কিয়েভের ময়দান চত্বরে

  সঞ্জয় দে

১৫ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সান ডিয়েগো, ক্যালিফোর্নিয়া

‘ভোলকনসকি পেটিসেরি এন্ড কাফে’Ñ দোকানটির পেছনভাগে চার কোণে ছোট্ট টেবিল বেছে নিয়ে আমি সেখানে বসি। টেবিলটির উপরিভাগে পেতে রাখা ধূসর রঙের ম্যাট। উল্টো দিকের দেয়ালে ঝুলছে টেম্পোরা আর তেলরঙে আঁকা বেশ কিছু চিত্রকর্ম। ‘তারাশ সেভচেঙ্ক’ সড়কের শেষ প্রান্তে অবস্থিত এ ক্যাফেটিতে ঢুঁ মারার জন্য আমাকে বেশ কয়েকজন উৎসাহিত করেছে। তাদের পরামর্শেই আজকের পড়ন্ত বিকালে ক্যাফের টেবিলে আসন খুঁজে নেওয়া। শতবর্ষী এ দোকানটি অবশ্য তাদের চা-কফির জন্য বিখ্যাত নয়, বরং এখানে অনেকে আসেন এদের তৈরি ‘কিয়েভ কেক’ চেখে দেখতে। আমিও অনেকটা সে লোভেই এখানে এসেছি। ভেতরে ঢুকে আসন গ্রহণের আগেই তাই আমি কাচের আলমারির ওপাশে থাকা একটি কেক দেখিয়ে ওটি অর্ডার করি। বেয়ারা কেকটি পরিবেশনের সময় আরও নিয়ে আসে জিঞ্জার এল্ম ফ্লেভারের চা। সেই চা পরিবেশনের তরিকাটিও বেশ চমকপ্রদ। আমার সামনে এনে রাখা হয় সাবেকি আমলের একটি টি-পট, বাহারি কাপ-প্লেট আর দুধের একখানা ছোট আধার। আমি কেকের টুকরোয় মৃদু কামড় দিয়ে চায়ের পেয়ালায় প্রয়োজনমাফিক চিনি আর দুধ মেশাই। আমার ঠিক বাঁ পাশেই কাচের দেয়াল। ওপাশে স্বল্পায়তনের নিকুঞ্জ। এই সেপ্টেম্বর মাসেই এখানে এখন জমকালো শীত। হিমেল হাওয়ায় ধড়ফড়ে উঠে দোল খায় উদ্যানের মাঝখানে থাকা একটি লাইমগাছের কচি ডাল। গাছের পাশে পিতলের এক সরোবর। হাওয়ার তোড়ে সরোবরের জল ছিটকে পড়ে ভিজিয়ে দেয় কংক্রিটের বাঁধানো পথ। আমি সেদিকে তাকিয়ে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেওয়ার কথা ভুলে যাই।

কিয়েভ কেকটি খেয়ে এটিকে আমার অনেকটা বঙ্গদেশের মিহি ছানার সন্দেশ বলে ভ্রম হয়। পার্থক্য হয়তো এটাইÑ এখানে আয়তকার এই ছানার পি-ের চারধারে মেশানো হয়েছে চকোলেট-ক্রিমের আবরণ। কেক আর চায়ের এই রসপর্ব শেষ হলে আমি ক্যাফের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে নিকুঞ্জে পা ফেলি। আগে খেয়াল করিনি, এখন দেখলাম এখানে এক পাশে রয়েছে পিতলের এক মস্ত কোলাব্যাঙ। লোককথা আছে, যাওয়ার আগে ব্যাঙের মুখে একটি পয়সা ফেলে যেতে হবে। এভাবে যেদিন এটির উদর পুরোপুরি পয়সায় পূর্ণ হবে, সেদিনই আসবে কোনো এক ভাগ্যবানের সুদিন। তিনি যদি পয়সা ঢেলে দিতে চান এর উদরে, তবে সেদিন এটি আর কোনো কিছু গ্রহণ না করে বরং পেটে থাকা সব পয়সা নির্গত করে দেবে সেই ভাগ্যবানের চরণে। নিজের ভাগ্যের ওপর কোনোকালেই আমার খুব একটা আস্থা নেই। তাই ব্যাঙবাবাজিকে আর পয়সা না খাইয়ে আমি ময়দানের দিকে হাঁটি।

মায়দান, অর্থাৎ কিয়েভ শহরের প্রধান চত্বরটিতে বেশ কয়েক ধাপ বাঁধানো সিঁড়ি। আমি সেখানে বসে কিছুটা সময় আশপাশের মানুষের পদচারণা দেখতে পাই। ঠিক পায়ের নিচেই রয়েছে এ শহরের ব্যস্ততম পাতাল রেলস্টেশন। ওদিক পানেই চলেছে এ জনসমুদ্র। তবে সেই সিঁড়িতে পা ছড়িয়ে বসে দুই দ- স্বস্তিতে কাটানো আর সম্ভব হয় না। কারণ তার আগেই ইউক্রেনিয়ান ঐতিহ্যবাহী পোশাক ভিশিভাঙ্কা পরিহিত এক তরুণী দুই কাঁধে বেশ কিছু লাক্ষা কবুতরসহ হাসি হাসি মুখে আমার দিকে ছুটে আসে। তার অভিপ্রায় হলো, আমি তার পাল-পোষ করা কবুতর হাতে নিয়ে দু-চারটে ছবি ওঠাই, আর বিনিময়ে তাকে দিই কয়েক রিভনা। আমি তাকে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলে রীতিমতো ঝুলঝুলি চলতে থাকায় আমাকে এক প্রকার পালাতে হয় সেখান থেকে। আমি চট করে পায়ের নিচের সেই পাতাল স্টেশনে ডুব মারি। আমার উদ্দেশ্য, ময়দানের ওপারে যাওয়া। সামনের বিস্তর চওড়া রাজপথ হেঁটে পার হওয়ার জো নেই। এই পাতালপথ দিয়ে ওপারে যেতে গিয়ে আমার বেশ কিছু মুনাফা হয়। এখানে আছে রাজ্যের কুটির শিল্পের দোকান। দোকানের উপচেপড়া সামগ্রীর মাঝ থেকে জিনিস বেছে নিতে গিয়ে রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হয়। তবু ভালো, স্বল্পশ্রমেই আমি ছেঁকে আনি অপূর্ব কাজের একটি মাতৃওত্রস্কা পুতুল। কাঠের সে পুতুলের ঢাকনা খুলতেই একের পর বেরোয় আরও আটটি ক্ষুদ্রায়তনের পুতুল। প্রতিটির গায়ে ইউক্রেনের গ্রামীণ পরিবারের নানা মুহূর্তের ছবি। একটি দোকানে আবার রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের নামে টয়লেট ন্যাপকিন বিক্রি হচ্ছে; পুতিনকে এখানকার লোকেরা বড্ড ভালোবাসেন কিনা! তাই এমন ব্যবস্থা। ওপারে পৌঁছে ডাঙায় উঠতেই এক ফেরিওয়ালা তার পসরার দিকে আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। স্টালিন-লেনিনের তো বটেই, সেই সঙ্গে তার কাছে আছে চেরনোবিল পারমাণবিক দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া বীরদের প্রদত্ত মেডেল। প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় একসময় মেডেলের গ্রহীতারা হয়তো বেঁচে দিয়েছিলেন ভাঙ্গারির দোকানে। আমি দামদর করে লেনিনের একটি মেডেল খরিদ করি। বুড়ো দোকানদার আমার দেওয়া নোটগুলো জ্যাকেটের বুক পকেটে রেখে মাফলার দিয়ে নিজেকে আরও গাঢ় করে জড়িয়ে নেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে