আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে সেপা

  অনলাইন ডেস্ক

২৮ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র (বিটাক) ২০০৯ সাল থেকে হাতে-কলমে কারিগরি প্রশিক্ষণে নারীদের গুরুত্ব দিয়ে বিটাকের কার্যক্রম সম্প্রসারণপূর্বক ‘আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এ প্রকল্পটি মূলত সেপা প্রকল্প নামেই সমধিক পরিচিত। প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কারিগর তৈরি করার মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়নসহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে সেপা প্রকল্প অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘরে ঘরে চাকরি প্রদান করার একটি প্রতিশ্রুতি ছিল। অতঃপর জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০০৯ বিটাক ‘আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে। নারীদের গুরুত্বের কথা বলা হলেও শুরু থেকেই প্রকল্পটি পুরুষদের জন্যও সম্প্রসারিত করা হয়। সেপা প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্পশিক্ষিত, দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া বেকার যুব-মহিলাদেরকে নয়টি ট্রেডে তিন মাস এবং যুবকদের তিনটি ট্রেডে দুই মাস মেয়াদি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান শুরু করা হয়। থাকা-খাওয়াসহ প্রশিক্ষণের যাবতীয় খরচ সরকারিভাবে প্রকল্প থেকে বহন করা হয়। বিটাকে নতুন মহাপরিচালক ড. মো. মফিজুর রহমান যোগদান করার পরই তিনি এটুআই (ধ২র) প্রকল্পের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। এটুআই প্রথম পর্যায়ে দেশের দারিদ্র্যপীড়িত ১০টি উপজেলাকে চিহ্নিত করে সেসব উপজেলা থেকে প্রশিক্ষণার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। এসব উপজেলা হলো পীরগঞ্জ, সুন্দরগঞ্জ, হিজলা, ইন্দুরকানী, দেবহাটা, মোড়েলগঞ্জ, হরিণাকু-ু, শালিখা, গোয়ালন্দ, গোসাইরহাট। সেপা প্রকল্প এবং এটুআই টিমের সদস্যরা সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে ট্যালেন্ট হান্ট পদ্ধতিতে সমাজের স্বল্পশিক্ষিত বেকার যুবক ও যুব মহিলা প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করে আসছে। সেপা প্রকল্প সমাজের এসব সুবিধাবঞ্চিত যুবসমাজকে বিভিন্ন ট্রেডে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্ষিতে রূপান্তর করছে। প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে এসব প্রশিক্ষণার্থীকে চাকরির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সেপা প্রকল্প প্রকৃতপক্ষে সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশকে অন্তর্ভুক্ত (রহপষঁংরাব) করে কর্মসংস্থানসহ দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

সেপা প্রকল্পের আওতায় মোট ২৫ হাজার নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষিত করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ২০০৯-এর জুলাই থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯ হাজার ৫৮১ জন মহিলা, ১৩ হাজার ১৯৯ জন পুরুষসহ সর্বমোট ২২ হাজার ৭৮০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের সংখ্যার হিসাবে ক্রমপুঞ্জিত অর্জনের হার ৯৪ শতাংশ। অবশিষ্টদের প্রশিক্ষণ আগামী ২০১৯ সালের জুলাইয়ে এর মধ্যে সম্পন্ন হবে। সেপা প্রকল্পের মোট বাজেট হলো প্রায় ৭২ কোটি টাকা। প্রতিবছর এর আর্থিক বাস্তবায়ন হার ১০০ শতাংশ, যা বাংলাদেশের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ঈর্ষণীয়।

সেপা প্রকল্পে নারীদের জন্য নয়টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এগুলো হলোÑ লাইট মেশিনারিজ, ইলেকট্রিক্যাল মেইনটেন্যান্স, অটোক্যাড, হাউসহোল্ড অ্যাপ্লায়েন্স, ইলেকট্রনিকস, রিফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং, প্লাস্টিক প্রসেসিং (জেনারেল), প্লাস্টিক প্রসেসিং (কাস্টমাইজ) এবং কার্পেন্টিং। ছেলেদের জন্য তিনিটি ট্রেড যথাক্রমেÑ ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল মেইনটেন্যান্স এবং রিফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং।

নারী প্রশিক্ষণার্থীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ঢাকা কেন্দ্রের নারী হোস্টেলে অবস্থান করে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে এবং যুবকদের প্রশিক্ষণ চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও চাঁদপুর কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। নারী হোস্টেলটি মহিলা আনসার সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত, পুরুষ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। অর্থাৎ অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশে নারী প্রশিক্ষণার্থীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন।

সেপা প্রকল্পের আওতায় হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শরীরচর্চার জন্য পিটি প্যারেড, মোটিভেশন সেশনে সাংস্কৃতিক কর্মকা- যেমনÑ গান, আবৃত্তি, বিতর্ক অনুষ্ঠান, অভিনয়, ইনডোর গেম ইত্যাদি পরিচালনা করা হয়; যাতে প্রশিক্ষণার্থীরা সুশৃঙ্খল থাকে এবং মানসিকভাবেও সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়ী করে তোলা যায়। এসব মোটিভেশন সেশনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেন। উদাহরণস্বরূপ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়েরে সিনিয়র সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, এটুআই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, প্রিজম প্রজেক্টের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর আলী সাবেত, জাতীয় পর্যায়ের সংগীতশিল্পী মেহরীন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা মোটিভেশন সেশনে উপস্থিত থেকেছেন এবং সেপা প্রকল্পের এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। এসব কর্মকা-ের কারণে বিটাকের প্রশিক্ষণার্থীরা অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী, সাহসী, সুশৃঙ্খল এবং তাদের আচার-ব্যবহার অনেক সুন্দর বলে নিয়োগকারী একাধিক কোম্পানির প্রতিনিধি মতামত ব্যক্ত করেছেন।

সেপা প্রকল্পের একটি অনন্য বৈশিষ্ট এই যে, প্রশিক্ষণ শেষে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় চাকরির ব্যবস্থা করা; যাতে করে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়া যায়। সাধারণত প্রশিক্ষণ কোর্স সমাপ্ত হওয়ার আগেই জব ফেয়ার বা চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে এবং প্রশিক্ষণ শেষে একই দিন প্রশিক্ষণ সনদ ও চাকরির নিয়োগপত্র হস্তান্তর করা হয়। সেপা প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৫৭২ জন মহিলা ও ৩ হাজার ৬৮১ জন পুরুষসহ সর্বমোট ৭ হাজার ২৫৩ জনকে বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, নারী প্রশিক্ষণার্থীদের ৩৩তম ব্যাচে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান, ৩৪তম ব্যাচে এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, ৩৫তম ব্যাচে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার উপস্থিত থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে প্রশিক্ষণ সনদ ও চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দেন। গত ৬ নভেম্বর এটুআই প্রকল্পের উপদেষ্টা আনীর চৌধুরী বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে আসা প্রশিক্ষিত যুবকদের জন্য আয়োজিত জব ফেয়ার বা চাকরি মেলার মাধ্যমে নির্বাচিতদের প্রশিক্ষণ সনদ ও চাকরির নিয়োগপত্র হস্তান্তর করেন। উল্লেখ্য, সাধারণত প্রাণ-আরএফএল, সিনোবাংলা, ম্যাটাডোর প্লাস্টিক ইত্যাদি বড় বড় প্রতিষ্ঠান বিটাকে উপস্থিত হয়ে জব ফেয়ার করে এবং নারী-পুরুষ নির্বাচিত করে তাদের কারখানায় নিয়োগের জন্য গাড়ি নিয়ে এসে তাদের কর্মস্থলে নিয়ে যায়। প্রশিক্ষণ শেষেই শিল্প-কারখানায় চাকরির ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি অনন্য ঘটনা। বহু প্রশিক্ষণার্থী নিজ চেষ্টায় উদ্যোক্তা হয়ে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

ওপরের চিত্র থেকে এটি পরিষ্কার, বিটাকের প্রশিক্ষণার্থীর চেয়ে চাকরির সুযোগ বেশি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে সব মেয়েই চাকরিতে যেতে চান না। তবে ছেলেদের বেলায় প্রায় সবাই প্রশিক্ষণ শেষে চাকরির সুযোগ গ্রহণ করেন। অনেকে উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন আবার অনেকেই বিদেশে চলে গেছেন। বিটাকের সেপা প্রকল্পের নয়টি ট্রেডের মধ্যে একটি হলো কার্পেন্টিং। এ ট্রেড থেকে ট্রেনিং নিয়ে বহু নারী কুটির/হস্তশিল্পজাতীয় পণ্য উৎপাদন করে সমবায় পদ্ধতিতে ব্যবসা করছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন সফল উদ্যোক্তা।

সেপা প্রকল্পটি ২০০৯ সালে শুরু হয়ে পাঁচ বছর চলার পর এর সাফল্যের কারণে ২০১৪ সালে প্রথমবার, ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার এবং ২০১৬ পর্যন্ত তৃতীয়বার সংশোধিত হয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত চলবে। সেপা প্রকল্পের মধ্যবর্তী মূল্যায়নের জন্য গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটি বিটাকের সব কেন্দ্র পরিদর্শন করে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় করে এর অবদান বা ফলাফল পর্যালোচনা করে অভিমত দিয়েছে যে, প্রকল্পটি অত্যন্ত সফল এবং এ ধরনের একটি প্রকল্প চলমান রাখা আবশ্যক। সে বিবেচনায় আন্তঃমন্ত্রণালয় মূল্যায়ন কমিটি সেপা প্রকল্পের দ্বিতীয় ফেইজ শুরু করার জন্য সুপারিশ করেছে, যাতে কোনো রকম বিরতি ছাড়াই ২০১৯ সালের জুলাই থেকেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা যায়। সেপা প্রকল্পের সাফল্যের অন্যতম ধাপগুলো হলোÑ গ্রামগঞ্জ বা শহরের স্বল্পশিক্ষিত পিছিয়ে পড়া বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের ট্যালেন্ট হান্ট পদ্ধতিতে বাছাই করে হাতে-কলেমে প্রশিক্ষণদান, মোটিভেশন সেশনের মাধ্যমে তাদের সাহস ও আত্মপ্রত্যয় বৃদ্ধি করা, জব ফেয়ারের মাধ্যমে চাকরির ব্যবস্থা এবং আত্মকর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে (ঝবষভ-বসঢ়ষড়ুসবহঃ ধহফ ঢ়ড়াবৎঃু ধষষবারধঃরড়হ) বা সেপা প্রকল্প এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজ, বিশেষ করে নারীদের শিল্প-কারখানায় চাকরি দিয়ে স্বাবলম্বী করে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয় বৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, মানানসই জীবনব্যবস্থা, জেন্ডারবৈষম্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিটাকের সেপা প্রকল্প। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ঘোষিত ভিশন ২০২১, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়নে সেপা প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। জয়তু সেপা প্রকল্প।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে