sara

বিশ্বকাপের সেই সব কেলেঙ্কারি

  অনলাইন ডেস্ক

০৯ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৮, ০৯:৫০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড : ডিয়াগো ম্যারাডোনা ফুটবলের একজন জীবন্ত কিংবদন্তি। ম্যারাডোনাকে চেনেন না এমন একজন ফুটবলপ্রেমীও এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও ম্যারাডোনার পিছু ছাড়েনি। মাদকাসক্ত এবং নারী কেলেঙ্কারি নিয়ে বিতর্ক ছিল ম্যারাডোনার নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু ম্যারাডোনার ফুটবল দক্ষতা নিয়ে কারো প্রশ্ন তোলার অবকাশ ছিল না। সমগ্র বিশ্বের কাছে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হলেও ব্রিটিশরা আজও তাকে ধিক্কার জানায় একজন ধোঁকাবাজ হিসেবে। ম্যারাডোনাই জন্ম দেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিতর্কের। ম্যারাডোনার একটি গোল যা ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত।

মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধ গোলশূন্য ড্রয়ের পর দ্বিতীয়ার্ধের ছয় মিনিটের মাথায় ইংল্যান্ডের ডিবক্সের ভেতর উড়ে আসা বলকে হেড দিতে লাফিয়ে উঠেন ম্যারাডোনা এবং ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টন। আশ্চর্যজনকভাবে পিটার শিল্টনের থেকে ৮ ইঞ্চি খাটো ম্যারাডোনা লাফিয়ে হেড দিয়ে গোল করেন। যদিও স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল ম্যারাডোনা হাত দিয়ে বল জালে পাঠাচ্ছেন; কিন্তু রেফারি কিংবা লাইন্সম্যান দেখতে ব্যর্থ হন। সেদিনের সেই গোল নিয়ে এখনো বিতর্ক চলে। স্বয়ং ম্যারাডোনাই এ ঘটনাকে ‘ঈশ্বরের হাত’ বলে দাবি করলেও বিতর্ক থামেনি। ম্যারাডোনার এ গোলটি বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম বিতর্কিত গোল হিসেবে টিকে আছে।

ডিসগ্রাসে অব গিজন : স্পেনে অনুষ্ঠিত ১৯৮২ সালের ফিফা বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ এতটাই বিতর্কিত ছিল, তাদের সমর্থকরাই নিজের দেশের পতাকা পুড়িয়ে দিয়েছিল ক্ষোভে, ম্যাচের ধারাভাস্যকাররা লজ্জায় বলছিলেন সবাইকে চ্যানেল চেঞ্জ করার জন্য। দুই দেশের সম্মিলিত সেই অপরাধে সেদিন কপাল পুড়েছিল আলজেরিয়ার। দেশ দুটি ছিল পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। ম্যাচটি ছিল গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচের আগে সমীকরণটা এমন ছিলÑ ম্যাচ ড্র হলে বা অস্ট্রিয়া জিতলে আলজেরিয়া পরবর্তী রাউন্ডের জন্য কোয়ালিফাই করবে। পশ্চিম জার্মানি তিন গোলের ব্যবধানে জিতলেও আলজেরিয়া পরের রাউন্ডে চলে যেত। কিন্তু আলজেরিয়ার সেই স্বপ্নে পানি ঢেলে ম্যাচ ফিক্সিং করে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। ম্যাচের ১১ মিনিটেই পশ্চিম জার্মানি গোল দিয়ে এগিয়ে যায়। বাকি সময় কোনো দলই আর গোল দেওয়ার চেষ্টা করেনি। ম্যাচ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল হচ্ছে কী। এই কলঙ্কিত ঘটনার পর ফিফা বাধ্য হয়ে নতুন নিয়ম প্রণয়ন করে। এরপর থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচগুলো এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়।

ট্র্যাজেডি অব সেভিয়া : ১৯৮২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে মুখোমুখি ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচের স্কোর তখন ১-১। ফ্রান্স তারকা ফরোয়ার্ড প্যাট্রিক ব্যাটিস্টন দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গোলপোস্টের দিকে বলের পেছনে পেছনে। বিপরীত দিক থেকে দৌড়ে আসছিলেন জার্মান গোলকিপার হেরাল্ড শ্যুমাখার। ব্যাটিস্টনের শট অনেক বাইরে দিয়ে গেলেও শ্যুমাখারের জোরালো ধাক্কা থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি। আঘাত এতটাই ভয়াবহ ছিল, ব্যাটিস্টনের তিনটি দাঁত পড়ে যায়, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান, মেরুদন্ড ভেঙে যায় এবং কোমায় চলে যান তিনি। এর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রাণঘাতী ফাউলের পরেও রেফারি শ্যুমাখারকে কোনো বুকিং না দিয়ে গোলকিকের বাঁশি বাজান। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্য ফাউল করেও কোনো কার্ড দেখেননি, এমনকি ফাউলও দেওয়া হয়নি। বিতর্কিত এ ঘটনাটি ‘ট্র্যাজেডি অব সেভিয়া’ নামে পরিচিত। পেনাল্টিতে ৫-৪ গোলে ম্যাচ জিতে নেয় পশ্চিম জার্মানি। এ ঘটনার পরই ফ্রান্সে ফুটবল অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করতে শুরু করে। ফ্রান্সের জনগণ এ ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখে আরও বেশি একাত্মবোধ করতে শুরু করে ফুটবলের লড়াইয়ের সঙ্গে।

ইংল্যান্ড বনাম পশ্চিম জার্মানির ফাইনাল : ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয় আয়োজক ইংল্যান্ড। খেলার ২০ মিনিটের মধ্যে দুই দলই গোলের দেখা পায়। ৯০ মিনিট শেষে স্কোরলাইন ২-২ থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ১০৩ মিনিটের সময় ইংল্যান্ড তারকা জিউফ হার্স্টের ক্লোজ রেঞ্জের শট ক্রসবারে লেগে গোল লাইনের কাছাকাছি পড়ে। ইংল্যান্ড খেলোয়াড়রা সেটিকে গোল দাবি করছিলেন এবং পশ্চিম জার্মানির খেলোয়াড়রা দাবি করছিলেন বল গোল লাইন ক্রস করেনি। ম্যাচ রেফারি গটফ্রায়েড ডায়েন্সট আলোচনা করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের লাইন্সম্যান তোফিক বাহরামভের কাছে যান। লাইন্সম্যান সেটিকে গোল বলে সিদ্ধান্ত জানান। কিছুক্ষণ পর আরও একটি গোল করে ইংল্যাড ৪-২ এ ম্যাচটি জিতে নেয়। ১৯৯৮ সালে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্তও ম্যাচের রেফারি ডায়েনস্ট নিশ্চিত ছিলেন না, সেটি গোল হয়েছে কিনা। এমনকি ইংল্যান্ড স্ট্রাইকার জিওফ হার্স্টও তার আত্মজীবনী ১৯৬৬ অ্যান্ড অল দ্যাট-এ বলেছিলেন, হয়তো জার্মানরাই ঠিক ছিল। পরবর্তীতে গোল লাইন টেকনোলজির মাধ্যমে দেখা যায়, সেদিন বল আসলে গোল লাইন ক্রস করেনি। অর্থাৎ সেটি গোল ছিল না। কথিত আছে, মৃত্যুশয্যায় লাইন্সম্যাচ তোফিক বাহরামভকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন সেদিন। জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘স্ট্যালিংগার্ড’। তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার কথা। সোভিয়েত এবং নাৎসিদের সেই লড়াইয়ে হাজারো সোভিয়েত প্রাণ হারিয়েছিল। প্রতিহিংসার কারণে তিনি সেদিন জার্মানদের বিরুদ্ধে সেই ভুল সিদ্ধান্ত দেন।

জিদানের ঢুঁস : ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে এক্সট্রা টাইমের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কো মাতারাজ্জিকে তর্ক-বিতর্কের এক মাথায় ঢুঁস মেরে বসেন ফ্রান্সের তারকা জিনেদিন জিদান। এটাই ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক জিদান সেবারও ফ্রান্সকে তুলেছিলেন বিশ্বকাপ ফাইনালে এবং পেনাল্টি থেকে গোলও করেছিলেন একটি। কিন্তু খেলার এক পর্যায়ে বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় মাতারাজ্জি তার মা ও বোন সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করায় মাথা গরম করে ফেলেন জিদান। এতে করে তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে বের করে দেন রেফারি। জিনের চলে যাওয়ার পর টাইব্রেকারে ম্যাচটি জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি। এ ঘটনাটি ফ্রান্স ফুটবলপ্রেমীদের মনে দুঃস্বপ্নের মতো এখনো তাড়া করে বেড়ায়।

লুইজ সুয়ারেজের হ্যান্ড বল : ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে হাত দিয়ে নিশ্চিত একটি গোল বাঁচিয়ে লুইজ সুয়ারেজ হয়েছিলেন উরুগুয়ের নায়ক। কিন্তু সেটিও বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসে নিন্দাজনক ঘটনা। ঘানার বিরুদ্ধে শেষমুহূর্তে হাত দিয়ে নিশ্চিত একটি গোল বাঁচিয়ে দেন লুইজ সুয়ারেজ। ফলে তিনি লাল কার্ড দেখলেও টাইব্রেকারে ম্যাচ জিতে যায় উরুগুয়ে।

ব্যাটল অব ন্যুরেমবার্গ : বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে কলঙ্কিত ম্যাচের একটি ছিল ২০০৬ সালের জার্মানিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের মধ্যকার রাউন্ড অব সিক্সটিনের ম্যাচটি। ম্যাচটি ‘ব্যাটল অব ন্যুরেমবার্গ’ নামে কুখ্যাত। এ ম্যাচটির দায়িত্বে ছিলেন রাশিয়ান রেফারি ভ্যালেনটিন ইভানোভ। ম্যাচের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত রেফারিকে দুই দলের খেলোয়াড়দের মোট ১৬টি হলুদ কার্ড এবং চারবার লাল কার্ড দেখাতে হয়েছে। নেদারল্যান্ডস এবং পর্তুগাল দুই দলেরই ফেয়ার প্লের জন্য সুনাম রয়েছে; কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে কলঙ্কিত ম্যাচের কালিমা এই দুই দেশই বহন করে চলছে। খেলা শেষে অবশ্য কেউ কেউ ম্যাচটাকে রাগবি ম্যাচের সঙ্গে তুলনা করেছে। ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার এই ম্যাচের সম্পর্কে বলেন, ম্যাচে দুর্বল পারফরম্যান্সের জন্য রাশিয়ান রেফারি ভ্যালেনটিন ইভানোভের উচিত ছিল নিজেকে নিজেই হলুদ কার্ড দেখানো।

আর্জেন্টিনা বনাম পেরুর বিতর্কিত ম্যাচ : বিতর্ক এবং ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপ যেন একই সূত্রে গাঁথা। বিশ্বকাপের দুই বছর আগে আর্জেন্টিনায় সামরিক ক্যুর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখল বিশ্বকাপ আয়োজনে সংশয় দেখা দেয়। বিশ্বকাপের বাঁশির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় নানা বিতর্ক। প্রথম রাউন্ডে আর্জেন্টিনার প্রতিটি খেলা রাতে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে প্রথম বিতর্কের সৃষ্টি। সব বিতর্ককে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা বনাম পেরুর ম্যাচে। ফাইনালে যাওয়ার জন্য আর্জেন্টিনার ৪-০ গোলে না জিতলে, ব্রাজিল ফাইনালে চলে যাবে। আর্জেন্টিনা ওই ম্যাচে ৬-০ গোলে জিতে ফাইনালে চলে যায়। প্রথম অর্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধে আরও ৪টি গোল করে। দ্বিতীয়ার্ধে পেরুর খেলোয়াড়দের বডি ল্যাংগুয়েজ অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। ওই ম্যাচটি নিয়ে পরবর্তীতে অনেক গল্প কথা চালু হয়। কারো কারো মতে, তৎকালীন সামরিক জান্তার হুমকির মুখে পেরুর খেলোয়াড়রা ম্যাচটিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিশাল ব্যবধানে হেরে যায়। আবার কারো মতে, আর্জেন্টিনা থেকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সুবিধার বিনিময়ে পেরু ম্যাচটাতে হার মানে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের কোনো তথ্য-প্রমাণ কেউ হাজির করতে পারেনি।

ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো : ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে ইতালি ও চিলির মধ্যকার ম্যাচটি বিশ্বকাপের আর একটি কলঙ্কিত এবং বিতর্কিত ম্যাচ। ম্যাচটিকে অবশ্য ফুটবল ম্যাচ না বলে মার্শাল আর্টসের প্রদর্শনী বলাই ভালো। ফ্লাইং কিক, কিল-ঘুষি কী ছিল না সেই ম্যাচে। কাউকে কাউকে কাবাডি খেলতেও দেখা যায় সেই ম্যাচে। মাঠের যুদ্ধাবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনবার পুলিশের সাহায্য নিতে হয় রেফারিকে। কুখ্যাত ওই ম্যাচটি ‘ব্যাটেল অব সান্তিয়াগো’ নামে পরিচিত। ম্যাচ শেষে ইতালি টিমকে পুলিশের প্রোটেকশনে মাঠ থেকে বেরুতে হয়। ওই ম্যাচের দায়িত্ব পালনকারী ডাচ রেফারি লিও হর্ন ওই ম্যাচ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি ওই ফুটবল ম্যাচে রেফারিং নয়, একটা সামরিক মহড়ায় আম্পায়ারের অভিনয় করছিলাম।’

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে