সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে

‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি

  শামস্ বিশ্বাস

১৭ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সহকারী শিক্ষক’ পদে আবেদন পর্ব শেষ। এখন প্রস্তুতির সময়। চাকরি পেতে হলে চাই জোর প্রস্তুতি। চাকরিপ্রত্যাশী লাখ লাখ প্রার্থীর সুবিধার্থে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয় এবং বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি পরামর্শ তুলে ধরছেনÑ শামস্ বিশ্বাস

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সহকারী শিক্ষক’ নিয়োগের পরীক্ষা ১৯ থেকে ২৬ অক্টোবরের মধ্যে আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ বছর প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগে ১২ হাজার আসনের বিপরীতে ২৪ লাখ ৫ জন প্রার্থী আবেদন করেছেন। সে হিসাবে প্রতি আসনে লড়বেন ২০০ জন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, অক্টোবরে লিখিত পরীক্ষা আয়োজন করা হলে ডিসেম্বরের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা শেষ করা হবে। পাস করা যোগ্য প্রার্থীদের পরবর্তী বছরের শুরুতে নিয়োগ দেওয়া হবে। আবেদন পর্ব শেষ। এখন প্রস্তুতির সময়। চাকরি পেতে হলে চাই জোর প্রস্তুতি। চাকরিপ্রত্যাশী লাখ লাখ প্রার্থীর সুবিধার্থে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয় এবং বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি পরামর্শ তুলে ধরা হলো।

পরীক্ষা পদ্ধতি ও মানবণ্টন : প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে দুই ধাপে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ৮০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা এবং ২০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষাসহ মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। প্রথমে নেওয়া হয় এমসিকিউ বা বহুনির্বাচনী পরীক্ষা। প্রশ্ন করা হবে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানÑ এ চারটি বিষয়ে। প্রতিটি বিষয় থেকে ২০টি করে মোট ৮০টি প্রশ্ন থাকে। প্রতিটি সঠিক উত্তরের জন্য ১ নম্বর যোগ হবে। পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ সময় ৮০ মিনিট বা ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। গড়ে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য ১ মিনিট সময় পাওয়া যাবে। বিগত বছরের মতো পরীক্ষার বিষয়বস্তু একই থাকলেও এবার প্রশ্নের মান উন্নত হবে। এবার থেকে চালু হচ্ছে নেগেটিভ মার্কিং। একটি ভুল উত্তরের জন্য কাটা যাবে ০.২৫ নম্বর। ফলে চারটি প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলে ১ নম্বর কাটা যাবে। এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের ডাকা হয় মৌখিক পরীক্ষায়। এ ধাপে থাকে ২০ নম্বর। ভাইভায় টিকলে পরবর্তী যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পরীক্ষা প্রস্তুতি : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি নিতে এসএসসি ও এইচএসসির পাঠ্যবইয়ের প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। কারণ সহকারী শিক্ষক পদে আবেদনের জন্য নারী প্রার্থীদের কমপক্ষে এইচএসসি ও পুরুষ প্রার্থীদের স্নাতক পাস হতে হয়। এ জন্য নিয়োগ পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের বই থেকে প্রশ্ন করা হয়। বাংলা অংশে ব্যাকরণ ও সাহিত্য বিষয়ে প্রশ্ন থাকে। ইংরেজিতে প্রশ্ন আসে গ্রামার থেকে। গণিতে পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যামিতি থেকে প্রশ্ন থাকে। সাধারণ জ্ঞান অংশে বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি ও সাম্প্রতিক নানা বিষয়ে প্রশ্ন আসতে পারে।

বাংলা : বাংলা অংশে প্রশ্ন করা হয় ব্যাকরণ ও সাহিত্য থেকে। বেশি প্রশ্ন আসে ব্যাকরণ থেকে। ভাষা, শব্দ, কাল, ধ্বনি, বাক্য, পদ-প্রকরণ, কারক ও বিভক্তি, সন্ধি বিচ্ছেদ, প্রকৃতি প্রত্যয়, সমাস থেকে প্রশ্ন থাকে। উদাহরণমূলক প্রশ্ন বেশি করা হয়। যেমনÑ একটি শব্দ দিয়ে তার সন্ধি বিচ্ছেদ অথবা একটি বাক্য দিয়ে কারক নির্ণয় বা সমাস নির্ণয় করতে বলা হতে পারে। তাই ব্যাকরণের নিয়ম যেমন জানতে হবে, উদাহরণগুলো চর্চা করতে হবে। বিশেষ করে নিয়মের বাইরে বা ব্যতিক্রমগুলোয় বেশি জোর দিতে হবে। ব্যাকরণ অংশে মুখস্থবিদ্যার কিছু প্রশ্ন পাওয়া যাবে। বাগধারা, এককথায় প্রকাশ, বিপরীত শব্দ, পারিভাষিক শব্দ, সমার্থক শব্দÑ এগুলো মুখস্থ রাখতে হবে। নবম দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বই থেকে চর্চা করলে ভালো করা সম্ভব। সাধারণত ২ মার্কস করে সন্ধি, সমার্থক শব্দ, শুদ্ধ বানান, এককথায় প্রকাশ, সমাস, বাগধারা থেকে প্রশ্ন হয়। বিপরীত শব্দে থাকে ২/৩ মার্কস। অনুরূপভাবে কারক-বিভক্তি, ছদ্মনাম/উপাধি, দ্বিরুক্তি শব্দ, ধ্বনি, বর্ণ, বাক্য (সরল, জটিল, যৌগিক), পদ নির্ণয় থেকে প্রশ্ন আসে। বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের জীবনী, জন্ম-মৃত্যু সাল, রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ, বাংলা সাহিত্যের প্রথম, বিখ্যাত গ্রন্থ এসব থেকে প্রশ্ন আসতে পারে সাহিত্য অংশে। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ থেকে ১ অথবা ২ মার্কস আসতে পারে; তবে মধ্যযুগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, আধুনিক যুগের সাহিত্যকর্মের মধ্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপন্যাস/রচনাসমগ্র (১/২ মার্কস) এবং পরিচিত কবি সাহিত্যিকের রচনা বা জন্ম-মৃত্যু নিয়ে ১/২ মার্কস আসতে পারে, যেগুলো পাড়ার মতো। প্রথমেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বইয়ের কবি ও লেখক পরিচিতি পড়ে নিতে পারেন। পাশাপাশি বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সম্পর্কেও জেনে রাখা ভালো।

ইংরেজি : গ্রামারে ভালো দখল থাকলে ইংরেজি অংশে ভালো করা যাবে। এসএসসি, এইচএসসি পর্যায়ের বই থেকে Parts of speech, Noun, Pronoun, Adjective, Verb, Article, Tense, Preposition, Right forms of verb, Narration, Voice change Ges Sentence Correction-এর নিয়মগুলো আয়ত্ত করে নিন। এবার চর্চার পালা। প্রত্যেক নিয়মের সঙ্গে বইয়ে দেওয়া উদাহরণ থেকে চর্চা করতে হবে। বিগত বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন থেকেও গ্রামার অংশ সলভ করুন। তাতে প্রস্তুতি ভালো হবে। Spelling, Synonym , Antonymথেকে প্রশ্ন থাকে। এগুলো মুখস্থ করতে হবে। এ অংশের সিলেবাস বিশাল বড়। শব্দের শেষ নেই। যত বেশি পড়বেন, ততো মনে থাকবে। বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো আগে চর্চা করুন। ধীরে ধীরে শব্দের সংখ্যা বাড়াতে পারেন। বিগত দুই পর্যায়ের পরীক্ষায় ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ এসেছে তাই এবারও ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ আসতে পারে। এ জন্য বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান করলে ভালো করা সম্ভব। ইংরেজির মানবণ্টন হয় এই রকমRight form of verb, Fill in the blank with appropriate word/preposition (২ মার্কস), Voice Change (১/২ মার্কস), Narration (১ মার্কস), Sentence Correction (২ মার্কস), Spelling (২ মার্কস), Parts of speech Identification (২ মার্কস), Synonym+antonym (৩/৪ মার্কস), Idioms & Phrase

গণিত : গণিতে প্রস্তুতির জন্য অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির গণিত বই সংগ্রহ করে নিন। দশমিকের (যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ), শতকরা, লাভ-ক্ষতি, মুনাফা, লসাগু, গসাগু, ঐকিক নিয়ম (কাজ, খাদ্য, সৈন্য), অনুপাত : সমানুপাত, সংখ্যা পদ্ধতি, বীজগাণিতিক মান নির্ণয়, উৎপাদক নির্ণয়, গড়, মধ্যক, প্রচুরক নির্ণয়, ত্রিভুজক্ষেত্র, বর্গক্ষেত্র, আয়তক্ষেত্রের বেসিক সূত্রের অঙ্কসমূহ, সরলরেখা, ধারা, গাছের উচ্চতা/মিনারের উচ্চতা/মইয়ের দৈর্ঘ্য/সূর্যের উন্নতি, কোণ ইত্যাদি বিষয়ক অঙ্ক থাকবে। পাটিগণিতে ঐকিক নিয়ম, লসাগু, গসাগু নির্ণয়, লাভ-ক্ষতি, ভগ্নাংশ, সুদ-কষার সমস্যা সমাধানের নিয়মগুলো মনে আছে কিনা দেখুন। বীজগণিতেও সূত্রগুলো চোখ বুলিয়ে নিন। এবার বইয়ের সমস্যাগুলো সমাধান করুন। পরীক্ষা হলে ক্যালকুলেটর পাবেন না। হাতের কাছে প্রশ্ন ছাড়া অতিরিক্ত কাগজও থাকবে না। তাই গাণিতিক সমস্যাগুলো সংক্ষেপে বা মুখে মুখে সমাধানের নিয়ম রপ্ত করে নিন। বারবার চর্চা করলে গণিতের সমাধান করা সহজ হবে।

সাধারণ জ্ঞান এবং দৈনন্দিন বিজ্ঞান ও কম্পিউটার : সাধারণ জ্ঞান এবং দৈনন্দিন বিজ্ঞান ও কম্পিউটার অংশে ভালো করার জন্য খুব বেশি পড়তে হবে না। বাজারে সাধারণ জ্ঞানের বেশ কিছু বই পাওয়া যায়। এসব বই থেকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি দেখতে পারেন। সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিরও কিছু প্রশ্ন জেনে রাখা ভালো। সাধারণ জ্ঞান অংশে ১৪-১৫টির মতো প্রশ্ন আসতে পারে তার ভেতর ১০-১২টিই হবে সালের রিপিট প্রশ্ন। বাকি ২-৩টি সাম্প্রতিক বিষয়াবলি দিতে পারে। তার পরও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জনপদ, নদ-নদী, বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য অন্তর্জাতিক সংগঠন, জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন, বিশ্বের বিভিন্ন শহরের নাম ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান থেকে দু-তিনটি কমন প্রশ্ন আসবে, যেগুলো চোখের পলকে গোল্লা ভরাট করা যাবেÑ সাধারণত রিপিটেড প্রশ্ন থাকে। কম্পিউটার থেকে একটি বা দুটি প্রশ্ন আসবে একেবারে বেসিক কম্পিউটার থেকে। কম্পিউটারের ওপরে থাকা সাধারণ জ্ঞান দিয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায়।

সহায়ক বই : সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় ভালো করতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই আয়ত্তে থাকতে হবে। বিশেষ করে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির বাংলা, গণিত, ইংরেজি বোর্ড বইগুলো সংগ্রহে রাখতে পারেন। বিগত বছরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নগুলো দেখলে প্রশ্নপত্র সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যাবে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনে জেলাওয়ারি প্রাথমিক শিক্ষক পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্নগুলো সংগ্রহে থাকলে প্রস্তুতিতে বেশ কাজে দেবে।

টিপস : যেহেতু হাতে সময় একেবারে কম, তাই বিস্তারিত না পড়ে বাংলা ও ইংলিশের জন্য যে কোনো সিরিজের বই (নতুন সংস্করণ) থেকে শুধু চ্যাপ্টারের শেষে যুক্ত বিভিন্ন পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলো সলভ করতে পারেন।

মৌখিক পরীক্ষা : লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদেরই শুধু মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হবে। মৌখিক পরীক্ষায় থাকবে ২০ নম্বর। একাডেমিক ফলাফল বা শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর থাকবে ৫ নম্বর। এক্সট্রা কারিকুলামের (নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি) ওপর বরাদ্দ থাকবে ৫ নম্বর। বাকি ১০ নম্বর থাকবে সাধারণ জ্ঞানের ওপর। মৌখিক পরীক্ষায় সাধারণ জ্ঞানের জন্য প্রার্থীর নিজ জেলার থানা বা উপজেলার আয়তন, জনসংখ্যা, সংস্কৃতি, জেলার ইতিহাস, রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি।

প্রয়োজনী তথ্যের জন্য : প্রার্থীরা http://dpe.teletalk.com.bd ওয়েবসাইট থেকে প্রবেশপত্র ডাউনলোড করতে পারবেন। ওএমআর শিট পূরণের নির্দেশাবলি এবং পরীক্ষাসংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য ওয়েবসাইট www.dpe.gov.bd থেকে পাওয়া যাবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে