সাগর-পাহাড় দর্শন দিনে দিনেই

  ওবায়দুল্লাহ সনি

০৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যরাতে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি, এমন সময় সেলফোনে রিং বেজে উঠল। কিছুটা আঁতকে ওঠার মতোই তা রিসিভ করতেই অপর প্রান্তে শ্যালিকা মমতার (হবু ডাক্তার) আদুরে সুরে আর্জিÑ ‘ভাইয়া আমরা ঘুরতে যেতে চাই।’ বললামÑ ‘অফিস আছে তো, সময় পাব না।’ সে বলল, ‘না ভাইয়া মাত্র একদিন, সবাই মিলে সীতাকু- যাব। সকালে রওনা দিয়ে ঘুরেফিরে আবার সন্ধ্যায় বাসে উঠব। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনি শুধু হ্যাঁ বলুন।’ একদিনেই পাহাড়-সমুদ্র দেখে আবার ঢাকায় ফেরা, ঘুম ঘুম চোখে কোনোকিছুই আমার মাথায় ঢুকছিল না। তাই এদিক-সেদিক না ভেবেই বলে দেইÑ ‘ঠিক আছে।’ শেষের কথাটা শোনার পর আনন্দে আত্মহারা আমার পাশে থাকা রমা (আমার স্ত্রী) আর মুনা (শ্যালিকা)। যদিও পরে জানতে পারি, সব পরিকল্পনা তারা আগেই করে রেখেছে।

সপ্তাহ দুয়েক পর আসে সেই দিনটি। অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর। সকাল হতে না হতেই রমার ডাকাডাকি। দ্রুত রেডি হয়ে চলে গেলাম মালিবাগের গ্রিনলাইন বাস কাউন্টারে। সকাল সাড়ে ৭টায় বাস। আগে থেকেই টিকিট কেটে রেখেছে ডা. বাপ্পী (মমতার স্বামী)। তাই কোনো চিন্তা নেই। আমাদের খুদে সাহিত্যিক লামিয়াকে নিয়ে তারা পৌঁছতেই বাসে চেপে বসলাম। তার পর কিছুক্ষণ চলল সেলফি পর্ব। যখন ঘড়ির কাঁটা ৭টা ৩০ মিনিটের ঘরে, আধো ঘুমন্ত ঢাকার বুক চিরে বাস ছুটল চট্টগ্রামের উদ্দেশে। আমাদের গাইড বাপ্পী সবাইকে বুঝাচ্ছিল কখন কোথায় এবং কতক্ষণ থাকব। কেননা সময় ধরে না চললে অনেককিছুই হয়তো মিস করে যাব। সাগরে আছে আবার জোয়ার-ভাটার খেলা।

সকাল ১০টার দিকে বাস গিয়ে থামল কুমিল্লার জম জম রেস্টুরেন্টে। ২০ মিনিটের বিরতি। গ্রিনলাইনের সৌজন্যে বুফেতে খেয়ে আবার যাত্রা। সীতাকু-ের সীমানায় ঢুকতেই দূর থেকে পাহাড়ের হাতছানি। চারদিকে যতদূর চোখ যায় কেবল সবুজ আর সবুজ। যেন সবুজ গালিচায় আচ্ছাদিত পুরো প্রকৃতি। পূর্বদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড় আর পশ্চিমে সুবিশাল সমুদ্র। চলন্ত বেলায় এ দৃশ্য দেখেই নেচে উঠল হৃদয়। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বাস আমাদের নামিয়ে দিল কুমিরায়। ক্যাপ্টেন বাপ্পীর নির্দেশানুযায়ী সময় নষ্ট না করে সিএনজিতে ছুটলাম সন্দ্বীপ শিপঘাটে। তবে ভাটার কারণে জেটি থেকে তখন বিশাল সমুদ্রকে মনে হচ্ছিল পদ্মা নদী। কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল জাহাজ। প্রখর রোদে শ্রমিকরা ব্যস্ত তা ভাঙার কাজে। কিছুক্ষণ পরই শুরু হলো জোয়ার। সাগরের উত্তাল ঢেউ ভেঙেই সন্দ্বীপের উদ্দেশে ছুটে চলেছে একের পর এক স্পিডবোট। আর জেটির কংক্রিটের পথ ধরে মানুষের আসা-যাওয়ার দৃশ্যটাও দেখার মতো, সাগরপারের মানুষগুলোর জীবনবৈচিত্র্যটা ভালোই টের পাওয়া গেল। পটাপট কিছু দৃশ্য লেন্সবন্দি করে ফেলল আমাদের ক্যাপ্টেন।

দুপুর গড়াতেই ইকুপার্কের উদ্দেশে যাত্রা। অটো আর ছোট বাস থেকে নেমে সিএনজি ভাড়া। উঁচু পাহাড়ের বুক বেয়ে সেটি আমাদের নিয়ে গেল ঝরনার পথে। তবে কিছুটা দূর গিয়েই নামিয়ে দিলেন চালক। সেখান থেকেই ওই পথ নেমে গেছে সিঁড়ি বেয়ে। কখনো কখনো ঝরনা থেকে নেমে আসা খাল পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ২ হাজার ২০০ ফুটেরও বেশি পথ। কিছু সিঁড়ি আবার ভাঙা। তাই শরীরে ভর করল ভয়াবহ ক্লান্তি। পাহাড়ি পথে চলার অভ্যাস না থাকায় প্রচ- কাঁপছিল দুই পা। তবে সব ক্লান্তিই দূর হয়ে গেল ঝরনা দেখে। অনেক ওপর থেকে বড় বড় পাথরের বুক চিরে নেমে আসছিল ‘সুপ্তধারা’। অপূর্ব সেই দৃশ্য। সঙ্গে হিমশীতল দক্ষিণা বাতাস। ছবি তোলার নেশায় পিচ্ছিল পাথরে পা রাখতে গিয়ে পড়ে গেল লামিয়া ও মুনা। এগুলোও যেন অ্যাডভেঞ্চারেরই অংশ। ঝিরিপথে জোঁকের ভয় তো রয়েছেই। সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে, ক্যাপ্টেনের তাড়া। এবার টার্গেট গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি অবশ্য মুরাদপুর বিচ নামেই পরিচিত। সীতাকু- বাজার থেকে এর দূরত্ব ৫ কিলোমিটার। দুটি সিএনজি ভাড়া করে তাতে চেপে বসলাম ছয়জন। বিভিন্ন জায়গা থেকে ভেসে আসা দুর্গাপূজার ঢাকের তালে অটোরিকশাগুলো ছুটল গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে। গন্তব্যে পৌঁছতেই চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সি বিচটিকে সাজাতে প্রকৃতি যেন কোনো কার্পণ্যই করেনি। একদিকে দিগন্তজোড়া জলরাশি, অন্যদিকে সবুজ কেওড়া বন। বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারদিকে শ্বাসমূল। সোয়াম্প ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের মতো পরিবেশ। সময় কম থাকায় না হেঁটে গ্রামরক্ষা বাঁধ থেকে বোটে করে বিচে পৌঁছলাম। সবুজের মাঝে অসংখ্য সাদা বকের বিচরণ দেখে দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। তবে সৈকতকে ভিন্নতা দিয়েছে সবুজ গালিচার বিস্তৃত ঘাস। তার মাঝে প্রাকৃতিকভাবেই বয়ে গেছে আঁকাবাঁকা নালা। দূর থেকে দেখে মনে হবে, বিশালাকৃতির একেকটা সবুজ ফুটবল। সাগরের পাশে নরম ঘাসের এমন উন্মুক্ত প্রান্তর দেখে সবাই যেন হারিয়ে গেলাম প্রকৃতির মাঝে। একের পর এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল পায়ে। লাল সূর্যটাও এক সময় হারিয়ে গেল সমুদ্রের বুকে। সেখানে কিছুক্ষণ কাটানোর পর মনে হলোÑ জীবন আসলেই সুন্দর। ফেরার পথে সাগরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে উপলব্ধি করলাম, এই অল্প সময়েই আমি সীতাকু-ের প্রেমে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছি।

ছবি : মাহবুব হাসান বাপ্পী

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে