হ্যারি-মেগানের প্রেম

রাজকীয় বেড়াজাল ভাঙার গল্প

  আজহারুল ইসলাম অভি

২১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২১ মে ২০১৮, ০০:২৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রিন্সেস ডায়না ও প্রিন্স চার্লসের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারির রাজকীয় বিয়ে হলো রাজকীয় আয়োজনে। আমেরিকান অভিনেত্রী মেগান মার্কলকে বিয়ে করেছেন যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের ছোট ছেলে প্রিন্স হ্যারি। সিংহাসনের উত্তরসূরিদের তালিকার পঞ্চম স্থানে আছেন হ্যারি। ২০১৬ থেকে প্রেমের সম্পর্ক চলতে থাকা এই জুটির বিয়ে নিয়ে আরও জানুন-

প্রেমপর্ব

জুলাই ২০১৬তে এক বন্ধুর মাধ্যমে মেগান ও হ্যারির সাক্ষাৎ। মেগান সেখানে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। হ্যারি জানান, ওখানে গিয়ে মেগানকে দেখে খুব অবাক হয়েছিলেন তিনি। বন্ধুর মাধ্যমে এই ‘ব্লাইন্ড ডেট’ যে তার জীবনে বড় ঢেউ তুলবে তা তখনই বুঝে গিয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর প্রিন্স হ্যারি মেগানকে নিয়ে ব্যক্তিগত বিমানে করে উড়ে সোজা বতসোয়ানা চলে যান। আর সেখানেই তাদের সত্যিকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর অক্টোবর ২০১৬তে দ্য সানডে এক্সপ্রেসে রিপোর্ট এসেছিল, ‘রোমান্স প্রাথমিক ধাপ তবে প্রেম গভীর’। মেগান এ মাসে ইনস্টাগ্রামে একটি ছবি আপলোড করেন। দুটো কলা জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছেÑ ছবিটি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, ‘গুড নাইট’। আর এটাকেই সবাই রোমান্টিক বলে ধরে নেয়। নভেম্বর ২০১৬তে প্রেমের খবর জানাজানি হয়ে পড়ায় নানারকম মন্তব্য আসতে থাকে। প্রিন্স হ্যারি এতে মিডিয়ার ওপর ক্ষেপে যান কিছুটা। তার বান্ধবীকে নিয়ে জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় বর্ণবাদী আচরণের নিন্দা জানান। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের নিয়ে ট্রলেরও জবাব দেন। এদিকে মেগানের ছবি তুলতে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন সাংবাদিকরা। বেচারিকে পুলিশের কাছে পর্যন্ত যেতে হয় এ কারণে। মেগানের আগের বয়ফ্রেন্ডদের পত্রিকা অফিসগুলো থেকে টাকা সাধা হয়, মুখরোচক গল্প জানার জন্য! ডিসেম্বর ২০১৬তে হ্যারি-মেগান জুটির হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ছবি প্রকাশ করে দ্য সান। মার্চ ২০১৭তে হ্যারির বন্ধুর বিয়েতে অংশ নিতে জ্যামাইকা যান এ জুটি। মে ২০১৭তে প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে পিপ্পা মিডলটনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যান মেগান। তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য রানি এলিজাবেথের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেন হ্যারি এবং দ্রুতই পেয়ে যান সম্মতি। সেপ্টেম্বর ২০১৭তে ভ্যানিটি ফেয়ারে সরাসরি প্রেমের কথা স্বীকার করেন মেগান মার্কল। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই একটা সময় আসবে যখন আমরা একসঙ্গে হাজির হয়ে নিজেদের গল্পটা বলব।’

সবর্ত্র ছিল বিয়ের আমেজ

যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই বিয়ে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। তবু শনিবার বিয়ের আয়োজন দেখতে অনেক মানুষ উইন্ডসর শহরে হাজির হয়েছিলেন। রাজপরিবারের শুভাকাক্সক্ষী ও সমর্থকরা এবং বিশ্ব মিডিয়ার কর্মীরাও জড়ো হয়েছিলেন সেখানে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক লাখ মানুষ শহরের বিভিন্ন সড়কে ছিলেন সেদিন। ব্রিটিশ ডিজাইনার ক্লেয়ার ওয়েইট কেলারের তৈরি বিয়ের পোশাক পরে মেগান মার্কল যখন গির্জায় এসে হাজির হন, তখন শ্বশুর প্রিন্স চার্লস তার হাত ধরে তাকে বিয়ের মঞ্চ পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যান। বিয়ের পর প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের উপাধি হবে ডিউক ও ডাচেস অব সাসেক্স। রাজকীয় বিয়েকে সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের উন্ডসরে গিফট শপ, কোমল পানীয় দোকান ও সড়কের বিক্রেতারা ছিলেন পুরোদমে বেচাকেনায় ব্যস্ত। শহরে ছিল উৎসব উৎসব আমেজ। গিফট পণ্যে হ্যারি বা মেগানের চেহারার ছবি থাকলে তো কথাই নেই, দোকানের তাক খালি হয়ে যাচ্ছিল সেখানে।

বিয়ের কার্ডের নকশা

লন্ডনের বিখ্যাত বার্নার্ড অ্যান্ড ওয়েস্টউড কোম্পানি প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের আমন্ত্রণপত্র নকশা করছে। গত শতকের আশির দশক থেকে এ প্রতিষ্ঠানটি রাজপরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র তৈরির কাজ করে আসছিল।

বিয়ের আলোকচিত্রী

জনপ্রিয় আলোকচিত্রী অ্যালেক্সি লুবোমির্সকি প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের বিয়ের আনুষ্ঠানিক ছবি তুলেছেন।

বিয়েতে অতিথি

যারা ছিলেন

সেন্ট জর্জেস চ্যাপেল গির্জায় ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ এবং ৬০০ নিমন্ত্রিত অতিথি উপস্থিতিতে তারা বিয়ের শপথবাক্য পাঠ করেন এবং আংটি বদল করেন। উইন্ডসর প্রাসাদে এই প্রথমবারের মতো সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে ১ হাজার ২০০ ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আমরিকান টকশো হোস্ট অপরাহ উইনফ্রে, অভিনেতা জর্জ ক্লুনি ও তার স্ত্রী আমাল, সাবেক ফুটবল তারকা ডেভিড বেকহ্যাম ও তার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া, টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামস ও গায়ক এল্টন জন, বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াংকা চোপড়া ।

বিয়ে যেখানে হয়েছিল

হ্যারি ও মেগানের বিয়ে হয়েছে উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে। উইন্ডসর সবচেয়ে পুরনো ও বড় একটি দুর্গ এবং এই দুর্গেই খ্রিস্টীয় রীতিতে বিয়ে হয়েছে মেগান ও হ্যারির। হ্যারি-মেগানের রাজকীয় বিয়ের ভেন্যু ফুলে ফুলে সাজিয়ে তোলার দায়িত্ব পেয়েছেন লন্ডনের ফিলিপ্পা ক্র্যাডোক। তারা সাদা গোলাপ, পিওনি ও ফক্সগ্লোভস ফুলের মাধ্যমে সাজিয়ে তুলবে বিয়ের আসর। ফুলের পাশাপাশি ভেন্যু সাজাতে কয়েক ধরনের সুন্দর পাতাও ব্যবহার করা হবে। আর বিয়ের পর সেই ফুলগুলো সব দান করে দেওয়া হবে স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানে।

রাজকীয় বিয়ের নিরাপত্তা

টেমস ভ্যালি পুলিশ ও লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং ব্রিটিশ ট্রান্সপোর্ট পুলিশ রাজপরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠানে বাড়তি নিরাপত্তা প্রদানে কাজ করেছে। প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের বিয়ের পুরো নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করতে উইন্ডসরের রাস্তায় টহল দিতে দেখা গেছে অস্ত্রধারী ও সাদা পোশাকের বেশ কয়েকজন পুলিশকে। পুলিশ ছাড়াও ডগ স্কোয়াডও রাখা হয়েছিল পুরো এলাকায়।

বিয়ের সাজপোশাক

ব্র্যান্ড রাফ অ্যান্ড রুশো মেগানের পোশাকের ডিজাইন করেছেন। অবশ্য বারবেরি, এরডেম, স্টেলা ম্যাককার্টনি এবং রোলান্ড মৌরেতের নামও রয়েছে মেগানের পোশাকের ডিজাইনারের তালিকায়। পোশাকের ডিজাইন করছেন পাঁচ তরুণ নকশাকার। তারা হলেনÑ সিডনি ক্যাসিডি, হান্নাহ, সিডনি গ্যারেট, গ্লাডিস নাইট ও ইমিলি র্যাডফোর্থ। রাজকীয় কয়েকটি পোশাকের সমন্বয় করে পোশাকটি তৈরি করা হয়েছে। রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী গয়না পরেন মেগান। ডায়নার মৃত্যুর আগে নিজের গয়না দুই পুত্রবধূর জন্য রেখে গেছেন।

বিয়ের খরচ

বিয়ের কেক, ফুল, কুশনকভার থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের কেনাকাটা করা হয়। এই বিয়ে দেখতে অন্তত এক লাখ লোক উইন্ডসরে হাজির হন। এত অতিথি এত উৎসুক মানুষের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এজন্য বিয়ের নিরাপত্তা খাতে খরচ হয় সবচেয়ে বেশি। তবে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হিসাব জানায়নি। কিন্তু ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অব কেমব্রিজের বিয়েতে (প্রিন্স চার্লসের বড় ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম এবং ক্যাথরিন) নিরাপত্তা বাবদ মেট্রোপলিটন পুলিশ (জনগণের করের অর্থ) প্রায় ৬৪ লাখ পাউন্ড খরচ করেছিল। তথ্য অধিকার আইনে এই হিসাব প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের কাছে প্রকাশ করা হয়েছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে কত খরচ হবে কেনসিংটন প্যালেসও বলেনি। যুক্তরাজ্যে ব্রাইডবুক নামে একটি ওয়েবসাইটের হিসাবে বিয়েতে খরচ হতে পারে প্রায় সোয়া তিনশ কোটি পাউন্ড। এর মধ্যে নিরাপত্তার খরচও রয়েছে। তাদের হিসাবে, কেকের পেছনে খরচ হবে ৫০ হাজার পাউন্ড, ফুলের জন্য এক লাখ ১০ হাজার পাউন্ড, খাওয়াদাওয়া বাবদ প্রায় তিন লাখ পাউন্ড ইত্যাদি ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক মিডিয়া বলছে, বিয়ের হল ভাড়ার জন্য খরচ হয় সাড়ে তিন লাখ পাউন্ড। খাওয়াদাওয়ায় আরও প্রায় তিন লাখ পাউন্ড। পানীয়ের পেছনে দুই লাখ। পোশাকে তিন লাখ। ফুলের জন্য এক লাখের বেশি। কেকের পেছনে ৫০ হাজার। গানবাজনার জন্য আরও তিন লাখ। চুল সাজানো ও মেকআপ ১০ হাজার। এবং বিয়ের আংটি ৬ হাজার পাউন্ড।

মেগানের প্রথম বিয়ে

মেগান মার্কলের দ্বিতীয় স্বামী প্রিন্স হ্যারি। তার প্রথম স্বামীর নাম ট্রেভর এঙ্গেলসন। পেশায় ছবির প্রযোজক এই আমেরিকানের সঙ্গে ২০০৪ সালে মন দেওয়া-নেওয়া সারেন মেগান। এরপর অনেক বসন্ত কেটে যায়। দুইজন চুটিয়ে প্রেম করেন। ২০১০ সালের দিকে এসে তারা ভাবলেন, সম্পর্কটা আরেকটু পাকা করা যাক। আংটিবদল করেন ওই বছরই। বছরখানেক অপেক্ষার পর ২০১১ সালে ট্রেভরের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। জ্যামাইকায় তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানও ছিল জাঁকালো। ২০০৪ থেকে ২০১১ সাল। অনেকটা সময়ই বলা যায়। এত বছর প্রেমের পর বিয়েটাই টিকল না খুব বেশিদিন। মাত্র দুই বছর পর ২০১৩ সালে তারা আলাদা থাকা শুরু করেন। ওই বছরই তাদের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। কিছুদিন ধরে সাবেক স্বামী ট্রেভর এঙ্গেলসন নিখোঁজ রয়েছেন।

এক নজরে

প্রথম দেখা : ২০১৬ সালের জুলাইয়ে এক বন্ধুর মাধ্যমে লন্ডনে এই জুটির প্রথম দেখা।

প্রথম সংবাদ শিরোনামে : ২০১৬’র অক্টোবরে ব্রিটিশ মিডিয়ায় তাদের সম্পর্ক নিয়ে গুজব প্রকাশিত হয়।

ফাঁস হওয়া প্রথম ছবি : একই বছরের ডিসেম্বরে ব্রিটিশ মিডিয়া ‘দ্য সান’-এ তাদের ছবি প্রথম প্রকাশিত হয়।

প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠতা : ২০১৭’র ৭ মে এ জুটি চুমু খাওয়া অবস্থায় ক্যামেরায় ধরা পড়েন।

মেগানের স্বীকার : ২০১৭’র ৫ সেপ্টেম্বর এক সাক্ষাৎকারে মেগান স্বীকার করেন, তিনি প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে প্রেম করছেন।

হ্যারির বিয়ের প্রস্তাব : লন্ডনে নটিংহাম কর্টেজে একটি আয়োজনে মেগানকে বিয়ের প্রস্তাব দেন প্রিন্স হ্যারি। সবার সামনে মেগানও হ্যাঁ বলে দেন।

বাগদান : ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর ব্রিটিশ রাজপরিবার ঘোষণা দেয়, প্রিন্স হ্যারি ও মেগান মার্কলের বাগদান হয়ে গেছে।

বিয়েতে রানির ‘হ্যাঁ’ : ১৩ মে বাকিংহাম প্যালেস রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বাক্ষরিত হাতে লেখা একটি নথির ছবি প্রকাশ করেÑ যাতে রানির স্মৃতিকথা জানানো হয়।

এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ : অবশেষে গত শনিবার উইন্ডসর ক্যাসেলের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে হ্যারি-মেগানের বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে