বৈশাখে বর্ণিল পোশাক

  কেয়া আমান

০৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘জীর্ণ যা কিছু যাহা কিছু ক্ষীণ

নবীনের মাঝে হোক তা বিলীন

ধুয়ে যাক যতো পুরানো মলিন

নব-আলোকের স্নানে’

রবিঠাকুরের কবিতার মতোই বৈশাখের আহ্বানে নবপ্রাণের উচ্ছ্বাস এখন বাংলার জনজীবনে। যার প্রভাব দেখা যায় পোশাকেও। ভাবছেন বৈশাখের পোশাকে

এবার মোটিফ কী থাকছে, কেমন রঙ-নকশা চলছে? ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেনÑ কেয়া আমান

জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনের বারতা নিয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। পুরনোকে বিদায় জানিয়ে এদিন সবাই মেতে উঠবে নতুনের আবাহনে। বৈশাখের নব বারতায় নতুন পোশাকের ছোঁয়া চায় সবাই। যার আয়োজন এখন ফ্যাশন হাউস থেকে বিপণিবিতান সবখানে।

প্যাটার্ন হোক বা মোটিফ, বৈশাখের পোশাকের পুরো আয়োজনে থাকে বাঙালিয়ানা। নকশায় উঠে আসে বাঙালিয়ানা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, প্রকৃতি। বসন্তের বর্ণিলতা, পলাশ-শিমুল-কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা পোশাকের মোটিফে উঠে আসে ঋতুর এমন রঙ-রূপের খেলাও। ফ্যাশন ডিজাইনার ও পরামর্শক চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি প্রতিবছর বৈশাখী পোশাকে নতুনরূপে তুলে আনা হয়। পহেলা বৈশাখ একটা সর্বজনীন উৎসব। আমাদের বাঙালিদের বছরের এই একটা দিনই তো সুযোগ থাকে ধর্ম-বর্ণ ভুলে শুধু বাঙালি হয়ে ওঠার। বাঙালি সংস্কৃতি, ঐহিত্য, বাংলার প্রকৃতির রঙ-রূপের মধ্যে যে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, আর যতটা সুন্দরভাবে এটা পোশাকে তুলে আনা সম্ভব, তা অন্য কোনো নকশায় সম্ভব নয়। আমরা ডিজাইনাররাও তাই চেষ্টা করি বৈশাখী পোশাকে আমাদের বাঙালিয়ানা ঐতিহ্যটাকেই তুলে আনতে।

তিনি আরও জানান, সব ধরনের পোশাকের ক্ষেত্রেই এ বছর ফ্লাওয়ার মোটিফ খুব বেশি দেখা যাবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, নকশি পিঠা, শীতলপাটি, পাখাসহ বাঙালির ঐতিহ্যে বিভিন্ন অংশ দেখা যাবে পোশাকে। বৈশাখ তো লাল-সাদা উৎসব। কেন্দ্রীয় রঙ হিসেবে এটাই থাকছে। সঙ্গে সাহায্যকারী রঙ হিসেবে বিভিন্ন রঙ ব্যবহার হয়েছে।

সালোয়ার-কামিজ, টপস, কুর্তিসহ বৈশাখের বিভিন্ন পোশাকের প্যাটার্নে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বৈশাখী পোশাকে মোটিফ ও ফেব্রিকটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় বলে জানান ডিজাইনার এমদাদ হক। বলেন, ‘সুতি, লিলেন তো আরামদায়ক বটেই। সেই সঙ্গে আদ্দি কটন এ সময়ের জন্য খুব আরামদায়ক। এটা খুব পাতলা ফেব্রিকের ভেতর ডিজিটাল প্রিন্ট করা। আমরা এবার বৈশাখের মোটিফ হিসেবে জিওমেট্রিক ও ফ্লাওয়ার মোটিফ ব্যবহার করেছি। আসলে ফুল, লতা-পাতা, শীতলপাটি, পটচিত্র, সন্দেশসহ প্রকৃতি এবং বিভিন্ন লোকজ মোটিফগুলোই বিভিন্ন হাউসের বৈশাখের পোশাকে নানাভাবে দেখা যাবে। লাল-সাদার পাশাপাশি থাকছে অন্যান্য রঙও। পোশাকের নকশার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার হয়েছে হাতের কাজ, এমব্র্রয়ডারি, স্ক্রিন প্রিন্ট, মানিকগঞ্জের ভরাট, অ্যাপলিক প্রভৃতি। পাইপিংয়ের ব্যবহারে ভিন্নতা আনা হয়েছে সালোয়ার-কামিজ, কুর্তিতে। ছেলেদের শার্টে ফ্লাওয়ার মোটিফ বেশি চোখে পড়বে। টি-শার্টে উঠে এসেছে প্রকৃতি, মুখোশসহ গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। পাঞ্জাবিতে স্ট্রাইপের পাশাপাশি প্রিন্টও এখন জনপ্রিয়।’

সুতি, তাঁত, খাদি সিল্ক, হাফ সিল্ক, মসলিন কিংবা জামদানি শাড়িতে মাতোয়ারা হতে পারেন বৈশাখী উৎসবে। শাড়ির নকশায় প্রাধান্য পেয়েছে ব্লক, স্ক্রিনপ্রিন্ট ও এমব্র্রয়ডারির কাজ। মূলত সাদা ও লালের জমিনে শাড়ির পাড় ও আঁচল সাজানো হয়েছে বিভিন্ন রঙ, ঐতিহ্যবাহী নকশা ও দেশীয় মোটিফে। ঘিয়ে জমিনে মণিপুরি নকশার চিকন লাল পাড়ের শাড়িও রয়েছে পছন্দের তালিকায়।

ফ্যাশন ডিজাইনার লিপি খন্দকার বলেন, সুতি পোশাক এই গরমে শুধু আরামদায়ক নয়, বৈশাখী উৎসবে বাঙালিয়ানা নকশার সঙ্গে সুতির সমন্বয় সেরা। সুতি ছাড়াও লিলেন, তাঁত, হাফ সিল্ক আরামদায়ক হবে। বৈশাখে লম্বা কামিজের সঙ্গে ধুতি ও চুড়িদার সালোয়ার খুব চলবে। তাঁতের শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজে ভিন্নতা এনে নতুনত্ব আনা যেতে পারে। সাদা, ঘিয়ে কিংবা হালকা কোনো রঙের শাড়ির সঙ্গে একটু ট্রেন্ডি প্যাটার্নের লাল গামছা চেকের ব্লাউজ ভিন্নতা আনবে।

ফ্যাশন হাউস রঙ বাংলাদেশ এবার বৈশাখী পোশাকে মূল মোটিফ হিসেবে ব্যবহার করেছে শীতলপাটি, দেয়ালচিত্র ও মঙ্গল শোভাযাত্রা। পাশাপাশি অনুষঙ্গ হিসেবে রাখা হয়েছে ফ্লোরাল মোটিফ। লাল-সাদার সঙ্গে আছে নীল, টিয়া, বাসন্তীও। আড়ংয়ে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, পাঞ্জাবিসহ প্রায় সব ধরনের পোশাকে উজ্জ্বল রঙ প্রাধান্য পেয়েছে। সুতি, ক্যাসমিলন, সিল্ক, মসলিনের কাপড়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুল, জ্যামিতিক মোটিফ। বিবিয়ানার বৈশাখী পোশাকে এ বছর বাংলাদেশের লোকজ মোটিফের পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন দেশের লোকজ মোটিফ। রঙে থাকছে সাদা এবং চাঁপা সাদার সঙ্গে লালের বিভিন্ন শেড। কে-ক্রাফট বৈশাখী পোশাকের থিমে ব্যবহার করেছে নকশিকাঁথা, পটচিত্র, মধুবনী, জ্যামিতিক ও ফুলেল মোটিফ।

বিবিয়ানা, অঞ্জন’স, রঙ বাংলাদেশ, বিশ্ব রঙ,

মায়াসির, দেশাল, কে-ক্রাফটসহ দেশীয় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসে বৈশাখের পাঞ্জাবি পাওয়া যাবে ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, শার্ট ৫০০ থেকে ২ হাজার, টি-শার্ট ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০, সালোয়ার-কামিজ ৮০০ থেকে ৩ হাজার, কুর্তি ও টপস ৬০০ থেকে ২ হাজার, তাঁতের শাড়ি ৭৫০ থেকে ২ হাজার, সুতি ব্লকের শাড়ি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০, সিল্ক, হাফ সিল্ক, মসলিন ২ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। বৈশাখী শাড়ি ও পোশাকের বাজার বসেছে অনলাইন শপেও। বন্ধনশপ ডটকম, হুর নুশরাতসহ দেশীয় বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসের অনলাইন শপ থেকেও ঘরে বসেই কিনতে পারেন বৈশাখের পোশাক।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে