এই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কয়েকজন

শুধুই ফুটবলার নন তারা

  ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

০২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০২ জুলাই ২০১৮, ০০:৩৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

চলছে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২১তম আসর। এরই মধ্যে বাছাই পর্বের পাট চুকিয়ে সেরা ১৬টি দল চলে গেছে নকআউট পর্বে। বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এ আসরে ৩২ দলের হয়ে অংশ নিচ্ছেন ৭৩৬ জন ফুটবলার। এদের মধ্যে সিংহভাগই পেশাদার ফুটবলার। মেসি, রোনালদো, নেইমারের মতো বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে সারা বছর ফুটবলের মাঠ মাতিয়ে রাখেন তারা। তবে পেশাদার এসব ফুটবলারের সঙ্গেই বিভিন্ন দেশের হয়ে খেলছেন এমন কিছু ফুটবলার, যাদের বিকল্প পেশাই বরং ফুটবল। নিজেদের মূল পেশা ছেড়ে চলতি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সেসব ফুটবলারের কথা জানাচ্ছেন ফয়সাল চৌধুরী স্বরূপ

হ্যান্স থর হলডরসন

আইসল্যান্ড

মাত্র তিন লাখ জনসংখ্যার একটি ছোট্ট দেশ আইসল্যান্ডের হয়ে প্রথমবারের মতো এসেছিলেন বিশ্বকাপে হ্যান্স থর হলডরসন। হারিয়ে যেতে পারত বহু ফুটবলারের মাঝে তার নামটিও। কিন্তু সাবেক রানার্সআপ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোলপোস্ট দুর্গের মতো আঁকড়ে রেখে এবং লিওনেল মেসির পেনাল্টি শট আটকে রাতারাতি হয়ে গেলেন জনপ্রিয়। কিপিং গ্লাভস হাতে নেওয়ার আগে ৩৪ বছরের হলডরসন ছিলেন ফিল্মমেকার। হাই স্কুল শেষ করে নেমে যান বিজ্ঞাপন, ডকুমেন্টারি আর মিউজিক ভিডিও নির্মাণে। ইউরো কাপসহ বানিয়েছেন বিশ্বকাপ নিয়ে ডকুমেন্টারি। ২০১২ সালে পেশাদার ফুটবলে গোলকিপার হিসেবে ঢোকেন হলডরসন। তবে ফুটবলের পাশাপাশি ছাড়েননি ফিল্মমেকিং এ নেশার জায়গাটা। সম্প্রতি বানিয়েছেন কোকা-কোলার মতো বিখ্যাত কোম্পানির একটি বিজ্ঞাপন। হয়তো বিশ্বকাপ শেষে আবারও বসবেন নতুন কোনো স্ক্রিপ্ট নিয়ে।

হেইমির হলগ্রিমসন

আইসল্যান্ড কোচ

এই বিশ্বকাপের হট ফেভারিট আর্জেন্টিনার সঙ্গে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে আসা আইসল্যান্ড ড্র করে বিশ্বব্যাপী চলে আসে আলোচনায়। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নামের শেষে সন আর গড় উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি ছাড়াও আরেকটি বিচিত্র ব্যাপার ছিল আইসল্যান্ডের, তাদের কোচের পেশা। হেড কোচ হেইমির হলগ্রিমসন ফুটবলারদের প্রশিক্ষণ-পরিচর্যা ছাড়াও দক্ষ আরেকটি কাজেÑ দাঁতের চিকিৎসায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই ঢুকে যান স্থানীয় ক্লাবের ফুটবলার হিসেবে। সাত-আট বছরের খেলোয়াড় জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন একটি ক্লাবের। পাশাপাশি ডেন্টিস্ট হিসেবে রোগীও দেখেছেন নিয়মিত। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ক্লাবের মহিলা-পুরুষ দুটো দলের কোচ ছিলেন। ২০১১ সালে জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে ডাক আসে হলগ্রিমসনের। সেই থেকে জাতীয় দলের সঙ্গেই রয়েছেন। ২০১৬-এর ইউরো কাপের সময় থেকে দায়িত্ব পান প্রধান কোচ হিসেবে। চিকিৎসায় কতটা দক্ষ তার রোগীরা বলতে পারবেন, কিন্তু কোচ হিসেবে যে দুর্বল নন, সেটা তো দলকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আসরে এনে আর গ্রুপ পর্বের খেলাগুলোতেই প্রমাণ দিয়েছেন তার শিষ্যরা।

ভিনসেন্ট কোম্পানি

বেলজিয়াম

এই বিশ্বকাপে প্রবল দাপটের সঙ্গে খেলে যাচ্ছে ডার্ক হর্স বেলজিয়াম। বেলজিয়ামের রক্ষণভাগ দুর্গের মতো আগলে রাখছেন যারা, তাদের মধ্যে ভিনসেন্ট কোম্পানি অন্যতম। বিশ্বকাপের আগে ইনজুরি থাকায় শঙ্কায় ছিলেন বেলজিয়ান দলনেতা কোম্পানি। কিন্তু মজার ব্যাপার, নামের সঙ্গে মিল রেখে কোম্পানির নিজেরই রয়েছে বেশ কয়েকটি কোম্পানি। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে এক দশকেরও বেশি সময় খেলা এ ফুটবলারের নিজেরই রয়েছে একটি ফুটবল ক্লাব। ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুলের এমবিএ করা এ ফুটবলার বার ও কসমেটিকস ব্যবসা ছাড়াও জড়িয়েছিলেন বেলজিয়ামের জাতীয় রাজনীতিতে। এ আসরে বেলজিয়ামের মতোই যেন উজ্জ্বল তার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার।

হিরোকি সাকাই

জাপান

জাপানের কাশিকা শহরে জন্ম সাকাইয়ের। শহরটি দেশের এক প্রান্তবিন্দুতে, যেন হারিয়ে যাবে প্রশান্ত মহাসাগরের অতলে। স্কুল ফুটবল থেকে শুরু, স্থানীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলের হয়ে প্রথম সুযোগ পান, এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যান জাতীয় দলের দিকে। মাঝে বেশ কয়েকটি ইনজুরির জন্য ক্যারিয়ার ডুবতে বসেছিল। অন্যান্য জাপানির মতো কর্মঠ তিনিও, কাজ ফেলে বসে থাকতে পারেননি। পড়ালেখা শেষ করেছেন, চেষ্টা করেছিলেন ফুটবল নিয়ে লেখালেখির, সেই সঙ্গে দক্ষ হয়েছেন মার্শাল আর্টেও। সুযোগ পান জার্মান ও ফ্রান্সের ক্লাব ফুটবলে। ২০১৪ বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকলেও সুযোগ পাননি মূল একাদশে। এরই মধ্যে নিজের শখকে বিকল্প পেশা হিসেবে নেন সাকাই। জুডো, কারাতে, সুমোর জন্মস্থান জাপানের সন্তান হিসেবে লিখেছেন মার্শাল আর্ট ও ফুটবলবিষয়ক বিভিন্ন লেখা। এরপর বিচিত্র জাপানি স্যুপের রেস্তোরাঁ আর বইয়ের প্রকাশনী খুলে বসেন সাকাই। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে আসার আগেই মোড়ক উন্মোচন করে এসেছেন নিজের লেখা প্রথম বইয়ের।

ভ্যালেন্টিন পিমেন্তেল

পানামা

এবারের বিশ্বকাপে

প্রথমবারের মতো অংশ

নেয় মধ্য আমেরিকার ছোট্ট দেশ পানামা। প্রথম বিশ্বকাপ হিসেবে একদমই সুবিধা করতে পারেনি। ইংল্যান্ডের কাছে তো রীতিমতো ছয় গোল হজম করতে হয়েছে তাদের। অবশ্য পানামার সবাই যে পেশাদার ফুটবলার তাও নয়। বেশিরভাগ খেলোয়াড় স্থানীয় ও বিদেশি ক্লাবের সঙ্গে জড়িত থাকলেও ব্যতিক্রম ১৪ নম্বর জার্সির ভ্যালেন্টিন পিমেন্তেল। প্রশান্ত মহাসাগর, ক্যারিবীয় সাগরবেষ্টিত পানামায় মাছ ধরা, চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্য জাহাজের ব্যাপক প্রচলন। পিমেন্তেল এমনই এক জাহাজের ম্যানেজমেন্টে কাজ করেছেন বিশ্বকাপে আসার আগে। তার পড়াশোনাও ছিল এই শিপিং ম্যানেজমেন্ট নিয়েই। স্থানীয় ক্লাবের সূত্র ধরে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত জাহাজেই ক্যারিয়ার গড়ছিলেন তিনি। দেখা যাক বিশ্বকাপের পর তার ক্যারিয়ারের জাহাজ কোন বন্দরে নোঙর করে।

জেমি ভার্ডি

ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার ভার্ডি। এবারের বিশ্বকাপেও বেলজিয়ামের গোলপোস্টে বারবার আক্রমণ করে সেটাই প্রমাণ দিয়েছেন ভার্ডি। লেস্টার সিটির হয়ে পেশাদার খেললেও ভার্ডির রয়েছে আরও পরিচয়। ২০০৭ সালে ক্লাব ফুটবলে সুযোগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন একটি ওষুধ কোম্পানির হয়ে। ক্লাবে ফুটবলার হিসেবে সাফল্য আসার পর তরুণ ফুটবলারদের জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প খোলেন ভার্ডি। এ ছাড়া বিভিন্ন ফুড প্রডাক্টনির্ভর একটি কোম্পানিতেও লগ্নি আছে এই ব্রিটিশ তারকা ফুটবলারের। ২০১৫তে জাতীয় দলে ডাক পান ভার্ডি।

টিম কেহিল

অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বিখ্যাত সকার প্লেয়ার অর্থাৎ ফুটবলার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। এ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। এবারের বিশ্বকাপে মূল একাদশে না নামলেও নিজেদের শেষ ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামেন ৩৮ বছর বয়সী এ অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার। কেহিলের ফুটবল জীবন বর্ণাঢ্য, অসি ফুটবলের পোস্টার বয় বলা হয় তাকেই। নিজের দেশের ক্লাব ছাড়াও খেলেছেন আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চীনের বিখ্যাত ক্লাবে। ২০০৪ সালে জাতীয় দলের হয়ে প্রথম মাঠে নামা, শতাধিক ম্যাচের মধ্যে দলের অনেকগুলো জয়ের নায়ক তিনি। জাতীয় দল ও ক্লাব ফুটবল ছাড়াও কেহিলের রয়েছে আরও পেশা। অর্থ লগ্নি করেছেন বিভিন্ন ধরনের পেশায়। বিভিন্ন দেশে তার রয়েছে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা, নিজেরই রয়েছে দু-দুটো ফুটবল একাডেমি, এ ছাড়া ভিডিও গেমিং ইন্ডাস্ট্রিতেও করেছেন বিনিয়োগ। শুধু ফুটবলের মাঠেই নন, ব্যবসার মাঠেও তিনি যথেষ্ট দাপুটে বোঝাই যাচ্ছে।

আব্দুল্লায়ে দিয়ালো

সেনেগাল

ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো ফুটবল বিশ্বকাপে এবার অংশ নিল সেনেগাল। ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ এ দেশটির প্রথম বিশ্বকাপে আগমন ২০০২ সালে। মজার ব্যাপার, নিজের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই হারিয়েছিল কিনা সেই ফ্রান্সকেই। তবে এবারও চমক ছিল সেনেগালের, পোল্যান্ডকে হারিয়ে আর জাপানের সঙ্গে ড্র করে সম্ভাবনা জাগিয়েছিল পরের পর্বে যাওয়ার, ফেয়ার প্লেতে জাপানই সুযোগ পায় পরের রাউন্ডে। সেনেগালের হয়ে সবচেয়ে আলোচনায় তাদের গোলকিপার আব্দুল্লায়ে দিয়ালো। বেশ কয়েকটি গোল সেভের মাধ্যমে দলকে প্রতিযোগিতায় রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু পেশাগত জীবনে তিনি মূলত ফুটবল প্রশিক্ষক। বংশগতভাবে সেনেগালিজ হলেও দিয়ালোর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে। সেনেগালের হয়ে খেলার আগে অবশ্য ফ্রান্স অনূর্ধ্ব-২০ দলেও খেলছেন দিয়ালো। ১২ বছর বয়সে সুযোগ পান ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্লারফন্টেইন একাডেমিতে বিশেষ সুযোগ পান ফুটবল ট্রেনিংয়ের। এরপর যোগ দেন বিখ্যাত ফরাসি ক্লাব রেনেতে। রেনেতে গোলকিপার হিসেবে খেলেন বিকল্প পেশা হিসেবে, কিন্তু মূলত ক্লাবের ইয়ুথ ট্রেনার হিসেবেই প্রস্তুত করেন তরুণ ফুটবলারদের। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবেও খেলে যাচ্ছে রেনেতে দিয়ালোর কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ ফুটবলাররা।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে