শীর্ষ বাজেটের ১০ দেশ

  শামীম ফরহাদ

০৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার কর্তৃক প্রণীত রাষ্ট্রের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা হলো জাতীয় বাজেট। সরকারিভাবে বিশ্বে প্রতিবছর বাজেটের মাধ্যমে

১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়। এর বাইরেও

বেসরকারিভাবে আরও বেশি অর্থ খরচ করা হয়। আয়-ব্যয়ের প্রকৃতি অনুযায়ী বাজেটকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়Ñ উদ্ধৃত বাজেট ও ঘাটতি

বাজেট। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরের রাজস্ব আয়ের চেয়ে রাজস্ব ব্যয় বেশি হলে সে বাজেটকে বলে ঘাটতি বাজেট। বিভিন্ন খাতের আয়-ব্যয়ের পরিমাণ সমন্বয় সাধন করে যে বাজেট তৈরি করা হয়, সে বাজেটকে বলে সংশোধিত বাজেট। মূল বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থসংবলিত যে বাজেট অনুমোদনের জন্য সংসদে পেশ করা হয়, তাই সম্পূরক বাজেট। এক অর্থবছরে সরকার উন্নয়ন খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার

পরিকল্পনা গ্রহণ করে তাই উন্নয়ন বাজেট। প্রতিবছর একটি আইন প্রস্তাব বা ‘বিল’ আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপন

করা হয়। একে বলা হয় ‘অর্থ বিল’। সংসদ সদস্যরা অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয়। লিখেছেনÑ শামীম ফরহাদ

যুক্তরাষ্ট্র

টাকার অঙ্কে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেট দেয় প্রায় ৩১ কোটি জনসংখ্যার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের বাজেটের মোট আকার ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫১ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটি তাদের শুধু রাজস্ব অংশ ও ঘাটতি বাজেটের ব্যয়। এর বাইরেও তারা নানা খাত থেকে অর্থ ব্যয় করে। দেশটির অর্থনীতির বড় অংশই নিয়ন্ত্রিত হয় করপোরেট হাউসগুলোর মাধ্যমে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি সে দেশের আইনসভা কংগ্রেসের কাছে আগামী অর্থবছরের ফেডারেল সরকারের বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করে। এর পর তা কংগ্রেসের দুইকক্ষ অর্থাৎ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (নিম্নকক্ষ) এবং সিনেট (উচ্চকক্ষ)-এ পাস হওয়ার পর তা রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর ১ অক্টোবর - ৩০ সেপ্টেম্বর।

চীন

দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজেট দেয় চীন। তাদের বাজেটের আকার ২১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার বা প্রায় ১৮ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বাইরে তাদের দেশেও সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলো আরও বেশি ব্যয় করে। চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১২০ কোটি। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলে দেশটির অর্থবছর। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি শুরু হয় এবং ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়। মার্চে চীনের বাজেট ঘোষণা হয়। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র চীনের বাজেট অনুমোদন দেয় চীন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেশটির সামরিক খাত উন্নয়নের অন্যতম একটি কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ চীন সাগরসহ নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বিরোধ। এসব কারণে প্রতিবছরই সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলছে দেশটি। চীনে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম সেনাবাহিনী।

রাশিয়া

আয়তনের দিক থেকে রাশিয়া পৃথিবীর বৃহৎতম রাষ্ট্র হলেও বাজেটের অর্থের পরিমাণের দিক থেকে তাদের অবস্থান চতুর্থ স্থানে। দেশটির বাজেটের আকার প্রায় ৬ হাজার ৬৪০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। ২০০৮ সাল থেকে প্রত্যেক বছর রাশিয়া ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট দুই বছরের জন্য বাজেট নীতিসংক্রান্ত বিষয়ে নিজের বার্তা পেশ করেন। তাতে দেশের প্রধান বাজেটনীতির প্রধান লক্ষ্যগুলো নির্দেশ করেন। মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির এই বার্তার ওপরে ভিত্তি করেই বাজেট তৈরি করে থাকে। এর পর তা পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ ফেডারেশন কাউন্সিল এবং নিম্নকক্ষে টেস্ট ডুমায় অনুমোদন নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। ১৯১১ সাল থেকে রাশিয়া ক্যালেন্ডার বর্ষকেই অর্থবছর হিসেবে মেনে আসছে। রাশিয়ার জনসংখ্য প্রায় ১৪ কোটি ৯ লাখ।

সৌদি আরব

তৃতীয় বৃহত্তম বাজেট মাত্র প্রায় ২ কোটি জনসংখ্যার দেশ সৌদি আরবের। তাদের বাজেটের আকার ৮ হাজার ৭২০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ১৯৩২ সালে সৌদি আরব সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। দেশটির মূল অর্থনীতি পেট্রোলিয়ামভিত্তিক; বাজেটে রাজস্ব মোটামুটি ৭৫ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের ৯০ শতাংশ তেলশিল্প থেকে আসে। সৌদি আরবে বিশ্বের ভূ-ভাগের ২০ শতাংশ খনিজ তেলের মজুদ রয়েছে। তেল ছাড়াও রয়েছে গ্যাস ও স্বর্ণ খনি। হজ থেকে সৌদি আরবের সরাসরি রোজগার হয় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। হজযাত্রীরা মোটামুটি ২৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ওখানে গিয়ে। দেশটির বাজেট ঘোষণা করেন সৌদি আরবের বাদশা। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলে দেশটির অর্থবছর।

যুক্তরাজ্য

গণতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার এবং বাজেট পদ্ধতির জনক

যুক্তরাজ্য হলেও বাজেটের আকারে তাদের স্থান এখন পঞ্চম। দেশটির বাজেটের আকার ৫ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। সাধারণত অর্থবছর শুরু হওয়ার এক মাস আগেই আগামী বছরের বাজেট পেশ করা হয়। যা তৈরি করে এইচএম ট্রেজারি (হার ম্যাজেস্ট্রিস ট্রেজারি) খ্যাত ব্রিটিশ সরকারের বাজেটনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিমালা বিভাগ। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগকে তহবিলের জন্য বাজেট তৈরির শুরুতে প্রস্তাবনা জমা দিতে হয়। ব্রিটিশ সংসদের দুইকক্ষ হাউস অব কমন্স (নিম্নকক্ষ) এবং হাউস অব লর্ডস (উচ্চকক্ষ) পাস হওয়ার পর কার্যকর শুরু হয়। যুক্তরাজ্যের অর্থবছর শুরু হয়

১ এপ্রিল এবং শেষ হয় ৩১ মার্চ।

জাপান

অষ্টম অবস্থানে আছে জাপান। তাদের বাজারভিত্তিক অর্থনীতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। তাদের বাজেটের আকার প্রায় ৫ হাজার ২৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। জনসংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল এবং শেষ হয় ৩১ মার্চ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে দেশটির জাতীয় বাজেট তৈরি করে থাকে অর্থ মন্ত্রণালয়। বাজেট তৈরির পর তা জাপানের সংসদ ডায়েটের দুইকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস (নিম্নকক্ষ) এবং হাউস অব কাউন্সিলরস (উচ্চকক্ষ) থেকে অনুমোদিত হতে হয়। বাজেট পাস নিয়ে এ দেশেও রয়েছে নানা অঘটন। যেমন কখনো প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে, কখনো বা জোট সরকারকে ক্ষমতা হারাতে হয়েছে।

জার্মানি

বম অবস্থানে রয়েছে জার্মানি। ৫ হাজার ২৮০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশটির। দেশের সংবিধানের ১১০ ধারা অনুসারে বার্ষিক বাজেট প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। জার্মান ফেডারেল সরকার বাজেট প্রণয়ন করে এবং সংসদের অনুমোদনক্রমে তা অর্থবছরের প্রথম দিন থেকে বাস্তবায়ন হয়। জার্মানির সংসদকে বলা হয় রিকস্টেগ। রিকস্টেগের উচ্চকক্ষ হলো ফেডারেল কাউন্সিল বা বুন্দেসট্যাগ এবং নিম্নকক্ষ হলো ফেডারেল ডায়েট। ক্যালেন্ডার বর্ষই জার্মানির অর্থবছর। ইউরোপের সবচেয়ে ধনী অর্থনীতির দেশ জার্মানি। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, সমাজ সুরক্ষায়ও এগিয়ে রয়েছে দেশটি। কিন্তু বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়তে থাকায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতৃত্ব স্থানীয় দেশটি সামাজিক সুযোগ-সুবিধায় কাটছাঁট করছে।

ভারত

এ দেশ কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ বাজেট। তাদের বাজেটের আকার ৫ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা। প্রত্যেক বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ কর্মদিবসে অর্থমন্ত্রী সংসদের বাজেট পেশ করবেন এবং তা লোকসভা (নিম্নকক্ষ) ও রাজ্যসভার (উচ্চকক্ষ) অনুমোদনক্রমে ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়। দেশটির অর্থবছর ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ। ঐতিহাসিক কারণে দেশটির রেল মন্ত্রণালয় সাধারণ বাজেটের বাইরে একটি পৃথক বাজেট পেশ করে থাকে। এই পৃথক বাজেট পেশের সূত্রপাত ঘটে ১৯২৪ সালে। সেই সময় রেলওয়ে বাজেট ছিল দেশের বাজেটের ৭০ শতাংশ। যদিও এখন আর রেলবাজেটকে কোনো পৃথক বাজেট হিসেবে দেখা হয় না, তবু ভারতেজুড়ে এই বাজেট নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়।

ফ্রান্স

সপ্তম অবস্থানে আছে প্রায় ৬ কোটি ২৩ লাখ জনসংখ্যার দেশ ফ্রান্স। তাদের বাজেটের আকার ৫ হাজার ২৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। ১৯১১ সাল থেকে ক্যালেন্ডার বর্ষই ফ্রান্সে অর্থবছর। পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অনুমোদনের পর বাজেট বাস্তবায়ন করা হয়। সংবিধান অনুযায়ী নতুন বাজেট অনুমোদন করার জন্য সর্বোচ্চ ৭০ দিন সময় পায় পার্লামেন্ট। এর পরও সংবিধান অনুসারে সিনেট ও ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের অনুমোদন আটকে দিয়ে সংশোধনী আনতে পারে। যে কোনো প্রয়োজনে বাজেট পাস হওয়ার পরও সরকার মাত্র ২ শতাংশ বাজেট সমন্বয় করতে পারে। ফ্রান্সের বাজেট সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব আদায়ের ওপরে হয়ে থাকে। সামাজিক নিরাপত্ত বাজেট আঞ্চলিক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ করে থাকে।

দক্ষিণ কোরিয়া

দশম অবস্থানে দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের বাজেটের আকার ৫ হাজার ২৭৫ কোটি ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কোরীয় উপদ্বীপের উত্তর অংশটি সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনারা এবং দক্ষিণ অংশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা দখলে রেখেছিল। ১৯৪৮ সালে এ থেকে উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া রাষ্ট্রদ্বয়ের আবির্ভাব হয়। ১৯৫০-৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধের পর ধ্বংসপ্রায় দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৯০ সালে এসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিগুলোর একটিতে পরিণত হয় এবং সেই সঙ্গে এশিয়ান চার ড্রাগনে পরিণত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি ড্রাগন বলা হয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলে দেশটির অর্থবছর। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি শুরু হয় এবং ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে