চার যুগ পেরিয়ে এখনো দুজন সুখে-দুঃখে পরস্পরের পাশে আছেন।

আলী যাকের-সারা যাকের

চার দশকের দাম্পত্য জীবন তাদের। নাটকের দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের মাধ্যমে দুজনের পরিচয়। নাগরিকের প্রতিষ্ঠাপরবর্তী সময় থেকেই আলী যাকের জড়িত। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন সারা যাকের। একসঙ্গে থিয়েটার করার সূত্র ধরেই আলী যাকের আর সারা যাকেরের কাছে আসা। মনের অজান্তে দিনে দিনে বন্ধুত্ব থেকে একসঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন। ১৯৭৭ সালে সুখের নীড় রচনা করে এখনো স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন তারা। তাদের দুই সন্তান ইরেশ যাকের ও শ্রেয়া সর্বজয়া। তারাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গে পথ চলছেন।

ড. ইনামুল হক-লাকী ইনাম

ড. ইনামুল হক ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একই সঙ্গে তিনি একজন প্রখ্যাত নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতা। তার দাম্পত্যসঙ্গী বরেণ্য নাট্যজন লাকী ইনাম। তিনি ১৯৭২ সালে ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ দলে যোগ দেন। একই দলে কাজ করতেন ইনামুল হক। সেখান থেকেই তাদের ঘনিষ্ঠতা। বিবাহিত জীবনের প্রায় তিন যুগ পার করেছেন তারা। তাদের সংসারে রয়েছে দুই মেয়েÑ হৃদি হক ও প্রৈতি হক।

রফিকুল আলম-আবিদা সুলতানা

রফিকুল আলম ও আবিদা সুলতানার প্রথম দেখা হয় বাংলাদেশ বেতারে। তৎকালীন ঢাকা স্টেডিয়ামে একটি সংগীত সম্মেলনে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন শিল্পী লাকী আখন্দ। গানের জগতে একসঙ্গে পথ চলতে চলতেই তারা একে অন্যের কাছাকাছি আসেন। ১৯৭৪ সালে তাদের প্রেমের সূচনা, ১৯৭৫ সালে বিয়ে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ছাদের নিচে বাস করে দেশের সংগীত পিপাসুদের গান শুনিয়ে মুগ্ধ করে যাচ্ছেন।

নাঈম-শাবনাজ

১৯৯১ সালে প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা এহতেশামের ‘চাঁদনী’ ছবির মাধ্যমে নাঈম-শাবনাজ জুটির অভিষেক হয়। কয়েক বছরের অভিনয় জীবনে ২০টি ছবিতে কাজ করেছেন তারা। নাঈম-শাবনাজ অভিনীত অধিকাংশ ছবিই ছিল ব্যবসাসফল। একসঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করতে গিয়েই তাদের ঘনিষ্ঠতা। ১৯৯৪ সালের ৫ অক্টোবর তারা বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। বিয়ের পর চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান তারা। এখনো বিনোদন জগতের সফল জুটির কথা বললে তাদের নাম প্রথম দিকেই আসে। দাম্পত্য জীবনে সুখী এই জুটির এখন সময় কাটে দুই মেয়ে, সংসার আর ব্যবসা নিয়ে।

ওমর সানী-মৌসুমী

তারকা জগতের জনপ্রিয় দম্পতি ওমর সানী ও মৌসুমী। ১৯৯৫ সালে অনেকটা চুপিসারেই বিয়ে করেন। ছেলে ফারদিন গর্ভে আসার পর বিয়ের বিষয়টি প্রকাশ করেন তারা। তৎকালীন শেরাটন হোটেলে জাঁকজমকপূর্ণভাবে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এ বছর তাদের বিয়ের ২২ বছর পূর্ণ হয়েছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সুখে সংসার করছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এ তারকা জুটি। তাদের প্রথম কাছাকাছি আসা ‘দোলা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। ছেলে ফারদিন ও মেয়ে ফাইজাকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার।

জাহিদ হাসান-সাদিয়া ইসলাম মৌ

বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’ গানের সঙ্গে দুজন প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেন। এর পর জাপানে একটি সাংস্কৃতিক সফরে গিয়ে মৌয়ের প্রতি প্রথম ভালোবাসা অনুভব করেন জাহিদ হাসান। তখন তিনি টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা আর মৌ জনপ্রিয় মডেল ও নৃত্যশিল্পী। ওই সময় পত্রিকায় তাদের নিয়ে প্রচুর গসিপ হয়েছে। পত্রিকার লেখালেখিই তাদের সম্পর্কের ভিত তৈরি করেছে। তারা ভেবেছেন, সত্যিই তাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হলে কেমন হয়। মৌয়ের পরিবার শুরুতে রাজি ছিল না। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯৭ সালে তারা বিয়ে করেন। মেয়ে পুষ্পিতা ও ছেলে পূর্ণকে নিয়ে তাদের এখন সুখের সংসার।

তৌকীর আহমেদ-বিপাশা হায়াত

বর্তমান সময়ের তরুণ প্রজন্মের কাছে আদর্শ এক জুটির নাম তৌকীর আহমেদ ও বিপাশা হায়াত। তৌকীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিপাশা আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাদের প্রথম পরিচয় হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ২৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে। একসঙ্গে নাটক করতে গিয়ে তাদের ভালোবাসার শুরু। ১৯৯৯ সালে তারা বিয়ে করেন। মেয়ে আরিশা ও ছেলে আরীবকে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। ভালোবাসার ভেলায় ভেসে পার করে দিলেন প্রায় দেড় যুগ।

মোশাররফ করিম-রোবেনা রেজা জুঁই

গত দশকের শুরুর দিকে সেগুনবাগিচায় একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করতেন মোশাররফ করিম। তখন তিনি এতটা জনপ্রিয় ছিলেন না। একই কোচিংয়ে পড়তেন জুঁই। তখন থেকেই জুঁইকে পছন্দ করতেন, কিন্তু বলতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে জুঁইও সেই কোচিংয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। মোশাররফ করিম তার মনের কথা জুঁইকে বলেন। প্রথম দিকে জুঁই মোশাররফের ভালোবাসার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেও কয়েক দিন পর জুঁইয়ের মুখ থেকে ‘হ্যাঁ’সূচক সম্মতি বের হয়। বরিশালের সন্তান মোশাররফকে শুরুতে জুঁইয়ের পরিবার মেনে নিতে পারেননি। অবশেষে মোশাররফ-জুঁই চার বছর প্রেমের পর ২০০৪ সালে বিয়ে করেন। একমাত্র সন্তান রোবেন রায়ান করিমকে নিয়ে এখন তাদের সুখের সংসার। দাম্পত্য জীবনের এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেছেন জনপ্রিয় এই জুটি।

বিনোদন সময় প্রতিবেদক

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে