২০১৮ সালের ১০ রিয়েল হিরো

  শামস বিশ্বাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৫ | প্রিন্ট সংস্করণ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন (ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক) ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর পৃথিবী বদলে দেওয়ার মতো কাজ করা শীর্ষ ১০ ‘রিয়েল হিরো’ সম্মানিত করে আসছে। এ তালিকায় থাকা ‘সাধারণ’ মানুষগুলো প্রত্যেকেই অসাধারণ একটি করে পথ বেছে নিয়ে নিজের জ্ঞান ও উৎসাহ দিয়ে অসংখ্য মানুষকে সহযোগিতা করেছেন। বদলে দিয়েছেন তাদের জীবন। এই ১০ জনের প্রত্যেকেই ১০ হাজার ডলারের ক্যাশ প্রাইজ পাবেন। আর এই ১০ জনের মধ্যে যিনি ‘সিএনএন হিরো অব দ্য ইয়ার’ হবেন, তিনি পাবেন অতিরিক্ত ১ লাখ ডলার।

আবিসোয়ে আজায়ি-আকিনফোলারিন

নাইজেরিয়ার উদ্যোক্তা আবিসোয়ে আজায়ি আকিনফোলারিন। ৩৩ বছর বয়সী এ নারী গার্লকোডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা। এটি একটি এনজিও, যা নারীদের ওয়েবসাইটের কোড, ডিজাইন ও তৈরির শিক্ষা দেয় এবং যা তাদের সম্প্রদায়ে নিজেদের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। আবিসোয়ে আজায়ি-আকিনফোলারিন নাইজেরিয়ার লাগোসে মেয়েদের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শেখাতে নিজের চাকরি ছাড়েন। এখানে চলতি বছর ফেসবুক ও গুগল তাদের অফিস খুলেছে। ২০১৩ সালে একটি জরিপে বলা হয়, নাইজেরিয়ার ৮ শতাংশেরও কম নারী প্রফেশনাল, ম্যানেজেরিয়াল বা টেকনোলজি জবের সঙ্গে জড়িত। আজায়ি-আকিনফোলারিন এই পরিসংখ্যান পাল্টে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।

মারিয়া রোজ বেল্ডিং

.যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ‘মিনস’ (গঊঅঘঝ) নামের একটি ফ্রি অনলাইন প্ল্যাটফরম খুলেছেন, যেখানে কেউ চাইলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার দান করতে পারে ক্ষুধার্তদের জন্য। মারিয়া রোজ বেল্ডিং যুক্তরাষ্ট্রে নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রায় ৪০ শতাংশ খাবার নিয়মিত যথেষ্ট পরিমাণ খেতে না পারা কয়েক লাখ আমেরিকানকে খাওয়াতে চান। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৮ লাখ পাউন্ড খাবার পুনর্বিতরণ করেছে অলাভজনক এই অনলাইন প্ল্যাটফরম। মারিয়া রোজ বেল্ডিং তার উদ্যোগ সম্পর্কে বলেন, ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলা খাবার ক্ষুধার্তদের দান করার মাধ্যমটি সহজ করাই মিনসের লক্ষ্য। আমরা একটি সেতুর মতো, যার অস্তিত্ব আগে ছিল না।

আমান্দা বক্সটেল

একটি ভয়ঙ্কর স্কিইং দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আর কখনই হাঁটতে পারবেন না। ডাক্তাররা বলেছিলেন, তিনি আর কখনই হাঁটতে পারবেন না। হার না মানা আমান্দা বক্সটেল বায়োনিক এক্সোস্কেলিটন স্যুট নামের এক ধরনের মেশিনের সাহায্যে তাদের কথাকে মিথ্যায় পরিণত করেছেন। আর এটিই তাকে ‘ব্রিজিং বায়োনিকস’ তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করে। আমান্দা বক্সটেল এর পর থেকে বিকলাঙ্গ মানুষদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তার অলাভজনক ফাউন্ডেশন বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে ৬০ জনেরও বেশি মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছে, যারা আর হাঁটতে পারবে না বলেই জানিয়েছিলেন ডাক্তাররা। আমান্দা বক্সটেল সিএনএনকে বলেন, মানুষের নিজের এবং নিজের সম্ভাবনায় বিশ্বাস রাখা দরকার। জীবন শেষ হয়নি। তারা এখনো স্বাভাবিক হতে পারবে।

রব গোর

চিকিৎসক রব গোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কাজ করার সময় খুব কাছ থেকে সহিংসতার পরবর্তী অবস্থা দেখে ২০০৯ সালে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে কিংস এগেইনস্ট ভায়োলেন্স ইনিশিয়েটিভের (কেএভিআই) কার্যক্রম শুরু করেন। এই সংগঠন হাইস্কুলে শিক্ষার্থীদের মেডিটেশন এবং নিজেদের ভেতরের দ্বন্দ্ব নিরসনের ওপর কার্যক্রম শুরু করে। কেএভিআই এরই মধ্যে কিংস কাউন্টি হসপিটাল, স্থানীয় স্কুলগুলো এবং বর্ডার কমিউনিটিতে অ্যান্টি-ভায়োলেন্স প্রোগ্রাম চালু করে তরুণদের সহযোগিতা করেছে। তারা অলাভজনকভাবে ‘হসপিটাল রেসপন্ডার্স’ হিসেবে সহিংসতার শিকার এবং তাদের পরিবারকে সহযোগিতা করে থাকে। রব গোরের মতে, সহিংসতা সব জায়গায়। কিন্তু সহিংসতাকারীরা যেন তোমার কাছ থেকে শেখে যে কীভাবে এটা এড়ানো যায়।

লুক মিকেলসন

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, খোদ মার্কিনমুলুকে অনেক শিশুই বিছানা না থাকায় মেঝেতে ঘুমায়। এই রূঢ় সত্য জানার পর খুবই মর্মাহত হন ইডাহো অঙ্গরাজ্যের টুইন ফলসে বসবাসকারী লুক মিকেলসন। ২০১২ সালে নিজের টাকায় কাঠ কিনে এসব শিশুকে বেড তৈরি করে দেন। এ জন্য তাকে অবশ্য বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের দ্বারস্থ হতে হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘স্লিপ ইন হ্যাভেন্টলি পিস’ নামের একটি দাতব্য সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মেঝেয় ঘুমানো শিশুদের বেড সরবরাহ করছে। লুক মিকেলসনের মতে, এসব শিশু স্বেচ্ছায় এ পরিস্থিতি মেনে নেয়নি। এসব শিশুর জন্য কিছু করার পর তাদের চোখে-মুখে আমি যে আনন্দ দেখেছি, তা আমাকে ব্যতিক্রমী কিছু করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

ক্রিস স্টাউট

মার্কিন সেনাসদস্য ক্রিস স্টাউট যখন আফগানিস্তানের রণাঙ্গন থেকে মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের কানসাস সিটিতে ফেরেন, তখন তিনি আহত ছিলেন এবং পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রিস ডিসঅর্ডারে (পিটিএসডি) ভুগছিলেন। যুদ্ধের ময়দানের ঘটনা ও দৃশ্যগুলো তাকে হতাশ করে ফেলেছিল। তিনি গৃহহীন যোদ্ধাদের রাস্তায় বসবাস করতে দেখেন। তিনি ও তার কয়েকজন বন্ধু ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে দেন এবং ‘ভেটেরানস কমিউনিটি প্রজেক্ট’ শুরু করেন। তারা এই প্রজেক্টের আওতায় গৃহহীন সৈন্যদের থাকার ব্যবস্থা করতে ছোট ছোট বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। তারা তাদের থাকার জায়গার পাশাপাশি যাতায়াত, চাকরি, আইনি সুবিধা, খাবার সুবিধা, পোশাক ও জরুরি আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। ক্রিস স্টাউট বলেন, সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমরা সবার আগে ‘ইয়েস’ বলি। পরে অন্যকিছু জানার চেষ্টা করি। আমরা তাদের সেবা করি, যারা আমাদের সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে হাত উঁচু করে।

ফ্লোরেন্স ফিলিপস

কেনিয়া, গুয়েতেমালা ও জ্যামাইকায় বিভিন্ন কমিউনিটি-বিল্ডিং প্রজেক্ট এবং ইংরেজি শেখানোর কাজ করেছেন। শেষমেশ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদা অঙ্গরাজ্যের কার্সন সিটিতে স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। এখানে প্রায় ২০ শতাংশ জনগণ অভিবাসী। তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে তিনি উত্তর নেভাদায় ‘ইংলিশ অ্যাজ অ্যা সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ (ইএসএল) নামের একটি অলাভজনক ইন-হোম প্রোগ্রাম শুরু করেন। যেখানে হাইস্কুলের সমমানের শিক্ষা এবং কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে পাঁচ হাজার অভিবাসী এবং তাদের পরিবার উপকৃত হয়েছে। ফিলিপ বলেন, আমার শিক্ষার্থীরা এখান থেকে ইংরেজি শিখছে এবং আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারছে। আমি গর্ববোধ করি যখন তারা বলে, ‘আই অ্যাম অ্যান আমেরিকান।’

রিকার্ডো পুন-চোং

সরাসরি চিকিৎসাসেবা না দিলেও তার জীবনের একটা বড় সময় ধরে পেরুর রাজধানী লিমার বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনের দায়িত্ব পালন করেছেন। দিনের পর দিন তিনি হাসপাতালে মেঝেতে অসংখ্য পরিবারকে ঘুমাতে দেখেছেন। শহরের ভালো কোনো জায়গায় থাকার অর্থ না থাকায় এবং নিজের বাসা থেকে অনেক দূর হওয়ায় হাসপাতালের মেঝেতে রাত কাটায় তারা। অনেক পরিবারের সন্তানদের জীবন যখন শঙ্কার মুখে, তখন তাদের বাবা-মা গৃহহীন। এসব মানুষের জন্য কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন পুন-চোং। ২০০৮ সালে তিনি গড়ে তোলেন অলাভজনক সংগঠন ‘ইন্সপিরা’। ১০ বছর ধরে তারা চিকিৎসাধীন রোগীর আত্মীয়দের আশ্রয়, খাবার এবং যথাসম্ভব রোগীকে সহায়তা করে থাকে। সংগঠনটি এ পর্যন্ত নয় শতাধিক পরিবারকে সহযোগিতা করেছে।

পুন-চোং তার কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, আমি যখন এসব শিশুর সঙ্গে থাকি, তখন আমি অনুভব করতে পারি যে তারা কত দৃঢ় মানসিকতার। আমার মনে হয় এমন কোনো সমস্যা নেই, যা আমরা সমাধান করতে পারি না।

সুসান মুনসে

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের কিশোরী সুসান মুনসে পতিতালয়ের পতিতা হিসেবে একজন তরুণীর অপব্যবহার হওয়া দেখে এই জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার এবং সাইকোথেরাপিস্ট হিসেবে নতুন জীবন শুরু করেন। ২০০৯ সালে তিনি ‘জেনারেটহোপ’ নামের একটি অলাভজনক দল গড়ে তোলেন, যা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আশার একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দলটি এসব নারীকে দীর্ঘমেয়াদে থাকার জায়গা, থেরাপি, শিক্ষা ও মেডিক্যাল কেয়ার দেয়। সুসান মুনসে তার কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, জেনারেটহোপ এখন শতাধিক নারীর আশ্রয়স্থল, যাদের কয়েকজনের বয়স ১৮। তারা কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নিজেদের জীবনের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতা থেকে যেন তারা বেরিয়ে আসতে পারে, সে জন্য তাদের থেরাপি দেওয়া হয়। এখানে একজন নারী দুই বছরের মতো থাকতে পারেন। তাদের আর্ট থেরাপি, নাচ ও যোগব্যায়ামও শোখানো হয়।

এলেন স্ট্যাকেবল

গ্র্যাজুয়েট স্কুল থিসিস করতে গিয়ে শিক্ষিকা এলেন স্ট্যাকেবল জানতে পারেন, আমেরিকায় নারী কারাবন্দির সংখ্যায় শীর্ষে তার নিজের অঙ্গরাজ্য ওকলাহোমা। তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন বেশিরভাগ নারীই প্রথমবারের মতো কারাবন্দি হয়েছেন। তাও আবার অসহিংসতামূলক অপরাধের দায়ে। তিনি তাদের কথা শোনেন এবং তাদের জটিল জীবন বোঝার চেষ্টা করেন। এসব কারাবন্দিকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে ২০১৪ সালে তিনি অলাভজনক সংগঠন ‘পোয়েটিক জাস্টিস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মধ্যে নারী কারাবন্দিদের কবিতা ও সৃজনশীল লেখনী এবং মেডিটেশন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবীরা প্রত্যেকের চিন্তাভাবনা জানার চেষ্টা করেন। ক্লাস শেষে এসব নারী একে অন্যের সঙ্গে নিজেদের কাজগুলো শেয়ার করতেন। স্ট্যাকেবলের এ সংগঠন নারী কারাবন্দিদের তাদের পূর্ববর্তী খারাপ অভিজ্ঞতা থেকে বের হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে