বিশ্বজুড়ে ঈদ জামাত

  ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

১১ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। পবিত্র রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতর এবং জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ তারিখ পর্যন্ত ঈদুল আজহা পালিত হয় বিশ্বজুড়ে। ঈদের দিন অবশ্য পালনীয় বা ওয়াজিব কাজের একটি হলো সকালে জামাতের সঙ্গে বা সমবেতভাবে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা। মসজিদে, ঈদগাহে বা খোলা মাঠে ঈদের নামাজ পড়া হয় বিশ্বব্যাপী। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশ তো আছেই, আমেরিকা বা ইউরোপেও হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে জামাতে ঈদের নামাজ পড়েন। আজ জানা যাক বিশ্বের উল্লেখযোগ্য কিছু ঈদ জামাত সম্পর্কে। জানাচ্ছেন ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে। ঈদগাহের মাঠে তিন লক্ষাধিক মুসল্লি ছাড়াও আশপাশের মসজিদ, মাঠ ও রাস্তায় নামাজ আদায় করা মানুষের সংখ্যাও সহস্রাধিক। এই বিশাল ঈদগাহের ঐতিহ্য অনুসারে নামাজ শুরুর আগে পরপর তিনবার গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের দাঁড়ানোর সংকেত দেওয়া হয়। এই ঐতিহাসিক ঈদগাহ নিয়ে বেশ কিছু ইতিহাস প্রচলিত। কথিত আছে, ইসলাম প্রচারের জন্য ইয়েমেন থেকে আগত সুফি সৈয়দ আহমেদ ১৮২৮ সালে এই মাঠে প্রথম ঈদের জামাতের আয়োজন করেন এবং প্রথম জামাতে ইমামতিও করেন তিনি নিজে। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসল্লিদের প্রাচুর্য প্রকাশে ‘সোয়া লাখ’ কথাটি ব্যবহার করেন। সেখান থেকেই এই মাঠের শোলাকিয়া নামকরণ। আবার অনেকের মতে, মোগল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়াÑ সেখান থেকে হয়েছে শোলাকিয়া।

সৌদি আরব

সৌদি আরব হলো মুসলমানদের পুণ্যভূমি। মুসলমানদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান কাবা শরিফ এই দেশে অবস্থিত। সারা বছরই এই কাবা শরিফে তাওয়াফ করতে আসেন লাখো মুসল্লি। হজের সময়ের পরই সবচেয়ে বেশি মুসল্লির সমাগম হয় রমজান মাসে। ওমরাহ করতে আসা বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ঈদুল ফিতর পালন করেন এই পবিত্র ভূমিতে। প্রতিবছর আরবজুড়ে সহস্রাধিক স্থানে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু মক্কা ও মদিনা শহরের মসজিদগুলোতেই মুসল্লির সংখ্যা থাকে লক্ষাধিক। কেবল সৌদি আরব নয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতটি হয় মসজিদুল হারামখ্যাত কাবা শরিফে। ২৫ লক্ষাধিক মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন এখানে। আবার মদিনা শহরের মসজিদে নববীতে ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া মুসল্লির সংখ্যাও প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ ছাড়ায়। আর রাজধানী রিয়াদে সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় ইমাম তুর্কি বিন আবদুল্লাহ মসজিদে। এ ছাড়া দেশটির অন্য শহরগুলোর বিখ্যাত মসজিদ ও ঈদগাহে ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়ে থাকে সরকারিভাবে।

মরক্কো

আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম মুসলমানপ্রধান দেশ মরক্কো। ৯৯ শতাংশ জনসংখ্যাই মুসলিম এ দেশটিতে। মরক্কোর প্রধান কয়েকটি শহরের বিভিন্ন মসজিদ ও ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল ঈদ জামাত। যাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হলো মুলাই ইদ্রিস মসজিদ, তাজা গ্রেট, বোও ইনানিয়া মসজিদ। তবে মরক্কো তো বটেই, আফ্রিকার সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত দেশটির ক্যাসাব্ল্যানকা শহরে হয়ে থাকে। এ শহরের হাসান র্যান্ড মসজিদে নামাজ পড়তে পারে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। বিশালতার দিক দিয়ে এ মসজিদের অবস্থান বিশ্বে ১৩তম। একত্রে এ মসজিদের ভেতরের সবক’টি হল ও পার্শ্ববর্তী মাঠে নামাজ আদায় করেন প্রায় ১ লাখ মুসল্লি। এ ছাড়া রাস্তা ও মসজিদের আশপাশে জায়নামাজ বিছিয়ে ঈদ জামাতে অংশ নেন হাজার মানুষ।

মরক্কোর এই মসজিদে লাখ লাখ মুসল্লির ঈদের নামাজ পড়ার কারণ মসজিদটির অবস্থান। মসজিদটি আটলান্টিক সাগরের অনেক কাছাকাছি, তাই সেখানকার আবহাওয়া সবসময় ঠা-া থাকে। আর মসজিদটির ভেতর থেকে উপভোগ করা যায় মহাসাগরের অপার রূপ। এ মসজিদের আরেকটি বিখ্যাত দিক হলো এর অসাধারণ মিনার। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মিনারটি এ মসজিদের।

ইন্দোনেশিয়া

পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বসবাস ইন্দোনেশিয়ায়। পুরো বিশ্বের মুসলিম জনসখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ বসবাস করে ছোট ছোট দ্বীপপুঞ্জে তৈরি এই ইন্দোনেশিয়ায়। এ দেশটিতে বর্তমানে আট লাখেরও বেশি মসজিদ আছে। তবে ঈদের জামাতের জন্য দেশজুড়ে খ্যাত একটি মসজিদই। আর এ মসজিদটির নাম ‘ইসতিকলাল মসজিদ’। রাজধানী জাকার্তায় অবস্থিত ইসতিকলাল মসজিদটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ মসজিদ। মনোরম স্থাপত্যশৈলীই শুধু নয়, মসজিদটির রয়েছে লক্ষাধিক মুসল্লির ধারনক্ষমতা। ঈদের দিন মসজিদের সাতটি বিশাল দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ প্রতি ঈদে এখানে নামাজ আদায় করেন। তবে মসজিদের আশপাশের রাস্তা ও মাঠে চাদর- জায়নামাজ বিছিয়ে জায়গা করে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা, আর সেই হিসাবে মোট সংখ্যা প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি।

ভারত

উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ ভারত। ভারতের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ মুসলমান। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের প্রধান শহরগুলোয় বৃহৎ ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বিখ্যাত ভারতের বৃহত্তম মসজিদ দিল্লির জামে মসজিদ ও এর সংলগ্ন ঈদগাহের ঈদ জামাত। দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ প্রতিবছর এখানে ঈদের নামাজ পড়েন। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত হয় কলকাতার রেড রোডের ঈদগাহে। ঈদগাহ এবং পার্শ্ববর্তী মসজিদ ও রাস্তায় লাখো মুসল্লি নামাজ আদায় করেন একসঙ্গে। এ ছাড়া লক্ষেèৗ, মুম্বাই, হায়দরাবাদের বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ঈদগাহে হাজারো মুসল্লির অংশগ্রহণে বিশাল ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর।

ইউরোপের দেশগুলো

ইউরোপে মুসলমানদের সংখ্যা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর তুলনায় কম। প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি ইউরোপিয়ানদের মধ্যে মাত্র ৭ শতাংশ মুসলমান। তবে ইউরোপের বেশ কিছু দেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। বুলগেরিয়া, ইতালি, স্পেনে মুসলিমদের প্রভাব থাকলেও ঈদে ইউরোপের সবচেয়ে বড় জামাত হয় যুক্তরাজ্যে। খোদ যুক্তরাজ্যেই পাঁচ শতাধিক জায়গায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তার মধ্যে বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত হয় যুক্তরাজ্য তথা ইউরোপের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত। বার্মিংহাম পার্ক নামের পার্কে এই জামাত অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবছর। পুরো যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে মুসল্লিরা এসে সমাবেত হন এখানে। এ ছাড়া পুরো ইউরোপ থেকেই আসেন মুসল্লিরা। গত বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করেন এখানে। বার্মিংহাম পার্ক ছাড়াও বার্মিংহাম শহরের সেন্ট্রাল মসজিদ, গ্রিন লেন মসজিদ ও স্পার্কব্রুক মসজিদে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া লন্ডন, প্যারিসসহ ইউরোপের বেশ কিছু বড় শহরে ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজারো মানুষ রাস্তায় কিংবা পার্কে নামাজ আদায় করেন।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে