sara

বি থ ঙ্গ ল আ খ ড়া

  ইসমাইল মাহমুদ

২০ এপ্রিল ২০১৬, ০০:০০ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৬, ০০:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

 

 

সিলেট বিভাগের সর্ববৃহৎ আখড়া হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ‘বিথঙ্গল’। বর্ষা মৌসুমে চারদিকে থই-থই জলরাশির মাঝে এ আখড়াটি যেন একটি দ্বীপ। আশপাশে বড় কোনো গ্রাম নেই। কিছু ছোট পাড়া ও একটি বাজার রয়েছে। ইঞ্জিনচালিত নৌকায় হবিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় পৌনে ২ ঘণ্টায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের এ তীর্থস্থানে পৌঁছে যাওয়া যায়। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর আখড়াটিতে আগমন ঘটে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষের। শুষ্ক মৌসুমে দুরূহ যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এ আখড়াটিতে মানুষের আগমন অনেকটা কম থাকে। ঐতিহ্যবাহী জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের ‘বিথঙ্গল’ আখড়াটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানে রয়েছে কয়েকশ বছরের পুরনো বিশাল কিছু ইমারত। এসব ইমারতের আকর্ষণীয় নির্মাণশৈলী আগত দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে। বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আখড়াটি সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।

নৌপথে হবিগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ‘বিথঙ্গল’ আখড়া। হবিগঞ্জ শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় পৌঁছতে হয় কালারডোবা বাজারে; যেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে সহজেই দেড় থেকে পৌনে ২ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায় বানিয়াচং উপজেলার ‘বিথঙ্গল’ আখড়ায়। নৌকা ভাড়া নেয় যাওয়া-আসা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা।

‘বিথঙ্গল’ আখড়াটি সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় আখড়া। এ আখড়ার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রামকৃষ্ণ গোসাই। তিনি জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা জগন্মোহন গোস্বামীর একজন অধঃস্তন শিষ্য ছিলেন। জগন্মোহনী সম্প্রদায় একটি নবীন ধর্ম সম্প্রদায়। প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে হবিগঞ্জ অঞ্চলে এই ধর্ম সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ঘটে। এ সম্প্রদায়ের প্রবর্তক শ্রী শ্রী জগন্মোহন গোস্বামী। তিনি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার বাঘাসুরা গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। মাত্র ৩১ বছর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের হিন্দুরা গৃহত্যাগী ও বৈরাগী বেশধারী। তাই বিথঙ্গল অখড়াটিতে কোনো মূর্তি স্থাপন করা হয়নি। তারা তুলসীপাতা বা গোময়ের ব্যবহার ও মূর্তিপূজা করে না। গুরুকেই শ্রেষ্ঠ উপাস্য বলে মনে করে।

জগন্মোহন গোস্বামীর শিষ্য ছিলেন গোবিন্দ গোস্বামী। তার শিষ্য ছিলেন জগন্মোহন গোস্বামীর পুত্র শ্যাম গোস্বামী। শ্যাম গোস্বামীর শিষ্য ছিলেন হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার রিচি গ্রামের বনমালী দাসের পুত্র রামকৃষ্ণ দাস। তার বয়স যখন ১৬ তখন শ্যাম গোস্বামী একদিন রিচি গ্রামে আসেন। সেখানে তাকে দেখে রামকৃষ্ণ দাসের ভাব বিবর্তন ঘটে। তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ৩৬ বছর বিভিন্ন দেশে ধর্ম প্রচারে সময় অতিবাহিত করে ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে রামকৃষ্ণ ফিরে আসেন এলাকায়। এর পর পরই রামকৃষ্ণ গোসাইয়ের শিষ্যসংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এরই মধ্যে রামকৃষ্ণ গোসাইকে তার দুই শিষ্য বিথঙ্গল গভীর জঙ্গলে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। সেখানকার পরিবেশ রামকৃষ্ণ গোসাইয়ের মনোঃপূত হয়। তিনি সেখানে বসে তপস্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যেখানে তিনি আস্তানা স্থাপন করেছিলেন, সেখানেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে দেশব্যাপী পরিচিত জগন্মোহনী সম্প্রদায়ের তৃতীয় মঠ বিথঙ্গল আখড়াটি। তিনি ছিলেন আখড়ার প্রথম মোহন্ত। আজ থেকে প্রায় ৩৬০ বছর আগে বিথঙ্গলে ৭৬ বছর বয়সে রামকৃষ্ণ গোসাই ইহলোক ত্যাগ করেন।

জানা যায়, বিথঙ্গল আখড়ায় একসময় ১২০ জন বৈষ্ণব বসবাস করতেন। প্রতিজন বৈষ্ণবের জন্য আখড়াটিতে বসবাসের জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ রয়েছে। বৈষ্ণবরা এখানে একত্রে স্নান করতেন। তাদের একত্রে স্নান করার জন্য আখড়ার পাশের দিঘিতে সুদীর্ঘ শান বাঁধানো ঘাট তৈরি করা হয়।

আখড়াটিতে রামকৃষ্ণ গোসাইয়ের সমাধি রয়েছে। তার সমাধিতে একটি আকর্ষণীয় মঠ রয়েছে। এ মঠের সামনে রয়েছে একটি নাটমন্দির। নাটমন্দিরটির পূর্ব দিকে একটি ভা-ার ভবন এবং দক্ষিণ দিকে একটি ভোগমন্দির রয়েছে। আখড়ার অনেক দর্শনীয় বস্তুর মধ্যে রয়েছে ১ হাজার কেজি (২৫ মণ) ওজনের শ্বেতপাথরের চৌকি, পিতলের সিংহাসন, রথ, রৌপ্য নির্মিত পাখি, মুকুট ইত্যাদি।

 

 

"

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে