অমিত আহমেদের গল্প

আ মরি বাংলা ভাষা

  অনলাইন ডেস্ক

১৯ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সালেহ আহমেদ। সঙ্গে স্ত্রী আফরোজা চৌধুরী। দুজনই সরকারি চাকুরি করেন। চুপচাপ বসে আছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের টার্মিনালে দর্শক সারিতে। তাদের একটিই মেয়ে। অনন্যা চৌধুরী। লন্ডন থেকে ফিরছেন ছেলে অনিক ও স্বামী এরফানকে নিয়ে। প্রায় দশ বছর পর ওরা দেশে ফিরছেন। নাতির জন্য আফরোজার প্রায়ই মন খারাপ হয়। কিন্তু কিছুই তো করার নেই। এত আর দেশের ভেতরে ওরা থাকে না। চাইলেই ছুটে যাওয়া যাবে। কিছুক্ষণ আগেই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ল্যান্ড করার সময় পরিবর্তন হয়েছে। দুঘণ্টা পর নামবে বিমান।

সালেহ আহমেদ পাশের দোকান থেকে দুমগ কফি এবং একটা দৈনিক খবরের কাগজ হাতে নিলেন। ফিরে এলেন স্ত্রীর কাছে। তাকে এক কাপ কফি পান করতে বলে চোখ রাখলেন দৈনিক পত্রিকায়।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০০২ সাল। একুশের সুবর্ণজয়ন্তী। সবগুলো পত্রিকায় একই ধরনের খবর। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে সালেহ আহমেদ ফিরে গেলেন তার শিশুবেলায়। তার গ্রামের বাড়ি ছিল থানা সদরে। বাবা ছিলেন সিও অফিসের প্রধান কেরানি। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন। স্কুলের শরীরচর্চার শিক্ষক শওকত স্যার দেশের খবর রাখতেন। উনিই প্রথম ক্লাসে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা দেন। ঢাকার প্রতিদিনের খবর আমাদের জানাতেন। মাঝে মধ্যে মিছিলে নিয়ে যেতেন। পরাধীনতার কষ্ট আমার মনে গেথে গেল। অন্যদের অবস্থাও একই। আমরা সবাই স্বাধীন হতে চাই। এলো ২১ ফেব্রুয়ারি। বড়দের সঙ্গে আমরাও থানা সদরে মিছিল করলাম। রাতে খবর এলো, ঢাকার রাজপথে ছালাম, বরকত, রফিক, জব্বারকে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। তাদের রক্তে ভেসে গেছে ঢাকার রাজপথ। এর প্রতিবাদ শুরু করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। শুরু ঢাকা নয়, সারা দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবাদ শুরু করে দিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল। এরপর প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি সাদা শার্ট, সাদা পাজামা, কালো ব্যাচ পরে খালি পায়ে লাইন ধরা। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে শহীদ মিনারে ফুলের তোড়া দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো। প্রভাত ফেরিতে এককণ্ঠে গেয়ে ওঠাÑ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’। গানের কথায় গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যেত। দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ত। বোধে নাড়া দিত এই গান।

স্কুল পেড়িয়ে কলেজে। বন্ধু-বান্ধব মিলে সকালে প্রভাত ফেরিতে অংশ নেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশের আমেজ ছিল ভিন্ন মাপের। সে যা-ই হোক, এখন ২০০২ সাল। একুশের সুবর্ণজয়ন্তী। ৫০ বছরের পুরনো গল্প। ভাবতে গিয়ে কিছুটা কষ্ট লাগল সালেহ আহমেদের। হঠাৎ টার্মিনালের লাউড স্পীকার থেকে ভেসে এলÑ ‘ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ, এ মাত্র ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ০০৮ ফ্লাইটটি ঢাকার মাটিতে ল্যান্ড করল।

আফরোজা আহমেদের ধাক্কায় সালেহ আহমেদ ফিরে এল চেনা জগতে। কফির বিল মিটিয়ে যাত্রীদের দিকে এগিয়ে গেলেন। নাতি অনিক দৌড়ে এসে নানুভাই ও নানিকে জড়িয়ে ধরল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেল। এখন বাসায় ফেরার পালা। বাসা তো সেই আজিমপুরে, সরকারি কোয়ার্টারে। পথেই পড়ে গেল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সালেহ আহমেদ নাতি অনিককে নিয়ে এগিয়ে যান। রাস্তা থেকে ফুলের তোড়াও কিনেছেন একটা। তোড়া হাতে সালেহ আহমেদ ও নাতি অনিক। দুজনই খালি পায়ে। ওদের দেখে সবাই গাড়ি থেকে নেমে শহিদ মিনারের দিকে পা বাড়ান।

সালেহ আহমেদের লন্ডন প্রবাসী ১০ বছরের নাতি অনিক শহিদ মিনারের পাদদেশে ফুলের তোড়া দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। পাশ থেকে তখন ভেসে আসছিÑ ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা...’।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে