খেজুর রসের খোঁজে

  মো. জাভেদ হাকিম

০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শীত এলো কিন্তু রস খাবো না তা কী করে হয়। কিন্তু নানান কারণে বাজারের কেনা রস পান করব না। এদিকে আবার খেজুর রসের আয়ুষ্কাল স্বল্প হওয়ায় সময়-সুযোগ করে উঠতে উঠতেই দিন ফুরিয়ে যায়। তবে এবার খুব জোরেশোরেই এর পিছু নিয়েছিলাম। আমারই খুব পরিচিত অথচ অজানা ছিল তার বাড়ির পাশেই খেজুরের রসের লুটোপুটি। জানার পর থেকেই তাকে বিরক্ত করতে শুরু করলাম তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। এক রকম গায়ে পড়েই যাকে সোজা বাংলায় বলে বেহায়াভাবেই তার বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তাব কবুল করাতে বাধ্য করলাম।

শুক্রবার সকালেই জসিম, কচি ও শাহাদাতকে সঙ্গে করে ছুটলাম মাদারীপুরের উদ্দেশে। দুপুর ১২টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম মধ্যচক নামক গ্রামে। সুনসান নীরবতার গ্রাম, চারদিকে বিস্তৃত সরিষার ক্ষেত, অবারিত সবুজের সমারোহ, ঘুঘুর অবিরাম সুর, বিষণœতার আবর্তনে ঘূর্ণায়মান যে কোনো মানুষের মন ভালো হয়ে যাবে নিশ্চিত। আর ভ্রমণপিপাসুদের ক্লান্তি তো দৌড় দেবে হলদে রাঙানো সরিষা ফুলের গন্ধে।

জুমার নামাজ আদায় করে আ. হালিম সাহেবের বাড়িতে প্রবেশ করলাম। সানি প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করছিল। পরে আমাদের ‘দে ছুটের’ লম্ফঝম্প দেখে সেও ‘দে ছুটের’ সদস্য হয়ে গেল। গাছ থেকে পেড়ে ডাবের মালই খেতেই ভাত রোড হয়ে গেল। মিতু আপার ডাক পড়ল ভাত খেয়ে যাও। পেটে সবারই ক্ষুধা, তাই দেরি না করে ঘরে ঢুকলাম। ওয়াও! নানান পদের ভর্তা মোটা চালের ভাত হরেক প্রকার শাক আর টাটকিনি মাছের চড়চড়ি যাকে বলা চলে ষোলো আনাই বাঙালিয়ানা। পেট পুরে খাবার খেলাম। এর পর চলে এলো রসের পিঠা। আহা মিতু আপা আপনার যে হয় না তুলনা! সত্যিই মিতু আপার মিতালী ভাব মনে থাকার মতো। বিশ্রাম না নিয়ে চলে গেলাম আড়িয়ালখাঁ নদীর ধারে। নদীর দুকূল যেন মমতাময়ী কোনো শিল্পীর তুলিতে আঁকা ক্যানভাস। মধ্যচক গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখি, ইতোমধ্যে পরিচয় হলো ফেরিঘাটের বাসিন্দা বাদশা নামের এক সুশ্রী তরুণের সঙ্গে। বেচারা বেজায় খুশি আমাদের সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে। আসরের নামাজ শেষে বাদশা নিয়া গেল মৌমাছির মধুচাষ প্রকল্পে। মধুচাষ সম্বন্ধেও জানা হলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে বাজারে এসে রসমালাই আর গরম গরম মিষ্টি চেটেপুটে খাওয়া হলো। কিন্তু সারাদিন ঘুরেফিরে গাঁয়ের কোথাও রসের বাইদানির দেখা পাইনি। কি জানি বাপু ভার্চুয়াল এ যুগে তারাও হয়তো বদলে গেছে। রাতে হবে তালগাছের নিচে সরিষা ক্ষেতের পাশে বারবিকিউ। তার পরই শুরু হবে বহু কাক্সিক্ষত রসপানের আয়োজন। গাছিকে আগেই বলা আছে, তবে বারবি কিউর জন্য দেশি মোরগ জোগাড় করতে হবে। সানি ছুটল মোরগের খোঁজে, আমরাও ছুটলাম তার পেছনে পেছনে। তরতাজা দুটো মোরগ জোগাড়ও হলো। রাত নয়টায় শুরু হলো মুরগি পোড়া বারবি কিউর আয়োজন। কনকনে শীত হার মানল ক্যাম্প ফায়ারের কাছে। বেশ মজা হলো। রাত যখন ১১টা ৪০ মিনিট তখন রসের জন্য তাগিদ দেওয়া হলো। এবার ক্ষেতের আইল ধরে ছুটলাম গাছির বাড়ির দিকে। গাছির লজ্জাবতী বউর মানা এত রাত্রে গাছে উঠবে না। বলে কী বেটি। চোখের সামনে রসের হাঁড়ি আর আমরা নাকি ফিরে যাব ঘুমের বাড়ি। তা হতে পারে না। দায়িত্ব নিল বাদশা। অগত্যা গাছি গাছে উঠল। নিচে নামিয়ে নিয়ে এলো পরপর দুটো হাঁড়ি। আহ কী সুধা। খেজুরের রস তোমায় পান করি না কতদিন হয়। মুহূর্তেই সাবাড় করে দিলাম দুহাঁড়ির রস। চৌচির হয়ে যাওয়া জমির মতো এতদিন আমাদের বুকের ছাতিও রসের আশায় ফেটে গিয়েছিল। আমরা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই গাছির সোনা বউও পরম আনন্দিত হলো আমাদের উচ্ছ্বাস দেখে। এবার ঘুমানোর পালা, ছুটতে হবে কাকডাকা ভোরে। ব্যস্তময় শহর রাজধানীর বুকে। মিতু আপার লটপটি রাতে আর খাওয়া হলো না। ফজরের নামাজ আদায় করতেই আবারও শীতল রসপান। অতঃপর ছুটে চলা আপন শহর রাজধানী ঢাকা।

খেজুরের রস খাওয়া যাবে ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। গাছের নিচে পরম সুখে রসপান করতে হলে যেতে হবে মানিকগঞ্জ, পিরোজপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর অথবা যশোর।

ছবি : শওকত আজম

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে