x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ

  অনলাইন ডেস্ক

১৩ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইতিহাসের ম্যাগনাকাটার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, সে ভাষণটি পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম ভাষণ হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে পাকিস্তানি হানাদারদের কামান-বন্দুক-মেশিনগানের হুমকির মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ওই দিন বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভাষণটি স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রস্তুতির দিকে ঝুঁকে পড়তেও উৎসাহিত করে। এটি মুক্তিবাহিনীতে যোগদানকারী মুক্তিযোদ্ধাদের অংশগ্রহণের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীই বঙ্গবন্ধুর প্রাজ্ঞ ও কৌশলী ভাষণটিকে গণতন্ত্রের জনক জন আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, আব্রাহাম লিংকনের ভাষণটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত ও লিখিত। আর শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি ছিল অলিখিত এবং তাৎক্ষণিক। সে হিসাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণটি আব্রাহাম লিংকনের ভাষণটিকেও ছাপিয়ে গেছে। তাই এ ভাষণটি যুগোত্তীর্ণ।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেশের বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠান চলাকালে প্রচারে বাঙালি জাতির হৃদয় ও মনকে উৎসাহিত করে। এ ভাষণ এ দেশের মানুষকে এবং পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে অনুপ্রাণিত করছে।

১৮ মিনিট স্থায়ী এ ভাষণটি একাধিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়। নিউজউইক ম্যাগাজিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বিশ্বে প্রামাণ্য ঐতিহ্য : গত ৩০ অক্টোবর ইউনাইটেড নেশন এডুকেশন, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো) ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) বিশ্বে প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। প্যারিসে ইউনেস্কোর প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির মহাপরিচালক ইরিনা বুকোভা এ ঘোষণা দেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্রার স্মৃতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি ইউনেস্কো কর্তৃক তৈরি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্যের একটি তালিকা।

এটি বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহ্যগত তাৎপর্যপূর্ণ প্রামাণ্য দলিলগুলোর আন্তর্জাতিকভাবে রেজিস্ট্রার্ড একটি তালিকা। আন্তর্জাতিকভাবে রেজিস্ট্রার্ডকৃত এ তালিকা তৈরির উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যগত প্রামাণ্য দলিলগুলোর সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি (আইএসি) কোনো প্রামাণ্য দলিল বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে রেজিস্ট্রার হবে কিনা বা যোগ্য কিনা, তা বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকে। এ কমিটি এ বছর ২৪ থেকে ২৭ অক্টোবর আয়োজিত সংগঠনটির বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বে আন্তর্জাতিক রেজিস্ট্রার্ড মেমোরি হিসেবে মনোনীত করে। বর্তমানে মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে সব মহাদেশ থেকে ৪২৭টি প্রামাণ্য দলিল ও সংগ্রহ তালিকাভুক্ত রয়েছে।

বিশ্বের সেরা ভাষণের তালিকায় ৭ মার্চের ভাষণ : খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেরা ভাষণ নিয়ে ২২৩ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ইংরেজিতে অনূদিত ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেসÑ দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার্ড হিস্টোরি’ নামের এ বইটি সংকলন করেছেন জ্যাকব এফ. ফিল্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিলের ভাষণ দিয়ে শুরু করা সংকলনের শেষ ভাষণটি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের। বইটির ২০১ পৃষ্ঠায় ‘দ্য স্ট্রাগল দিস টাইম ইজ দ্য স্ট্রাগল ফর ইন্ডিপেন্ডেনস’ শিরোনামে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ২০১৪ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বইটি প্রকাশিত হয়।

৭ মার্চের ভাষণের স্বীকৃতিÑ নেপথ্যে

অধ্যাপক রোকেয়া : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে ইউনেস্কোর দেওয়া স্বীকৃতির নেপথ্যে রয়েছেন ইডেন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রোকেয়া খাতুন।

ছয় বছর আগে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ তিনিই প্রথম ইউনেস্কোয় তুলে ধরেন। একটি জাতি কী করে এক জাদুকরী ভাষণেই একটি দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারে, সেটাই উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।

রোকেয়া খাতুন ইডেন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। এর আগে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ছিলেন তিনি। পরে ২০০৭ সালে প্রেষণে বদলি হয়ে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোয়। ২০১১ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় কোরিয়ান ইউনেস্কো আয়োজিত ‘সেকেন্ড রিজিওনাল ট্রেনিং ওয়ার্কশপ অন দ্য ইউনেস্কো, মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন রোকেয়া। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঐতিহ্যগত গুরুত্ব আছে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে বাংলাদেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ নথি বা প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপনের। প্রথম দিকে স্থানীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন হিসেবে ‘চর্যাপদ’ তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি এমন কিছু তুলে ধরার পরিকল্পনা করেন, যা সত্যিকারভাবেই বিশ্বে ভিন্ন এক স্বীকৃতি লাভ করতে পারে। এ ব্যাপারে রোকেয়া খাতুন গণম্যাধ্যমে জানান, আমার স্বামী পুলিশ কর্মকর্তা শাহ মিজান শাফিউর রহমান আমাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, পৃথিবীর বুকে একমাত্র একজন নেতার একটি ভাষণই গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। সেটা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। ইউনেস্কোর তালিকায় ঠাঁই পেতেও যে ভাষণের রয়েছে পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্যতা ও ঐতিহাসিক প্রভাব। এরপর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে রোকেয়া যোগ দেন ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় কোরিয়ান ইউনেস্কো আয়োজিত ‘ইউনেস্কো মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ডে’। অধ্যাপক রোকেয়া জানান, সেখানে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ৭ মার্চের ভাষণের ওপর আমার উপস্থাপনা প্রশংসা পায়। এর মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের চেয়ারপারসন রে অ্যাডমন্ডসন আমার উপস্থাপনের ভূয়সী প্রশংসা করে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের গুরুত্ব উপস্থানে বেশ কিছু মতামত ও পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর হলেও বঙ্গবন্ধুর সেই জাদুকরী ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতি বাংলাদেশকে আরও একধাপ এগিয়ে নিল। আমি সেই প্রয়াসের ক্ষুদ্র অংশ হতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি। যখন প্রথম এ আনন্দ ঘোষণা শুনেছি, তখনই আনন্দে আত্মহারা হয়েছি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে