• অারও

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি’র প্রস্তুতি

  সুমন্ত গুপ্ত

১১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একটুর জন্য ট্রেন মিস হয়নি, ট্রেন চলছে তার গতিতে। মাইজগাঁও, কুলাউড়া পেরিয়ে এগিয়ে চলছে ট্রেন। চলতি পথ নিস্তব্ধ হলেও প্রতিটি স্টেশনে জনমানবে পরিপূর্ণ। আমাদের ট্রেন এসে আদমপুর স্টেশনে থামল। চলতি নিয়মে কেউ তার গন্তব্যে যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠছে আবার কেউ বা নামছে। চৈত্রের শেষপাদে বৈশাখের আগমনী ডঙ্কা বাজছে। পুরনো বছরের স্মৃতি জীর্ণতা দূর করে দিনদশেক পরই দুয়ারে আসছে ১৪২৫ বঙ্গাব্দ। বৈশাখের প্রথম দিনে নববর্ষের উদযাপনে মেতে উঠবে পুরো বাঙালি জাতি। আর আমি আর আমার সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত তৈরি হয়ে নিলাম যাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের দিকে। বেলা এগারোটার দিকে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের গন্তব্যপানে। সামনেই নতুন বছরকে বরণ করে নিতে চারুকলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। সেই প্রস্তুতি দেখতেই আমরা এগিয়ে চললাম চারুকলার পানে। আমরা এসে পৌঁছালাম চারুকলার প্রবেশপথে। প্রবেশের পরই দেখা পেলাম চারুকলার সব শিক্ষার্থীর কর্মচাঞ্চল্য। নতুন বছরকে নানা বর্ণিল সাজে বরণ করে নিতে এ সময়ে যে জায়গাটি সবচেয়ে মুখর হয়ে থাকে, সেটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ। সেখানকার শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পহেলা বৈশাখের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে। এ জন্য দেখা গেল, চারুকলা ইনস্টিটিউটের চৌহদ্দির শেষ সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের যাবতীয় উপকরণ। একদিকে অর্থ সংগ্রহের জন্য শিক্ষার্থীরা নানা রঙের, নানা ঢঙের মুখোশ, পুতুল, খেলনা বানিয়ে তা বিক্রি করছেন। আরেকদিকে সংগৃহীত সেই টাকা দিয়ে চলছে কাঠ, বাঁশ দিয়ে বড় বড় কাঠামো তৈরির কাজ। সবাই যে যার মতো কাজ করছে কেউ পট চিত্রে রঙ করছে কেউ, পেপার ম্যাসের কাজ আবার কেউ বা মুখোশ তৈরিতে ব্যস্ত। আমাদের মতো অনেকেই এসেছেন ঘুরে দেখতে, কেউ কেউ ছবি তুলছেন। একজন খুব মনোযোগ সহকারে পটচিত্রে রঙ করছেন। অনুমতি নিয়ে ছবি তুললাম, নাম জানতে চাইলে বললেন, টাইগার নাজির হোসেইন। কি অসাধারণ হাতের কাজ শুধু চেয়ে থাকতে হয়। টাইগার নাজির হোসেইন বলছিলেন, ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে চারুপীঠ নামের একটি প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। যশোরের সেই শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরনো বাদ্যসহ আরও অনেক শিল্পকর্ম। শুরুর বছরেই যশোরে শোভাযাত্রা আলোড়ন তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আদলেই ঢাকার চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের আনন্দ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেন। শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নাচে-গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রংবেরঙের পোশাক পরা ছাত্রছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। বাঁশ এবং বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ‘১৪০০ সাল উদযাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। চারুকলার সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় দিয়ে শিশু একাডেমি হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হয়। এভাবে প্রতিবছরই আয়োজিত হচ্ছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমরা এগিয়ে চললাম সামনের দিকে দেখা পেলাম বিক্রয়কেন্দ্রের, সেখানে কেউ আঁকছেন ছবি আবার কেউ বা চারুকলার ছাত্রদের হাতের তৈরি সামগ্রী বিক্রি করছেন। অসাধারণ সব পটচিত্র, হাতের কাজের সামগ্রী। প্রকারভেদে এক একটার দাম এক এক রকম। বিক্রয়কেন্দ্র থেকে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার কাজে। সামনের দিকে এগিয়ে চললাম, দেখলাম একটি কক্ষে সবাই ব্যস্ত মুখোশ বানানোর কাজে। কেউ কাগজ কেটে মুখোশ বানাচ্ছেন আবার কেউ বা সেই মুখোশগুলো রঙ করছেন। আমি একের পর এক ছবি তুলতে লাগলাম। কথা হচ্ছিল সেখানে কর্মরত দুই শিক্ষার্থী ইস্তিয়াজ, লেকনেশার সঙ্গে। তারা বলছিলেন, জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেসকো বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, যা আমাদের কাছে অনেক গর্বের বিষয়। প্রতিবছরই আমরা সমাজের অপশক্তিকে প্রতিহত করতে একটি প্রতিপাদ্য নিয়ে শোভাযাত্রা করি। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে জাগ্রত হয়ে মাথা, হাত উঁচু করে নির্ভয় হওয়ার আহ্বান জানানো হবে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য বিষয় হলোÑ ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি।’ সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলাম অনুষদের মাঠে শিক্ষার্থীদের কেউ বাঁশ-কাঠ কেটে তৈরি করছেন হাতি-ঘোড়া-মাছ-পাখির আদল কেউ বা মাটি, রঙ ও কাগজ দিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন আকৃতির মুখোশ। কথা হচ্ছিল আনিসুজ্জামান রুহেলের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, মানবমনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য এবারের প্রতিপাদ্য ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ পাবি।’ পহেলা বৈশাখে সবাইকে মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ রইল।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে