‘আইয়ুব বাচ্চু : দ্য গ্রেট মিউজিশিয়ান’

  তারেক আনন্দ

২০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:৫৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

গীতিকবি লতিফুল ইসলাম শিবলী। তার কথায় অসংখ্য গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত ব্যান্ড লিজেন্ড আইয়ুব বাচ্চু। তার এই আকস্মিক চলে যাওয়ায় সংস্কৃতি অঙ্গনসহ সারাদেশের মানুষের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। লতিফুল ইসলাম শিবলীর ভেতরটাও দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। কত স্মৃতি, কত গান যে তারা বেঁধেছেন একসঙ্গে। গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছিলেন এই গীতিকবি। দীর্ঘক্ষণ কথা হয় তার সঙ্গে।

আপনার সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর পরিচয় কীভাবে?

‘তবুও’ অ্যালবামের মাধ্যমে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। যদিও তার আগে বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার দুটি কাজ হয়। চট্টগ্রামের একটি ব্যান্ড ছিল ‘ওরফিয়াজ’। সেই ব্যান্ডে দুটি গান ছিল। একটি গান হচ্ছে ‘বাবার চিঠি’, আরেকটি ‘আমার ছোট্ট বেলার বন্ধু ছিল রনক’। এ দুটি গান বাচ্চু ভাইয়ের হাতে কীভাবে যে পৌঁছেছিল, সেটা আমার মনে নেই। আমি এটা শিওর যে, সরাসরি তাকে আমি গান দিইনি। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে আমার প্রথম জনপ্রিয় গান ‘জেল থেকে বলছি’। এর পর উনি আমাকে ডেকে পাঠালেন। তখন তিনি ‘তবুও’ অ্যালবামের কাজ করছেন। আমি লিরিক নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করি। প্রথম তার সঙ্গে আমার দেখা মৌচাকের বাসায়। একদিন গেলাম। এই প্রথম বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা। ঝাঁকড়া চুল, থ্রি-কোয়ার্টার ও স্যান্ডেল পরে আমার সামনে এলেন।

‘তবুও’ অ্যালবামের কোন গানটি আপনার কথায়?

‘ইট-পাথরের সত্যগুলো গোপন রেখে, কল্পনাতে মনগড়া এক শহর এঁকে, মাছে-ভাতে তার ছেলেটা ভালোই আছে, বাড়ি ফিরে বন্ধুরে তুই আমার কথা মাকে বলিস।’ এটা ছিল বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম গান।

তার সঙ্গে তো আপনার অনেক গান হয়েছে?

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার অনেক গান আছে। কয়টি গান হবে তা কখনো গুনিনি। অনুমানও করতে পারব না। কিছু গান আছে যেটি বাচ্চু ভাই নিজে সুর করেছেন, নিজে গেয়েছেন। আর বাদবাকি কিছু গানের সুর বাচ্চু ভাই নিজে করেছেন, গেয়েছেন অন্য শিল্পীরা। সেই অর্থে আমার কতগুলো গান আছে তার সঙ্গে সেটার সঠিক হিসাব বলতে পারব না। গুনে গুনে রাখা আমার কাজও না। এমনও হয়েছে, অনেক দিন পর আমাকে কেউ একজন বলল শিবলী ভাই, আপনার লেখা ওই গানটি শুনলাম। কারণ আমি কালেকশন করে রাখিনি। সলো গানও যেমন লিখেছি, এলআরবির জন্যও লিখেছি।

আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে আপনার লেখা প্রিয় পাঁচটি গানের কথা যদি জানতে চাই, কোনগুলো বলবেন?

‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ এটিকে আমি প্রথমে রাখব। এরপর ‘নীল বেদনা’, ‘আহা জীবন’, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’। আরেকটি গান আছে, এ গানটি অত জনপ্রিয় না; কিন্তু থাকে না প্রিয় গান, সেটা হলো ‘বড়বাবু মাস্টার’।

দীর্ঘদিন একসঙ্গে কেটেছে আপনাদের। ঠিক এ মুহূর্তে কোন স্মৃতিটি মনে পড়ছে?

কত রাত-দিন যে আমরা একসঙ্গে থেকেছি তার কোনো হিসাব নেই। টানা পাঁচ-সাতটি বছর একসঙ্গেই থেকেছি। আমি, বাচ্চু ভাই, জেমস ভাই একসঙ্গে আড্ডা দিতাম। গানগুলো বেশিরভাগই আড্ডায় বসে বসে লেখা। সেই আড্ডাতেই সুর হয়ে যেত। স্মৃতির কোনো শেষ নেই। যদি লিখতে পারি, আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রাখে ও সুস্থ রাখে তা হলে ভবিষ্যতে বই লিখব। বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার সর্বশেষ স্মৃতি বছরখানেক আগে আমার কথায় একটি গানের সুর করেছেন তিনি। এ গানই আমার কথায় বাচ্চু ভাইয়ের শেষ সুর। তখন আমি বাচ্চু ভাইকে হাসতে হাসতে বলেছিলাম, বাচ্চু ভাই আপনি তো মৃত্যুর গান করে ফেললেন।

গিটার জাদুকর চলেই গেলেন। বিদায় বেলায় তাকে নিয়ে আপনি কী বলবেন?

আমি এখনো ঘোরের মধ্যে আছি। কী ঘটল এখনো বুঝতে পারছি না। বিদায় বলতে কিছু নেই। বাচ্চু ভাই চলে যাচ্ছে না, হয়তো আবার নতুন করে ফিরে আসবেন। বাচ্চু ভাই তার কর্মের মাধ্যমে থেকে যাবে। হি ইজ দ্য গ্রেট। আইয়ুব বাচ্চুর নামের আগে বলতে হবে দ্য গ্রেট মিউজিশিয়ান। বাংলাদেশকে যদি কোনো মিউজিশিয়ান রিপ্রেজেন্ট করে আধুনিক মিউজিক দিয়ে তিনি হলেন আইয়ুব বাচ্চু। শিল্পীর তো এক অর্থে মৃত্যু নেই। বাচ্চু ভাই যা করে গেছেন সেটা যুগযুগান্তর থাকবে। ধরো বাচ্চু ভাই বেঁচে আছে, আমি দেশের বাইরে কিন্তু মনে হবে বাচ্চু ভাই সব সময় আছে আমার সঙ্গে। তাকে চাইলেই পাচ্ছি। বাচ্চু ভাই এভাবেই থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

দীর্ঘ পথচলায় আপনাদের মান-অভিমানও হতো নিশ্চয়ই?

বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে আমার শেষ সময়টা কিন্তু বেশ অভিমানের মধ্য দিয়েই গেছে। বাচ্চু ভাই ছিল শিশুর মতো। তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গেই মান-অভিমান ছিল। আমরা জানি তার বিখ্যাত বন্ধু হচ্ছেন জেমস ভাই। আমি বলব, শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে যদি বিশাল বন্ধুত্ব থেকে থাকে তাহলে জেমস ও বাচ্চু ভাই। তাদের সম্পর্কটা ছিল টম অ্যান্ড জেরির মতো। টম ছাড়া জেরির যেমন ভালো লাগে না। আছে না, দুজন-দুজনের মধ্যে লেগে আছে বা খুনসুটি করছে। বাট ভালোবাসা অনেক।

তাদের দুজনকে নিয়ে তো নানারকম মন্তব্যও শোনা যায়। এটিকে আপনি কী বলবেন?

উনাদের সম্পর্কের মধ্যে আমি নেগেটিভ কোনো কিছু দেখিনি। যে যাই বলুক, আমি তো তাদের কাছ থেকে দেখেছি। এটি খুবই বাজে কথা। শোনো, বড় শিল্পীর মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা থাকে। এ প্রতিযোগিতাকে যদি কেউ নেগেটিভ দেখে থাকে তা হলে আমার বলার কিছু নেই। কিন্তু এই প্রতিযোগিতা থাকাটা তো ভালো, ভালোর জন্য। কে কার চেয়ে ভালো গান করতে পারে, কে কার চেয়ে ভালো মিউজিক করতে পারে, এটা তো থাকবেই। তাদের দুজনের মধ্যে এটাই সম্পর্কের বিউটি। গতকাল (বৃহস্পতিবার) জেমস ভাইয়ের গিটার প্লে দেখে আমি নিজেই কেঁদেছি। জেমস ভাই মঞ্চে এটা কী করছেন? সে অঝোরে কাঁদছে, আর বাজাচ্ছে। কষ্ট পেয়ে এভাবে গিটার প্লে করে কান্না করাটা ঐতিহাসিক, চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জেমস ভাইয়ের গিটার প্লেয়িংটা সংরক্ষণ করা উচিত।

আপনার শেষ গানের কথাগুলো কেমন ছিল? যেটি আপনি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, বাচ্চু ভাই এটি তো মৃত্যুর গান হয়ে গেল?

না হয় যাচ্ছি ফিরে/সব পাখি ফেরে নিড়ে/ফিরবো বলেই একদিন/নির্জনতার কাছে যাচ্ছি দিয়ে শোধ/তোমাদের সবটুকু ঋণ/গান শেষে বন্ধু যেন চোখে না আসে জল/মৌনতাকে ভালোবেসে বন্ধু এখন চল বাড়ি চল...

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে