মাধবকু- জলপ্রপাতে একদিন

  রুমান হাফিজ

০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কলেজ থেকে ঘোষণা দেওয়া হলো এবারের শিক্ষা সফর হবে মাধবকু-ে। মাধবকু- শুনে আমি বেশি খুশি হয়েছিলাম, তার কারণ হলো সিলেটের বেশিরভাগ পিকনিক স্পটে যাওয়া হলেও এই একটি জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। সেই দিক থেকে আমার আগ্রহটা অনেকখানি বাড়তি ছিল। মাধবকু- জলপ্রপাত সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। সবাই যার যার মতো করে প্রস্তুতি নিতে লাগল। পূর্বনির্ধারিত দিনে সবাই এসে হাজির হলো ক্যাম্পাসে।

সকাল ৮টা। আমাদের বহনকারী বাসগুলোও এসে পড়েছে। তত্ত্বাবধায়ক স্যার সবার হাতে একটা করে সিøপ দিয়ে দিলেন। যেখানে শিক্ষা সফরে আমাদের কী কী আয়োজন রয়েছে তার একটা সূচি। সবাইকে জড়ো করে প্রিন্সিপাল স্যার উপদেশমূলক সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন। সকালের হালকা নাশতা শেষ করে সবাই উঠি গাড়িতে।

সকাল ৯টা। সিলেট শহরের মেজরটিলা থেকে চারটি বাসে করে দুইশতের কাছাকাছি বিশাল এক বহর নিয়ে যাত্রা শুরু হলো মাধবকু-ের উদ্দেশে। আমাদের সব গাড়িতেই মাইকের ব্যবস্থা ছিল। আর সেটা যাত্রাপথের আনন্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে কোনোভাবেই কমতি রাখেনি! যেতে যেতে সবাই নিজ নিজ উদ্যোগে মজার মজার গান, আবৃত্তি, বক্তৃতা, কৌতুক ইত্যাদি বলতে লাগল। সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি আমিও, স্বরচিত ছড়া বা কবিতা আবৃত্তি করলাম। গাড়ি চলছে মাধবকু-ের দিকে।

সিলেট শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। চারদিকে সবুজ-শ্যামল অপরূপ প্রকৃতি আমাকে ভীষণভাবে টেনে নিতে লাগল। গাড়ির গ্লাস দিয়ে যতদূর চোখ যাচ্ছিল শুধু সবুজ আর সবুজ। এরই মধ্যে বাস করেছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অসংখ্য মানুষ। যেখানে নেই কংক্রিট শহরের জঞ্জাল কিংবা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত অবধি বিরতিহীন চলা যন্ত্রদানবদের হইহুল্লোড়। ইট-পাথরের শহুরে জীবনে গ্রামীণ এসব কেবলই কল্পনা!

হঠাৎ করেই স্যার মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে ঘোষণা করলেন, আমরা মাধবকু-ের একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছি। স্যারের কথায় আমার সম্বিত ফিরে।

গাড়ি এসে থামল নির্ধারিত স্থানে। একসঙ্গে নেমে শুরু হলো গ্রুপ ফটোসেশন। তার পর আমরা ছুটে চললাম কাক্সিক্ষত মাধবকু-ের দিকে।

চারদিকে উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়, চেনা-অচেনা নানা জাতের গাছপালা, পাখপাখালির কিচিরমিচির শব্দ, উঁচু-নিচু পথÑ সব পাড়ি দিয়েই পৌঁছাই মাধবকু- জলপ্রপাতে। প্রাণভরে দেখতে লাগলাম। পাহাড়ের ওপর থেকে অবিরাম পানি ঝরে পড়ছে। নিমিষেই হারিয়ে গেলাম অন্য এক জগতে!

সবাই মিলে মেতে উঠলাম আনন্দ-উল্লাসে। পানিতে নামা নিষেধ থাকায় তা আর সম্ভব হয়নি। পাশ দিয়ে বয়ে চলা পানিতে অনেকেই হাতমুখ ধোয়া কিংবা দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগল। তারপর ফিরে এলাম পাশের চা বাগানের দিকে।

পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলায় গড়ে ওঠা চায়ের বাগান, অসম্ভব সুন্দর লাগছিল। সবাই চা বাগানের সবুজপত্রের মাঝে একাকার হয়ে যায়। তখনি মনে হলো, কতই না সুন্দর আমার সোনার বাংলা। সৃষ্টির অপূর্ব নিদর্শন।

তত্ত্বাবধায়ক স্যারের মাইক্রোফোনে ঘোষণা শুনে সবাই একত্রিত হলো খেলার মাঠে। খেলাধুলা, পুরস্কার বিতরণ, খাওয়াদাওয়া একে একে শিডিউল শেষ হতে চলল।

এবার ফিরে যাওয়ার পালা। সবাই যার যার গাড়িতে ওঠে। বিকাল ঘনিয়ে সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই। গাড়ি চলছে মাধবকু- ছেড়ে ইট-পাথরে ঘেরা চার দেয়ালে বন্দি শহরের দিকে। সেখান থেকে চলে আসতে মন চাইছিল না, কিন্তু কী আর করা!

শরীরজুড়ে ক্লান্তির ছাপ, মনের মধ্যে ভালো লাগার এক ভিন্ন অনুভূতি। স্মৃতি হয়ে রইল জীবনের পাতায় মাধবকু- ভ্রমণ।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে