বিশ্বের শীর্ষ ১০ কোম্পানি

  শামস বিশ্বাস

০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছরের মতো এ বছরও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবসাভিত্তিক সাময়িকী ফরচুন বিশ্বের বৃহত্তম ৫০০ করপোরেশনের তালিকা প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক আয় অনুযায়ী করা র্যাংকিংয়ের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত এই ম্যাগাজিনের ২০১৮ সালের তালিকায় থাকা প্রথম ১০টি কোম্পানির মধ্যে ছয়টিই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। গত বছরের মতো এবারও তালিকার শীর্ষ স্থানটি টানা পঞ্চমবারের মতো নিজেদের দখলে রেখেছে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্ট। দেশটির আরেক কোম্পানি অ্যাপল ইনকরপোরেটেড অবশ্য শীর্ষ দশের বাইরে ছিটকে পড়েছে।

ওয়ালমার্ট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দোকান পরিচালনা করে। ওয়ালমার্ট বিশ্বের সর্ববৃহৎ খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া আয়ের দিক থেকেও এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। ১৯৬২ সালে স্যাম ওয়ালটন এটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৭২ সালে তা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে অন্তর্ভুক্ত হয়। ওয়ালমার্ট মেক্সিকোতে ওয়ালমেক্স, যুক্তরাজ্যে অ্যাসডা, জাপানে সেইয়ু এবং ভারতে বেস্ট প্রাইস হিসেবে পরিচালিত হয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা এবং পুয়ের্তো রিকোতেও এর দোকান রয়েছে। ওয়ালমার্টের বার্ষিক বিক্রয় ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, যা ২০১৬ সালের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লভ্যাংশ প্রায় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

স্টেট গ্রিড

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান স্টেট গ্রিড করপোরেশন অব চায়না আছে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম বিদ্যুৎ সেবাদাতা কোম্পানি এবং চীনের বিদ্যুৎ বাজারে একচেটিয়া দখল তাদের। ১৯৮৬ সালে চীন তাদের বিদ্যুৎ খাতের তিন ধাপের সংস্কার শুরু করে। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত করপোরেশনটি বর্তমানে পাঁচটি আঞ্চলিক পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি ও ২৪টি ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। বছরে তাদের আয় প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৬-১৭ সালে স্টেট গ্রিড করপোরেশন অব চায়নার ৯ লাখ ২৭ হাজার ৮৩৯ কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ২৬টি প্রদেশ, স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং পৌরসভায় এক দশমিক এক বিলিয়ন ভোক্তা এবং ৩৬৩ দশমিক ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় ছিল।

সিএনপিসি

তালিকার চতুর্থ স্থানে থাকা চীনের বৃহত্তম তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়ামও (সিএনপিসি) চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। এর বার্ষিক আয় ৩২৬ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের তুলনায় যা ২৪ শতাংশ বেশি। বৃহত্তম চীনা ইন্টিগ্রেটেড পাওয়ার কোম্পানির প্রধান কার্যালয় বেইজিংয়ের ডোংচেংয়ে অবস্থিত। চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন হচ্ছে পেট্রোচায়না কোম্পানির ফাদার কোম্পানি। ২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম কোম্পানি হিসেবে এটি বিবেচিত হয়। সিএনপিসি ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের রিজার্ভ।

২০০৭ সালে সিএনপিসির উৎপাদন ছিল ৫৪ বিলিয়ন ঘন মিটার প্রাকৃতিক গ্যাস। চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়ামের আজারবাইজান, কানাডা, ইরাক, ইরান, সিরিয়া, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, ওমান, পেরু, সুদান, নাইজার, থাইল্যান্ড এবং ভেনিজুয়েলাতে ৩০টি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে। কোম্পানির অনেকগুলো অনুসন্ধান প্রকল্প সম্পূর্ণ নিজস্ব মালিকানাধীন ড্রিলিং পরিষেবা সংস্থা গ্রেট ওয়াল ড্রিলিং কোম্পানি (জিডব্লিউসিসি) দ্বারা পরিচালিত হয়।

রয়েল ডাচ শেল

সাধারণভাবে শেল হিসেবে পরিচিত একটি অ্যাংলো-ডাচ বহুজাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি। শেল হল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানির মধ্যে একটি। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি ক্যাপিটাল গবেষণা গ্লোবাল ইনভেস্টরস ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং সঙ্গে দ্বিতীয় ব্ল্যাকরক ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশকে ছাড়িয়ে রয়েল ডাচ শেল কোম্পানি এগিয়ে যায়। শেল ২০১৩ সালে ফরচুন গ্লোবাল ৫০০-এর মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম কোম্পানির তালিকার শীর্ষস্থানে অবস্থান নেয়। এক সময়ে নেদারল্যান্ডসের ৫৫৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন জিডিপির মধ্যে রয়েল ডাচ শেলের ৮৪ শতাংশ সমান রাজস্ব ছিল। ফেব্রুয়ারি ২০১৬-এর হিসাবে শেল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল কোম্পানি। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের তালিকায় রয়েল ডাচ শেলের অবস্থান ছিল সাতে। রয়েল ডাচ পেট্রোলিয়াম এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক শেল পরিবহন ও লেনদেনের সংযুক্তির মাধ্যমে কোম্পানিটি গঠন করা হয়। ছয়টি তেল ও গ্যাসের মধ্যে সুপারমেজর হচ্ছে অন্যতম। ফরচুনের তালিকার পাঁচে রয়েছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এই কোম্পানি। বার্ষিক আয় প্রায় ৩১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।

বিপি

ব্রিটেনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি ২০১৭ সালের তালিকায় ১২তম অবস্থানে ছিল। তাদের বার্ষিক আয় ২৪৫ বিলিয়ন ডলার। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৭০টি দেশে বিপির কার্যক্রম রয়েছে, প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে এবং মোট ১৮ দশমিক ৪৪১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রিজার্ভ করেছে। বিশ্বব্যাপী ব্রিটিশ জ্বালানি জায়ান্ট ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের প্রায় ১৮ হাজার ৩শ সার্ভিস স্টেশন রয়েছে। বিপি একটি ভার্টিক্যালয় ইন্টিগ্রেটেড কোম্পানি, যা তেল ও গ্যাস শিল্পের সব সেক্টরে অপারেটিং এবং উৎপাদন, পরিশোধন, বিতরণ ও বিপণন, পেট্রোকেমিক্যালস, পাওয়ার জেনারেশন এবং ট্রেডিং নিয়ে কাজ করে।

এক্সন মোবিল

যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ তেল কোম্পানি এক্সন মোবিল আছে তালিকার নয়ে। ২০১৭ সালের তালিকায় তাদের অবস্থান ছিল দশে। বছরে তাদের আয় প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০১৬ সালের থেকে তাদের আয় বেড়েছে ১৭ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লভ্যাংশ প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ প্রতিষ্ঠানটির পূর্ব নাম ছিল স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি। যার মূল কর্ণধার ছিলেন জন ডি রকফেলার।

সফল এই উদ্যোক্তা ১৮৭০ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এক্সন মোবিল পুনর্গঠিত হয় ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৩৪৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০১৭ সালে এর বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

টয়োটা মোটর

জাপানি গাড়ি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টয়োটা মোটর করপোরেশন ফরচুনের গত বছরের তালিকার পাঁচে থাকলেও এ বছর তারা এক ধাপ নিচে নেমে গেছে। তাদের বার্ষিক আয় ২৬৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। বর্তমানে জাপানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের নিজস্ব ১২টি কারখানা, ১১টি সাবসিডিয়ারি অ্যাফিলিয়েট কারখানা ছাড়াও বিশ্বের ২৬টি দেশে মোট ৫১টি কারখানা রয়েছে। এগুলোতে গড়ে প্রতি বছর ৫৫ লাখ গাড়ি তৈরি হয়। অর্থাৎ প্রতি ৬ সেকেন্ডে তৈরি হয় একটি করে টয়োটা গাড়ি। ২০১০ সালের মার্চ নাগাদ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে মোট ৩ লাখ ৭৩৪ হাজার লোক কর্মরত ছিলেন। ২০১২ সালের জুলাইয়ে কোম্পানিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানিটি ২০০ মিলিয়ন যানবাহন প্রস্তুত করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে টয়োটা মোটর কোম্পানি লিমিটেডের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৮ আগস্ট।

সিনোপ্যাক

ফরচুনের তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি চায়না পেট্রোকেমিক্যাল করপোরেশন বা সিনোপ্যাক গ্রুপ। সিনোপ্যাক গ্রুপ হচ্ছে এশিয়ার সর্ববৃহৎ তেল পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি। এটি পরিচালিত হয় চীনের সরকার দ্বারা এসএএসএসির মাধ্যমে। এটির সদর দপ্তর বেইজিং শহরে অবস্থিত। ২০০৭-এ সেরা ৫০০টি কোম্পানির মধ্যে এটি প্রথম হয় এর বার্ষিক ১ ট্রিলিয়ন চীনা ইয়েন আয়ের মাধ্যমে। ২০১৪ সাল থেকে কোম্পানিটি বিক্রয়ের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম কেমিক্যাল প্রডিউসার হিসেবে স্থান ধরে রেখেছে। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানিটির বার্ষিক আয় প্রায় ৩২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ভক্সওয়াগন

ফরচুনের গত বছরের তালিকায় এই জার্মান মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগনের অবস্থান ছিল ছয়ে। তবে এ বছর তারা এক ধাপ পিছিয়ে সাত নম্বরে নেমে এসেছে। বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ২৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। ২০১৬ সালের তুলনায় তাদের বিক্রি বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। জার্মান ভাষায় ভক্সওয়াগন দ্বারা জনগণের গাড়ি বোঝানো হয়। ভক্সওয়াগন কোম্পানির বর্তমান শ্লোগান ‘দাস অতো’ (দ্য কার)। এ কোম্পানির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গাড়ির মধ্যে রয়েছে ভক্সওয়াগন, স্ক্যানিয়া, নিওপ্ল্যান, মান, আউডি, স্কোডা, বেন্টলি, পোর্শ ও ল্যাম্বরগিনি। ভক্সওয়াগন বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫০টিরও বেশি মডেল তৈরি ও বাজারজাত করে থাকে। ১৯৩৭ সালে জার্মানিতে কোম্পানিটি স্থাপিত হয়।

বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে

বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটের বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে ইনকরপোরেটেডকে ফরচুন রেখেছে তালিকার দশে। ২০১৬ সালের তুলনায় তাদের আয় বেড়েছে ৮ শতাংশের বেশি। ফরচুনের প্রতিবেদন বলছে, তাদের বর্তমান আয় প্রায় ২৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মাল্টিন্যাশনাল এ প্রতিষ্ঠানটি বিশিষ্ট মার্কিন ব্যবসায়ী অলিভার চেস প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৯ শতকের দিকে টেক্সটাইল ম্যানুফেকচারিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে এটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যবসাসফল একটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অনেকগুলো সহযোগী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছে। বৃহৎ এই প্রতিষ্ঠানটির সর্বমোট বাজারমূল্য প্রায় ৭০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে