ধূমপানই সিওপিডি রোগে আক্রান্তের মূল কারণ

  অদ্বৈত মারুত

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) হচ্ছে ফুসফুসের অসুখ। এ রোগের ফলে নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। আমাদের দেশসহ বিশ্বের অসংখ্য মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। মূলত সিগারেটের ধোঁয়া এবং দূষিত বাতাস কেউ শ্বাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন গ্রহণ করতে থাকলে শ্বাসনালি কিছুটা স্থায়ীভাবে সরু হওয়াসহ ফুসফুসের বারুথলিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুসফুসের বায়ুপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় রোগী শ্বাসকষ্ট, কাশিসহ দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তিতে পড়ে যায়। রোগটির মারাত্মক পরিণতি নিয়ে কথা হয় মেডিসিন, অ্যাজমা, অ্যালার্জি, টিবি ও চেস্ট রোগ বিশেষজ্ঞ; জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. শাহেদুর রহমান খান-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অদ্বৈত মারুত

আমাদের সময় : সিওপিডি হওয়ার কারণ কী?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : সিওপিডি অর্থাৎ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ হচ্ছে ফুসফুসের শ্বাসনালির ক্রনিক এবং দীর্ঘদিনের প্রদাহজনিত রোগ। এ রোগের কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। রোগটি সৃষ্টি হওয়ার পেছনে পরিবেশগত দূষণ অনেকটাই দায়ী। বিশেষ করে ধূমপান। ধূমপানজনিত কারণ ছাড়াও আমরা যে ধূম তৈরি করে থাকি, তা থেকেও এ রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। গ্রামের মায়েরা রান্নার কাজে চুলায় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করে থাকেন। রান্নার কাজটিও সম্পন্ন করেন আবদ্ধ ঘরে, অর্থাৎ রান্নার সময় যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তা বের হতে পারে না। ফলে তা গ্রহণ করতে হয়। এভাবে নিয়মিত ধূম গ্রহণের ফলে এ রোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে। এ ধরনের ধোঁয়ার মধ্যে মায়েরা দীর্ঘসময় ধরে কাজ করে থাকেন। ফলে তারাও ধূমপায়ী হয়ে যান এবং এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন।

আমাদের সময় : এ রোগ হলে কী ধরনের সমস্যা দেখা দেয়?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : এটি একটি জটিল রোগ। নিয়মিত ধূমপান করলে শ্বাসনালির যে শাখা-প্রশাখা রয়েছে, তা সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং তা ক্রমে স্থায়ী হয়। ফলে পরে আর ওষুধও তেমন কাজ করতে চায় না বা করলেও আংশিক করে থাকে।

আমাদের সময় : টানা কত বছর ধূমপান করলে সিওপিডি রোগে ধূমপায়ী আক্রান্ত হতে পারেন?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : সাধারণত পাঁচ থেকে দশ বছর টানা ধূমপান করলেই এ রোগ শুরু হয়ে যায় এবং রোগ একবার শুরু হলে ক্রমে চলতেই থাকে। বড় কথা হচ্ছে, ধূমপায়ী যত ধূমপান করবে, রোগ ততই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকবে এবং এক সময় ধূমপায়ীর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট দেখা দেবে।

আমাদের সময় : এ রোগের লক্ষণগুলো কী?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : এ রোগের লক্ষণ অনেকটা অ্যাজমা রোগের মতোই। প্রথম প্রথম একটু কাশি থাকে। ধূমপায়ী মনে করেন, এটা সাধারণ কোনো রোগ। তিনি যত ধূমপান করতে থাকেন, কাশি তত বাড়তে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভারী কাজ করতে গেলে হয়রান লাগবে। রোগ যত তীব্র হতে থাকবে রোগী তত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বেন। দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে পড়বেন। যেমনÑ তিনি যখন হাঁটতে থাকবেন, সমবয়সী অধূমপায়ীর চেয়ে তার চলার গতি কম থাকবে। অর্থাৎ তিনি আর সমবয়সী অধূমপায়ী বন্ধুটির সঙ্গে একই তালে হাঁটতে পারবেন না। মোটকথা, তার ফুসফুসে যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন, শরীর তা দিতে পারে না। এভাবে একজন সিওপিডি আক্রান্ত রোগী মারাত্মক শ্বাসকষ্টে ভোগেন। শুধু তা-ই নয়, শরীর প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না পাওয়ায় এবং রোগটি স্থায়ী রোগে পরিণত হওয়ায় শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও দুর্বল হতে থাকে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে হৃৎপি-। এ ধরনের রোগীদের হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। হার্টের রিদম এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। হার্ট ব্লক হতে পারে। হার্ট ফেইল করতে পারে। হার্ট ফেইলিউরের কারণে রোগীর শরীরে পানি আসতে পারে, লিভার বড় হতে পারে। রোগী শুকিয়ে যেতে পারে। খেতে পারে না এবং ক্রমে সাধারণ থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে থাকে।

আমাদের সময় : কত বছর বয়সে একজন ধূমপায়ী এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : ত্রিশ বছর পার হলেই মানুষের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে। বয়স যত বাড়তে থাকে, কার্যক্ষমতাও তত কমতে থাকে। সিওপিডির ক্ষেত্রে বয়স চল্লিশ বছর পার হওয়ার পর লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর আগে তেমনভাবে প্রকাশ পায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগটি এর আগেও দেখা দিতে পারে।

আমাদের সময় : রোগটি কতভাবে হয়ে থাকে?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : সিওপিডি দুভাবে হয়ে থাকে। একটি ক্রমিক ব্রঙ্কাইটিস, আরেকটি হলো এমফাইসিমা। এর মধ্যে জটিল ব্যাধি হলো এমফাইসিমা। এটির ফলে ফুসফুসে মাত্রাতিরিক্ত বাতাস জমা হয়, ফুসফুস খুব দ্রুত ফুলে ওঠে এবং এটির অভ্যন্তরের অংশগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ফুসফুসের স্ফেরিকাল বায়ুথলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং ফুসফুসের স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যায়। এ রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্তি মেলে না। তবে চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

আমাদের সময় : এ রোগ প্রতিরোধে আপনার পরামর্শ কী?

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : প্রথমেই বলব, এ ব্যাপারে চাই গণসচেতনতা। প্রত্যেককে এগিয়ে আসতে হবে। একজন রাজনীতিক যদি বিশাল সমাবেশে দাঁড়িয়ে ধূমপান না করতে তার কর্মীদের উপদেশ দেন এবং ওয়াদা করান, মসজিদের ইমাম যদি নামাজের আগে মুসল্লিদের ধূমপানের কুফল সম্পর্কে ধারণা দেন, নায়ক-নায়িকা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যদি নিজেদের কমিউনিটির ভেতরে কর্মী, ভক্ত বা সাধারণকে এ ব্যাপারে সচেতন করে গড়ে তোলেন, তবেই ধূমপানমুক্ত তারুণ্যনির্ভর সুস্থ, সুন্দর একটি যুবসমাজ পাব। মায়েদেরও সচেতন হতে হবে। ধোঁয়া যেন তার ক্ষতি করতে না পারে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

আমাদের সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ডা. শাহেদুর রহমান খান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে