দুই কোরিয়ায় হাওয়া বদল

  আজহারুল ইসলাম অভি

২৮ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৭ এপ্রিল উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী গ্রাম ‘পানমুনজমে’ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুই প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন ও মুন জে-ইনের এক ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যে বৈঠকের দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা বিশ্ব। এর ঠিক দুই মাস পর আবারও বৈঠকে বসলেন দুই দেশের নেতা। কেন এই বার বার বৈঠক, কি উদ্দেশ্য তা নিয়ে আরও বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ

আজহারুল ইসলাম অভি

গত শতাব্দীতে হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই আলাদা হয়ে যায় দুই কোরিয়া। এরপর দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালের জুন থেকে ১৯৫৩ সালের জুলাই পর্যন্ত দুই কোরিয়ার মধ্যে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ হয়। ১৯১০ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জাপানি সাম্রাজ্য কোরীয় উপদ্বীপ শাসন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সাম্রাজ্যের আত্মসমর্পণের পর মার্কিন প্রশাসন উপদ্বীপটিকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখায় ভাগ করে, এর মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণ অর্ধেক নিজেদের দখলে আনে এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী উত্তর অর্ধেক অধিকারে আনে। কোরীয় উপদ্বীপের উত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্যবাদী সরকার, অন্যদিকে দক্ষিণে মার্কিনিদের সহয়তায় প্রতিষ্ঠিত ডানপন্থি সরকার। ৩৮তম সমান্তরাল রেখা ক্রমেই দুই কোরীয় রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ভাগ সৃষ্টি করে। যদিও যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাসপূর্ব পর্যন্ত আলোচনার জন্য যোগাযোগ চলতে থাকে, ধীরে ধীরে দুপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। সীমানাপাড়ে বিচ্ছিন্ন লড়াই সংঘটিত হয়। পরিস্থিতি রণাঙ্গনে রূপান্তরিত হয়, যখন ১৯৫০ সালের ২৫ জুন উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫০ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বর্জন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো না পাওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী রাষ্ট্র কোরিয়ায় একটি সামরিক হস্তক্ষেপ অনুমোদন পাস করে। দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে আন্তর্জাতিক ৩ লাখ ৪ হাজার ১০০ সৈন্যের ৮৮ শতাংশই মার্কিনিরা প্রদান করে এবং জাতিসংঘের অন্য ২০ সদস্য রাষ্ট্র সহায়তা প্রদান করে। প্রথম দুই মাস গুরুতর হতাহত সহ্য করার পর প্রতিরক্ষাকর্মীদের পুসান প্যারামিটারে অবস্থান নিতে বাধ্য করা হয়। এরই মধ্যে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়াই করার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী চীন যুদ্ধে প্রবেশ। চীনা মধ্যস্থতায় দক্ষিণী স্বজাতীয় বাহিনী ৩৮তম সমান্তরাল রেখার পেছনে পশ্চাৎপসরণ করে। এই যুদ্ধ সমাপ্ত হয় যখন ২৭ জুলাই ১৯৫৩-এ কোরীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে কোরীয় অসামরিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হয়, যা দুই কোরীয় রাষ্ট্রের মাঝখানে অবস্থিত একটি আড়াই মাইল (৪ কিলোমিটার) চওড়া সুরক্ষিত বাফার জোন। এখনো ছোটখাটো সংঘর্ষ চলছে।

দুই কোরিয়ার মধ্যবর্তী শান্তিচুক্তি

প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক আগে শেষ হওয়া কোরিয়া যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানে চলতি বছরই শান্তি চুক্তি করবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। আর দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণেও একমত হয়েছে দুই দেশ। ২৭ এপ্রিল দুই দেশের সীমান্তবর্তী গ্রাম ‘পানমুনজমে’ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুই প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন ও মুন জে-ইনের ঐতিহাসিক বৈঠকের পর এক যৌথ ঘোষণায় এ কথা জানানো হয়। ওই যৌথ ঘোষণায় সই করেন কিম ও মুন। দুই নেতা যে বাড়িতে এই ঐতিহাসিক বৈঠক করেন, সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিস হাউস’ বা শান্তির বাড়ি। এই শান্তির বাড়িতে কিম ও মুনের মধ্যে আলোচনার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইয়ুন ইয়াং-চ্যান এক বিবৃতিতে বলেন, দুই রাষ্ট্রপ্রধান কোরীয় উপদ্বীপে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আন্তরিক ও খোলামেলা আলোচনা করেছেন। চ্যানের ওই বিবৃতির পর দেওয়া যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, ‘পুরোপুরি পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমে পরমাণুমুক্ত কোরিয়া উপদ্বীপ গড়ে তোলার অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া দৃঢ়ভাবে একমত। কোরীয় উপদ্বীপে আর কখনো যুদ্ধ হবে না। আর এখান থেকেই শান্তির নবযুগের সূচনা হলো।’ যৌথ ঘোষণায় সইয়ের পর এক উচ্ছ্বাসপূর্ণ বিবৃতিতে কিম জং-উন বলেন, ‘আমরা সবাই এই মুহূর্তের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ছিলাম। আমি আশা করি দুই কোরিয়া আবার ‘পুনর্মিলিত’ হবে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে ঐতিহাসিক আলোচনা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন আর দীর্ঘায়িত হতে পারে না।’

ওই যুদ্ধের পর থেকে এই দীর্ঘ সময়ে কেবল বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের টানাপড়েনের জেরে উত্তেজনার উত্তাপই ছড়াচ্ছিল কোরীয় উপদ্বীপে। এমনকি গত বছরের শুরু থেকে এ বছরের শুরু পর্যন্ত উপদ্বীপটি ঘেঁষে সামরিক যুদ্ধযানের মহড়াও আতঙ্ক ছড়াচ্ছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার শান্তিকামী প্রেসিডেন্ট মুনের প্রচেষ্টায় উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা কমে আসে। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় বসতে সম্মত হন। আগ্রহ দেখান শান্তি প্রক্রিয়ায়। কিম ও মুনের বৈঠকের পর যৌথ ঘোষণা যেন শান্তি প্রক্রিয়ার ‘অগ্রবার্তা’ দিচ্ছে বিশ্বকে। এই অগ্রবার্তাকে স্বাগত জানাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীনসহ গোটা বিশ্ব। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বলা হয়, ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়ায় বেইজিং সাধুবাদ জানাচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদ্বয়কে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাৎক্ষণিক এক বিবৃতিতে দুপক্ষকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘শেষ হচ্ছে কোরিয়ার যুদ্ধ! কোরিয়ায় এখন যা ঘটছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও তার মহান জনগণের গর্বিত হওয়া উচিত।’

দ্বিতীয়বারের মতো আবার বৈঠক

বরফ গলার এক মাসের মধ্যেই দেশ দুটির সীমান্তবর্তী গ্রাম পানমুনজামে ফের বৈঠক করেছেন উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুই নেতা। হঠাৎ করেই সাক্ষাৎ করেছেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন। এ নিয়ে দ্বিতীয়বার সীমান্তের যুদ্ধবিরতি গ্রামে আবারও তাদের দেখা হলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এ বৈঠকের খবর দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঐতিহাসিক বৈঠক নিয়ে ওয়াশিংটন-পিয়ংইয়ংয়ের পাল্টাপাল্টি হুমকির মাঝে দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবার মিলিত হলেন শনিবার। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, সীমান্তবর্তী পানমুনজাম গ্রামে শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত দক্ষিণ ও উত্তর কোরিয়ার নেতাদের মধ্যে বৈঠক হয়। বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে আগামী ১২ জুনের অনুষ্ঠেয় বৈঠক বাতিলের ঘোষণা দিয়ে এক চিঠি লেখেন। এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে অনুষ্ঠেয় ১২ জুনের বৈঠক নিয়ে আলোচনা করতেই ফের এক হয়েছেন দুই কোরিয়ার নেতারা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
ashomoy-todays_most_viewed_news