ভাষার গল্প

  খন্দকার মাহমুদুল হাসান

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তোমরা নিশ্চয় ডাইনোসরের নাম শুনেছ। দেখতে কী কিম্ভূতকিমাকার! কত বিচিত্র তাদের আকার! আসলে এক সময় দুনিয়া কাঁপাত ওই প্রাণীগুলো। তবে পুরো কাল নয়। এক সময় তারা হারিয়ে গেল চিরকালের মতো। মজার ব্যাপার হলো, অত যে দাপুটে জানোয়ার, তার মুখে কিন্তু ছিল না কোনো ভাষা। শুধু ডাইনোসরের কথাই বা বলছি কেন, এই দুনিয়ার সব প্রাণীর মধ্যে মানুষ ছাড়া আর কার মুখে ভাষা আছে? নেই, কারোরই নেই। শুধু মানুষই পারে কথা বলতে। আসলে তাও মানুষের বুদ্ধির জোরেই। মানুষের মগজে এমন কিছু আছে, যার জোরে মানুষ কথা বলতে পারে। অন্য কোনো প্রাণীর মগজ এত উন্নত নয়, সে কথা বলতে পারে।

এবার মানুষের কথাই একটু শোনো। মানুষ কথা বলতে শিখেছে বহুকাল আগে। তারপর কেটে গেছে হাজার হাজার বছর। মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দুনিয়ায়। তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নানা জাতির। সৃষ্টি হয়েছে বহু ভাষার। নানা জাতির নানা ভাষা। আদি ভাষাগুলোও একটু একটু করে বদলেছে। আদি ভাষায় শব্দসংখ্যা অল্প ছিল। একদম শুরুতে মানুষ কাজ করত ইশারা-ইঙ্গিতে। যখন প্রথম ভাষা আবিষ্কার করল, তখনো ইশারা-ইঙ্গিতের বেশ কদর ছিল। সেই ইশারা কি এখনো নেই? আছে। চোখের ইশারা, হাতের ইশারা, মাথা দোলানোর ইশারা এসব আমরা করি এখনো। তার মানে ইশারা বিদায় নেয়নি আজও।

তো, আদিকালের যাযাবর মানুষ যখন জায়গা বদল করল, তখন নিত্য-নতুন সমস্যাও এলো, নতুন নতুন জিনিস দেখল, নতুন ধরনের কাজের সঙ্গে তাদের পরিচয় হলো। ফলে বাধ্য হয়েই নতুন নতুন জিনিস বোঝানোর জন্য নতুন শব্দ তাদের দরকার হলো। দিনে দিনে একাধিক জাতির মানুষের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ বাড়ল। এক ভাষার মধ্যে ঢুকতে লাগল অন্য ভাষার শব্দ। এভাবেই বদলাতে লাগল মানুষের ভাষা। সৃষ্টি হতে লাগল নতুন নতুন ভাষা। নদী চলতে চলতে তার পানির যেমন রঙ বদলায়, ভাষার ব্যাপারটাও অনেকটা তেমনি।

একটা ভাষা চিরকাল যে বেঁচে থাকবে, তা কিন্তু নয়। কারণ মানুষ কোনো ভাষার কথা বললেই কেবল সে ভাষা বেঁচে থাকে। কথা না বললে সেই ভাষা মরে যায়। পৃথিবীর অনেক ভাষা মরে গেছে। যেমনÑ হিব্রু ও লাতিন। সেসব ভাষার চর্চার মাধ্যমে সেগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চললেও মানুষ আর মাতৃভাষা হিসেবে সেগুলোর ব্যবহার করছে না। একেকটা ভাষা হলো বিশেষ জনগোষ্ঠীর পরিচয়চিহ্ন। মানে মানুষের জাতি চিহ্নিত করার একটি উপায় হলো তার ভাষা। আবার যেসব জাতি ভাষার পরিচয়ে গড়ে ওঠে সেগুলোর নাম ভাষাজাতি। যেমনÑ বাঙালি। পৃথিবীতে যত মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, তারা সবাই মিলে তৈরি করেছে বাঙালি নামের একটি ভাষাজাতি। যদি বাংলা ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যায়, তা হলে জাতি হিসেবে বাঙালিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই নিজের জাতিগত পরিচয় ধরে রাখতে, বাঁচিয়ে রাখতে হবে নিজের ভাষা। আমরা উদাসীন হলে অন্য কেউ এসে বাঁচিয়ে দেবে না আমাদের ভাষা।

বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষার ওপর অনেকবার বড় বড় বিপদ এসেছে। বাঙালি নিজেদের মাতৃভাষা প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে বলেই সেসব বিপদ রুখে দিয়েছে। বাংলা ভাষার জন্য প্রধান তিনটি আন্দোলন হয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৪৭ থেকে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় চল্লিশের দশকের শেষভাগ থেকে পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত, আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে ১৯৬১ সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল। তিনটি আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। ভাষার জন্য আন্দোলন করেই পুরুলিয়া জেলা বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শিলচরের ভাষা আন্দোলনের ফলেই অসম সরকার বরাক উপত্যকায় সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ছিল বিরাট ঘটনা। এ ঘটনা গোটা দুনিয়ায় আলোড়ন তুলেছিল। এ আন্দোলনের ফলে বাংলা ভাষা পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো একটি দেশের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম করেই বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশের সৃষ্টি হয়েছে। আর বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশের রাষ্ট্রভাষা ও জাতীয় ভাষা হলো বাংলা। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ভাষা আন্দোলন হওয়ায় এ দেশের সব সরকারি কাজকর্মে এবং অফিস-আদালতে বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার করতে হয় এবং দেশের ভেতরে কোনো সরকারি কাজে অন্য কোনো ভাষার ব্যবহার নিষিদ্ধ। এতসব কারণে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন সারা বিশ্বে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য পুলিশের গুলিতে বাঙালির আত্মদানের ঘটনার স্মরণে জাতিসংঘের স্বীকৃতি অনুযায়ী এখন সারা বিশ্বে একসঙ্গে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এই ভাষা দিবস তাই শুধু বাঙালির নয়, এখন গোটা পৃথিবীর গৌরব।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে
close