গ ল্প

গর্জন

  জসীম আল ফাহিম

২৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাবুক এক বাঘছানা ছিল। সে আপনমনে কত কী যে ভাবত! ইচ্ছেমতো সে বনের ভেতর বিচরণ করত। আর প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হতো। সে কারো কোনো ক্ষতি করত না। কারো ধারও ধারত না সে। আপনমনে শুধু হেঁটে বেড়াত। আর ঘুরে বেড়াত।

তার এমন ভবঘুরে ভাব দেখে মা বাঘ একদিন আদর করে কাছে ডাকল। বললÑ বাবা রে, জগৎ বড়ই কঠিন জায়গা। বাঘ হয়ে জন্মেছিস। তাই বাঘের মতোই তোকে বাঁচতে হবে। চলতে হবে। কাজকর্ম করতে হবে। কথাবার্তা বলতে হবে। আর প্রয়োজনে গর্জন করতে হবে। যদি তুই এসব না করিস, তা হলে তোর বাঘ হয়ে জন্ম বৃথা। সবাই তোকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে। অবহেলা করবে। কেউ তোকে গুরুত্ব দেবে না। মান্যগণ্য করবে না। কাজেই ঠিক হয়ে চল। ভবঘুরে ভাবসাব বাদ দে। বাঘের মতো বাঁচতে শেখ।

মায়ের কথা শুনে বাঘছানা বললÑ দেখি না মা, কতদিন এভাবে চলতে পারি। যেদিন বুঝব আর পারছি না, সেদিন ঠিকই বাঘ হয়ে যাব মা। আমার জন্য তুমি কোনো চিন্তা করো না মা। বাঘছানার কথা শুনে মা বাঘ তাকে আর ঘাঁটাতে গেল না। শুধু বলল, ঠিক আছে রে বাবা, যেমন তোর ইচ্ছে, কর। কিন্তু সব সময় একটি কথা মনে রাখিস, তুই বাঘের বাচ্চা। তোর শরীরে বাঘের রক্ত বহমান।

বাঘছানা বললÑ ঠিক আছে মা, মনে থাকবে।

কিন্তু বাঘছানা তার স্বাভাবিক নিয়মেই চলাফেরা করতে লাগল। কদিন পর মা বাঘটি হঠাৎ মারা গেল। মা বাঘ জীবিত থাকাকালে বাঘছানার খাবার সে-ই জোগাড় করত। বাঘছানা এখন বড় হয়েছে। মা জীবিত নেই তো কী হয়েছে? বাঘছানা নিজের খাবার নিজেই জোগাড় করতে বের হলো। কিন্তু খাবার জোগাড় করতে গিয়ে সে পড়ল মহাবিপদে। কেউ তার কাছে নিজ থেকে এসে ধরা দিতে চাইল না। বাঘছানা একদিন একটি জেব্রাকে শিকার করার জন্য তাড়া করল। অমনি জেব্রাটি তার পেছনের দু-পা দিয়ে বাঘছানাকে সজোরে একটি লাথি মারল। লাথি দিয়েই জেব্রাটি পালিয়ে গেল। জেব্রার লাথি খেয়ে বাঘছানা একেবারে কাহিল হয়ে পড়ল।

পরদিন বাঘছানা একটি হরিণকে ধরতে গেল। কিন্তু হরিণটি তাকে গুরুত্বই দিল না। সেও জেব্রার মতোই বাঘছানাকে লাথি মেরে বিজলি বেগে পালিয়ে গেল। হরিণের লাথি খেয়ে বাঘছানা বড়ই নাজেহাল হলো।

তার পরদিন বাঘছানা একটি শিয়ালকে শিকার করতে ছুটল। অমনি শিয়ালটি বাঘছানাকে লাগাল রামধমক। শিয়ালের ধমক খেয়ে বাঘছানা তো ‘থ’। সামান্য একটি শিয়াল তাকে ধমকাচ্ছে। ভাবা যায়! পরে সে শিয়ালকে উদ্দেশ করে বললÑ শুনে রাখো শিয়াল, আমি হলাম পশুরাজকুমার। আর তুমি সামান্য শিয়াল। তোমার সাহস তো কম নয়। আমাকে তুমি ধমকাচ্ছ। আমি তোমার কসুর বরদাশত করব না কিন্তু।

বাঘছানার কথা শুনে শিয়াল বলল, তুমি পশুরাজকুমার, না-ছাই। ওসব আমার খোঁজার সময় নেই। আমি হচ্ছি শিয়াল প-িত। প-িতকে সম্মান করতে শেখো। প-িতের সঙ্গে বেয়াদবি করতে এসো না। বেয়াদবির ফল ভালো হয় না। শিয়ালের কথা শুনে বাঘছানা কেমন যেন বোকা হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, বিষয় কি? কেউ আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না কেন? তবে কি মায়ের কথাই ঠিক?

বাঘছানা যখন এসব ভাবছে, ঠিক সে সময় তার পাশ দিয়ে একটি খরগোশ হেঁটে যাচ্ছিল। খরগোশটি আমিরি ভাব করে হাঁটছিল। তার ভাবখানা এমন যেন সে বাঘছানাকে দেখেইনি। একে তো বাঘছানার পেটে ক্ষুধার আগুন। তার ওপর খরগোশটির আমিরি ভাব দেখে তার মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। শেষে গলা ফাটিয়ে সে বিকট এক গর্জন করে ওঠল। আচমকা বাঘছানার গর্জনে বনভূমি থরথর করে কেঁপে ওঠল। বনের ভেতর রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। বনের পশুরা যে যার মতো ছোটাছুটি করতে লাগল। আর খরগোশটি কাঁপতে কাঁপতে অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বাঘছানা পরে অচেতন খরগোশকে খেয়ে তার ক্ষুধা নিবারণ করল। ক্ষুধা নিবারণের পর সে বুঝতে পারল, মাঝেমধ্যে গর্জন করতে হয়। গর্জন না করলে জগৎ-সংসার ঠিকমতো চলে না। এ জগৎ শক্তের বড় ভক্ত।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে