পাকিস্তানি নির্মমতার সাক্ষী বধ্যভূমি

  অনলাইন ডেস্ক

২৬ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নৃশংসতায় ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ শহীদ হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই সবচেয়ে বড় গণহত্যা। পাকিহানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল-শামস সাধারণ নাগরিক, মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ধরে নিয়ে হত্যার জন্য কিছু নির্দিষ্ট স্থানকে ব্যবহার করত, যেগুলো পরবর্তী সময়ে বধ্যভূমি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিভিন্ন সময়ে দেশের ৩৫টি স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মোট কতগুলো স্থান বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সে-সংক্রান্ত কোনো তালিকা পাওয়া যায় না; তবে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এ দেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১১৬টি স্থানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ শামীম ফরহাদ

বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মহান স্বাধীনতাযুদ্ধকালে পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক ব্যবহৃত ‘বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ’ নামের একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করেছে, যাতে প্রথমে দেশের ১৭৬টি বধ্যভূমি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে ১২৯টি বধ্যভূমি সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলো হলোÑ ঢাকা জেলায় আটটি, রাজবাড়ী জেলায় তিনটি, ফরিদপুরে চারটি, নরসিংদীতে চারটি, মুন্সীগঞ্জে পাঁচটি, টাঙ্গাইলে দুটি, শেরপুরে দুটি, কিশোরগঞ্জে এগারোটি, ময়মনসিংহে নয়টি, মানিকগঞ্জে একটি, শরিয়তপুরে একটি, গাজীপুরে একটি, জয়পুরহাটে পাঁচটি, নওগাঁয় সাতটি, রাজশাহীতে তিনটি, নাটোরে ছয়টি, পাবনায় একটি, বগুড়ায় চারটি, রংপুরে দুটি, লালমনিরহাটে একটি, গাইবান্ধায় নয়টি, পঞ্চগড়ে চারটি, ঠাকুরগাঁওয়ে চারটি, নীলফামারীতে ছয়টি, দিনাজপুরে একটি, চট্টগ্রামে এগারোটি, সুনামগঞ্জে দুটি, হবিগঞ্জে একটি, যশোরে তিনটি, ঝিনাইদহে দুটি, খুলনায় দুটি, পিরোজপুরে দুটি, বাগেরহাটে একটি ও ভোলায় একটি করে বধ্যভূমি রয়েছে।

রায়েরবাজার বধ্যভূমি : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদানর বাহিনী কর্তৃক বুদ্ধিজীবী হত্যা একটি ন্যক্করজনক ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানি বাহিনী যখন পর্যুদস্ত হতে শুরু করেছে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তানি শাসকচক্র বাংলাদেশকে চিরতরে মেধাশূন্য করার এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। তারা ভেবেছিল এ দেশকে মেধাশূন্য করা গেলে বাঙালি জাতির মেরুদ- ভেঙে যাবে। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু থেকেই তারা হত্যা করেছিল বাঙালি জাতির বিবেক, চেতনা, মননশীলতা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এ মাটির সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। তবে ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এই বর্বরতা ও হত্যাযজ্ঞ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনা ও মদদে এ দেশীয় একশ্রেণির দালাল এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, নাট্যকার, শিল্পী প্রভৃতি শ্রেণির বুদ্ধিজীবীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং এই হত্যাযজ্ঞ ঘটায়। তারা ড. গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, শহিদুল্লাহ কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বীসহ এ দেশের প্রথম সারির অনেক বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিজয় লাভের কিছুদিন পর তাদের ক্ষত-বিক্ষত লাশ ঢাকার রায়েরবাজার ইটখোলায় পাওয়া যায়। তাদের স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে এই বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়, যা রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ নামে পরিচিত।

জল্লাদখানা বধ্যভূমি : জল্লাদখানা বধ্যভূমি বা পাম্পহাউস বধ্যভূমি ঢাকার মিরপুর-১০ নম্ব^রে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি বধ্যভূমি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মিরপুরের বিহারি অধ্যুষিত এলাকাগুলো সাধারণত বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন সরকার দেশের বধ্যভূমিগুলো চিহ্নিতকরণ ও সংস্কারের প্রকল্প গ্রহণ করে এবং ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের সহযোগিতায় মিরপুরের দুটি জায়গায় খননকাজ চালায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও দুটি বধ্যভূমি আবিষ্কার করে। এরপর এ দুটিসহ পুরো মিরপুরে মোট চারটি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। কথিত রয়েছে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালিদের, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর বিহারি, রাজাকার, আলবদর, আল-শামস, তাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত জল্লাদ দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে বড় বড় সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে রাখত। এ বধ্যভূমি থেকে ৭০টি মাথার খুলি, ৫ হাজার ৩৯২টি অস্থিখ-, মেয়েদের শাড়ি, ফ্রক, ওড়না, অলঙ্কার, জুতা, তসবিসহ শহীদদের ব্যবহার্য নানা জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে তৎকালীন সরকার পুনরায় জল্লাদখানা কর্মসূচি শুরু করে এবং স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনের সার্বিক পরিকল্পনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রচেষ্টায় তৈরি করা হয় জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ। এর পূর্ব পাশে রয়েছে টেরাকোটা ইট ও লোহার সমন্বয়ে তৈরি শিল্পী রফিকুন নবী ও মুনিরুজ্জামানের যুগ্মভাবে করা একটি ভাস্কর্য ‘জীবন অবিনশ্বর’। ২০০৭ সালের ২১ জুন এই স্থাপনাটির দ্বার উন্মোচন করা হয়।

বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি : বাঙলা কলেজ বধ্যভূমি শুধু মিরপুরেই নয়, বাংলাদেশের অন্যতম একটি বধ্যভূমি। মিরপুর ছিল মুক্তিযুদ্ধের শেষ রণক্ষেত্র। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা বাঙলা কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে অজগ্র মুক্তিকামী মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। বর্তমান বিন্যাস অনুযায়ী, কলেজের অভ্যন্তরে বড় গেট ও শহীদ মিনারের মাঝামাঝি প্রাচীরসংলগ্ন স্থানে ১৯৭১-এ পুকুর ছিল এবং হানাদার বাহিনী তার পাশে মুক্তিকামী মানুষকে লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করত। মূল প্রশাসনিক ভবনের অনেক কক্ষই ছিল নির্যাতন কক্ষ। হোস্টেলের পাশের নিচু জমিতে আটককৃতদের লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করা হতো। অধ্যক্ষের বাসভবনসংলগ্ন বাগানে আমগাছের মোটা শিকড়ের গোড়ায় মাথা চেপে ধরে জবাই করা হতো, ফলে হত্যার পর এক পাশে গড়িয়ে পড়ত মাথাগুলো, অন্য পাশে পড়ে থাকত দেহগুলো। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই বাঙলা কলেজ ও আশপাশে নৃশংস হত্যাকা- চলেছে, হয়েছে নারী নির্যাতন। কলেজের বর্তমান বিশালায়তন মাঠটি তখন ছিল ঝোপ-জঙ্গলে ভর্তি। বিজয়ের মুহূর্তে তখন এই মাঠসহ পুরো এলাকা ও কলেজজুড়ে পড়েছিল অজস্র জবাই করা দেহ, নরকঙ্কাল, পচা-গলা লাশ। বিভীষিকাময় গণহত্যার চিহ্ন ফুটে ছিল সর্বত্র।

রহনপুর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের গণকবর : মুক্তিযুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর তথা গোমস্তাপুর উপজেলা ৭ নম্বর সেক্টরের অধীন ছিল। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনী তাদের সহযোগীদের সহায়তায় এখানে নৃশংসতম হত্যাকা- ঘটিয়েছিল। আর তারই অংশ হিসেবে রহনপুরে এই গণকবরটি তৈরি করা হয়। ১০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছিল এই গণকবরে। সীমান্তবর্তী রহনপুর রেলস্টেশন এলাকার বিজিবি ক্যাম্পের পশ্চিম পাশে অবস্থিত গণহত্যার স্মৃতিচিহ্ন। যে স্থানটিতে এ হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছিল সেখানেই এ স্মৃতিসৌধটি নির্মিত হয়।

বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম পশ্চিমে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের পাশে অবস্থিত। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত নিরাপরাধ মানুষকে এখানে ধরে নিয়ে এসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার উদ্দেশ্যেই এ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। সমতল ভূমি থেকে উঁচু সিমেন্টের গোলাকার বেদির ওপর মাথা তুলে দ-ায়মান ৪২ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভ। স্মৃতিস্তম্ভটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার অন্তর্ভুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে তাদের ক্যান্টনমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে।

গল্লামারী বধ্যভূমি : খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে খুলনা অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিকে ঘিরে গড়ে ওঠে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থানেই ছিল রেডিও পাকিস্তানের খুলনা শাখা। তৎকালীন গল্লামারী রেডিও সেন্টার ভবনে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষদের ধরে এনে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে গল্লামারী নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। মূলত রাজাকার ও শান্তি কমিটির সহযোগিতায় এসব হত্যাকা- হতো। শহরের দুই কিলোমিটার অভ্যন্তরে গল্লামারী খালের পাশে এই বধ্যভূমির অবস্থান। খুলনা শহর মুক্ত হওয়ার পর গল্লামারী খাল ও এর আশপাশের স্থান থেকে প্রায় পাঁচ ট্রাকভর্তি মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, ওই স্থানে আনুমানিক ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৫ সালে প্রথম একটি স্মৃতিস্তম্ভ ‘গল্লামারী স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ’ তৈরি করা হয়।

থানাপাড়া বধ্যভূমি : থানাপাড়া রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পদ্মাপাড়ে অবস্থিত। ১৩ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে নিহত হন প্রায় ৪০০ বাঙালি। এ হত্যাযজ্ঞে গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রাণে বেঁচে যান আবদুর রউফ। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, ‘হানাদারদের হত্যাযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে এলাকার সহস্রাধিক নারী-পুরুষ ঘর থেকে বেরিয়ে পদ্মাপাড়ে জমায়েত হয়। এমন সময় খবর পেয়ে পাকিস্তানি সেনারা এসে সবার হাত বেঁধে লাইনে দাঁড় করায়। একপর্যায়ে হানাদারেরা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে কিছুণের মধ্যে সবাই মারা যায়। পাকিস্তানি সেনারা শেষ গুলিটি করে আমাকে। গুলিটি আমার ডান হাতের বাহু ও কাঁধে লাগে। গুলি খেয়ে লাশের স্তূপের মধ্যে পড়ে যাই। পরে পাকিস্তানি সেনারা লাশগুলো জ্বালানোর কথা বলে পেট্রল আনতে যায়। এই ফাঁকে আমি উঠে দৌড়ে নদীতে ঝাঁপ দিই। নদী থেকে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে লাশগুলো জ্বালিয়ে দিতে দেখি।’ লাশগুলো সৎকার করার মতো সেদিন তেমন কেউ ছিল না। তাই সারদা পুলিশ একাডেমীর চানমারী থেকে প্রায় ৯০০ ফুট পশ্চিমে পদ্মা নদীর চরে নিহতদের মাটিচাপা দেয়া হয়। এই গণকবর বা বধ্যভূমি সারদা পুলিশ একাডেমির দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত।

খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি : বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বধ্যভূমি খুনিয়াদীঘি বধ্যভূমি ঠাকুরগাঁও জেলা সদর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে রানীশংকৈল উপজেলার ভা-ারা গ্রামে অবস্থিত। প্রতিদিন শত শত মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের লোকদের ধরে আনা হতো রানীশংকৈল আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করার পর, লাশগুলোকে খুনিয়াদীঘিতে ফেলে দেওয়া হতো। দীঘিপাড়ের শিমুলগাছে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতের তালুতে লোহার পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রেখে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করত। কখনো কখনো হত্যার আগে লোকজনকে কবর খুঁড়তে বাধ্য করত। হত্যার পরে দীঘিপাড়ের উঁচু জমিতে মাটি চাপা দিত । ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মি রাজাকার, আলবদর আর আল-শামসদের সহায়তায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার জন মানুষকে খুনিয়াদীঘিতে হত্যা করে। এর ফলে মানুষের রক্তে দীঘির পানির রঙ হয়ে যায় ঘন খয়েরি। রক্ত, লাশ, কঙ্কালে ভরপুর খুনিয়াদীঘি নামটি আরও সার্থক হয়ে ওঠে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দীঘি থেকে উদ্ধার করা মানুষের হাড়গোড় দীঘির পাড়ে একটি গর্ত করে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। শহীদদের স্মরণে দীঘিপাড়ের ওই জায়গাটিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে জাতীয় চার নেতার মধ্যে অন্যতম আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান স্মৃতিসৌধটি উদ্বোধন করেন।

চুকনগর বধ্যভূমি : পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যেসব গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটি চুকনগর গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ২০ মে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে খুলনার ডুমুরিয়ার ছোট্ট শহর চুকনগরে পাকিস্তানি বর্বর সেনারা নির্মম এ হত্যাকা- ঘটায়। অতর্কিত এ হামলা চালিয়ে মুক্তিকামী ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে তারা। পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বাংলাদেশের খুলনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের একটি জনগোষ্ঠী জীবন বাঁচানোর তাগিদে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মে মাসের মাঝামাঝি সময় বৃহত্তর খুলনার বাগেরহাট, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মোংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনা, ফরিদপুর, বরিশালসহ বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন। ভারতে যাওয়ার জন্য তারা ট্রানজিট হিসেবে বেছে নেন ডুমুরিয়ার চুকনগরকে। ১৯ মে রাতে সবাই চুকনগরে এসে পৌঁছান। পরদিন সকালে সাতক্ষীরা ও কলারোয়ার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করার জন্য চুকনগরে সমবেত হন তারা। সেখানে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। হাজার হাজার মানুষ চুকনগরের পাতোখোলা বিল, কাঁচাবাজার চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, কালীমন্দিরসহ বিভিন্ন শ্মশানে আশ্রয় নেন। ২০ মে সকাল ১০টার দিকে তিনটি ট্রাকে করে হঠাৎ পাকিস্তানি সেনারা চুকনগর বাজারের ঝাউতলায় (তৎকালীন পাতখোলা) এসে থামে। তাদের সঙ্গে ছিল হালকা মেশিনগান ও সেমি-অটোমেটিক রাইফেল। সাদা পোশাকে মুখঢাকা লোকজনও আসে। বেলা ৩টা পর্যন্ত তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতে থাকে। হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচার আশায় অনেকে নদীতে লাফিয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই ডুবে মারা যান। লাশের গন্ধে ভারী হয়ে যায় চুকনগর ও এর আশপাশের বাতাস। মাঠে, ক্ষেতে, খালে-বিলে পড়ে থাকে লাশ আর লাশ। বর্বর পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ শেষে এসব স্থান থেকে লাশ নিয়ে নদীতে ফেলা হয়। চুকনগরের ফসলি জমিগুলোয় আজও পাওয়া যায় সেদিনের শহীদদের হাড়গোড়, তাদের শরীরে থাকা বিভিন্ন অলঙ্কার। চুকনগরে সেদিন কত লোক জমায়েত হয়েছিলেন তার কোনো পরিসংখ্যান নেই।

বক্তাবলী বধ্যভূমি : ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্ব^র নারায়ণগঞ্জের চরাঞ্চল বক্তাবলীর ২২টি গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় রাজাকাররা অতর্কিত হামলা চালিয়ে ১৩৯ জন নর-নারীকে হত্যা করে। এই চরাঞ্চল বক্তাবলীর ২২টি গ্রাম ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অভয়াশ্রম। গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করে আসছিল। মুক্তিযোদ্ধারা নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় অপারেশন চালাতেন এই বক্তাবলী থেকেই। রাতভর অপারেশন করে দিনের বেলায় তারা বিশ্রাম নিতেন কানাইনগর ছোবহানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ আশপাশের এলাকায়। দেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ঠিক সেই মুহূর্তে ২৯ নভেম্ব^র এ দেশীয় দোসরদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই আক্রমণ চালিয়ে জালিয়ে দেয় গ্রামের পর গ্রাম। ১৩৯ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে ধলেশ্বরীর তীরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে