আবার আসিব ফিরে...

  ফয়সাল আহমেদ

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমি আদৌ দেশ ছেড়ে যাইনি। মাকে দেখতে গিয়েছিলাম। দুদিন পর ফিরে আসার কথা; কিন্তু কীভাবে যেন আটকা পড়ে গেলাম। আর ফিরতে ফিরতে এত বছর কেটে গেল। আমার সঙ্গে মায়েরও আসার কথা ছিল। কিন্তু আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। মাকে ছাড়া আসতে হয়েছে এটা ভাবলে কষ্ট লাগে। কষ্ট লাগে ভক্তদের কথা ভেবে, তাদের ছেড়ে আমি এতটা বছর বাইরে আছি।’

অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলো বলছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবির নায়িকা অঞ্জু ঘোষ। তার কথায় স্পষ্ট, নিজ ইচ্ছায় দেশ ছাড়েননি তিনি। নিয়তি তাকে ভিনদেশে টেনে নিয়ে গেছে। কাঁটাতারের সীমানা পেরিয়ে আসার পথটাও রুদ্ধ করে রেখেছে। তার পরও অঞ্জু জানতেন, ভক্তরা তার প্রতীক্ষায় আছেন। তাদের ডাক আর দেশপ্রেমের তাগিদেই তাকে ফিরতে হবে। পা রাখতে হবে জন্মভূমিতে। সে কারণেই তার ফিরে আসা।

তিনি এলেন দীর্ঘ ২২ বছর পর। ভক্তদের টানেই তার আসা। ‘ভক্তদের ভালোবাসায় আমি অঞ্জু ঘোষ হয়েছি। তাদের ছেড়ে যাওয়ার কথা তো স্বপ্নেও ভাবিনি। কিন্তু সেসব ভক্তকে ছেড়ে দীর্ঘদিন দূরে থাকাই হয়তো নিয়তি। নইলে এমন কেন হবে?’ কথাগুলো বলে কেঁদে ফেললেন নায়িকা।

কত দিন পর দেশে ফিরেছেন, সেটা বড় বিষয় নয়, তিনি এসেছেন এটাই আনন্দের বিষয়। তাই তো বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতিতে হতাশ হতে হয়নি অঞ্জু ঘোষকে। যে প্রাঙ্গণে দিনরাত অভিনয় করেছেন, সেই বিএফডিসিতেই তাকে সম্মান জানানো হয়েছে। শিল্পী সমিতির আজীবন সদস্য পদও দেওয়া হয়েছে তাকে। শুধু তাই নয়, ‘জোসনা কেন বনবাসে’সহ দুটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই আবেগাপ্লুত হয়ে অঞ্জু বলেন, ‘এত দিন পরও আমাকে সবাই মনে রেখেছেন, এটা শিল্পীজীবনের পরম পাওয়া। দেশে এসে এভাবে সম্মানিত হওয়া, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব পাওয়াÑ এ সবই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। ঠিক বলে বোঝাতে পারব না, বিষয়টা কতটা আনন্দের।’

অপ্রত্যাশিত হলেও এটুকু প্রাপ্তি অঞ্জু ঘোষের পাওনা ছিল বলেই মনে করেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট এবং তার সব ভক্ত। কারণ একটাইÑ ‘সওদাগর’ থেকে শুরু করে ‘নরম গরম’, ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘আবে হায়াত’, ‘রাজ সিংহাসন’, ‘রাই বিনোদিনী’, ‘শঙ্খমালা’, ‘বেদের মেয়ে জোসনা’সহ তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করে অগণিত ভক্তের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন তিনি।

যে কারণে তার কাছে দর্শকের প্রত্যাশার কমতি ছিল না। দেশীয় চলচ্চিত্রে তাকে দীর্ঘদিন দেখা যায়নি বলে কখনই তাকে বড়পর্দায় আর দেখা যাবে না এ কথাও মনে করেননি কেউ। তাই তো আরও একবার দেশীয় চলচ্চিত্রে অঞ্জুকে দেখা যাবেÑ এই খবরে আনন্দিত হয়েছেন অনেকেই। অঞ্জু ঘোষের কথায়, ‘শিল্পীর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যখনই তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন, তখনই তার সময়। সময়ের সঙ্গে বদলাবে ছবির ধরন, নির্মাণ ও চরিত্রের ধরন। কিন্তু শিল্পী বেঁচে থাকবেন অভিনয় দিয়ে।’

অঞ্জুর প্রকৃত নাম অঞ্জলি ঘোষ। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় জন্ম। স্বাধীনতার আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভোলানাথ অপেরার হয়ে যাত্রায় নৃত্য পরিবেশন করতেন ও গাইতেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের মঞ্চনাটকে জনপ্রিয়তার সঙ্গে অভিনয় করেন। তখন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম হলে নিয়মিত নাটক করতেন তিনি। ‘দুবাইওয়ালা’, ‘রিকশাওয়ালা’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘রূপবান’সহ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অনেক মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেন ও একশ্রেণির দর্শকের কাছে রীতিমতো ক্রেজে পরিণত হন তিনি।

১৯৮২ সালে নির্মাতা এফ কবির চৌধুরী চলচ্চিত্রে আনেন তাকে। নির্মাণ করেন ‘সওদাগর’ শিরোনামের একটি ছবি। ১৯৮৯ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ নামের একটি ছবি। এর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অঞ্জু ঘোষ। তার বিপরীতে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। মুক্তির পর পরই ছবিটি তুমুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে।

বলা হয়ে থাকে, এ ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যকে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো ছবি টপকাতে পারেনি। অথচ এই ছবিতে অভিনয় করতে চানানি অঞ্জু ঘোষ। তিনি বলেন, “আমি তো প্রথমে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবিতে কাজ করতে চাইনি। আমার আশপাশে অনেকেই এসে বলছিল, আরে এই ছবি করবা, এটা অনেক বাজে একটা ছবি হবে। কিছু না বুঝে আমি প্রথমে ছবি থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। তার পর আমি ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করি এবং ছবিটি শুরু করি। ছবিটি এত জনপ্রিয় হবে তা আমরা আগে বুঝতে পারিনি।”

১৯৯৬ সালে দেশ ছাড়েন অঞ্জু ঘোষ। তখন থেকেই কলকাতায় বসবাস করছেন এই নায়িকা। ৬ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ২২ বছর পর দেশে এসেছিলেন অঞ্জু। পাঁচ দিন পরই দেশ ছাড়লেন নায়িকা। দেশ ত্যাগের সময় তিনি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। অশ্রুসিক্ত হয়ে ফের উড়াল দিয়েছেন কলকাতায়। যাওয়ার আগে তিনি বলেছেন, ‘এটা আমার দেশ। আমি বারবার ফিরে আসব এই দেশে, এই মাটিতে।’

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে