শীতে চোখ ভালো রাখতে খাবারের গুরুত্ব অপরিসীম

  অদ্বৈত মারুত

১২ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো চোখ। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। বছরের অন্যান্য ঋতুর মতো শীতকালেও চোখ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই আমাদের সবার সাবধান হওয়া প্রয়োজন। শীতকালে চোখ কোন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং তা মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কীÑ তা নিয়ে কথা হয় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক বিশিষ্ট চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক ডা. মো. ছায়েদুল হক-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অদ্বৈত মারুত

আমাদের সময় : শীতে চোখের বাড়তি যতœ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

ডা. মো. ছায়েদুল হক : শীতে তাপমাত্রা যখন কমতে থাকে, তখন বাতাস স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঠা-া হয়ে যায়। এ কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাতাস যতটুকু পানি বা বাষ্প ধারণ করতে পারত, এখন ততটুকু জলীয় অংশ ধারণ করতে পারে না। অর্থাৎ কম ধারণ করে থাকে। এতে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়। মনে রাখতে হবে, শরীরের বেশিরভাগ অংশই হলো পানি। আর এ পানির ভারসাম্য রক্ষা করতে আমরা একদিকে খাবারের সঙ্গে পানি পান করি, আবার শরীর মলমূত্রের সাহায্যে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস ও ত্বকের মাধ্যমে ইভাপোরেশন বা বাষ্পীকরণের মাধ্যমে জলীয় অংশ পরিত্যাগ করে। বাতাসে যখন আর্দ্রতা কমে যায়, তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এবং ত্বকের সাহায্যে বাষ্পীকরণের মাত্রা বেড়ে যায়। চোখের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে থাকে। ঘর গরম রাখতে রুম হিটার ব্যবহার করলে বা আগুন জ্বেলে শীত নিবারণের চেষ্টা করলে সেক্ষেত্রে বাষ্পীকরণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। ফলে শরীরে, বিশেষ করে উপরিভাগ অর্থাৎ ত্বক ও চোখে এক ধরনের জলীয় ঘাটতি দেখা দেয় বা শুষ্কতা তৈরি হয়। চোখের ক্ষেত্রে এটি শুষ্ক চোখ বা ড্রাই আই বলে থাকি। এ সমস্যা দূর করতে তাই চোখের বাড়তি যতœ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের সময় : শুষ্ক চোখ বা ড্রাই আই মোকাবিলায় কোন ধরনের সাবধানতা প্রয়োজন?

ডা. মো. ছায়েদুল হক : চোখ খুবই সংবেদনশীল একটি অঙ্গ। চোখের উপরিভাগ সব সময় একটি পানির আস্তরণে ঢাকা থাকে। এটির নাম টিয়ার। এটি সব সময় চোখ ভিজিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ফলে চোখ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। কোনো কারণে টিয়ারের ঘাটতি দেখা দিলে প্রাথমিক অবস্থায় চোখ জ্বালাপোড়া, চোখ চুলকানো, চোখে খচখচ করা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিয়ে থাকে। টিয়ারের পরিমাণ একদম কমে গেলে তাকাতে এবং দেখতে অসুবিধা হয়। অনেক সময় কর্নিয়া নষ্ট হয়ে স্থায়ী অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। শীতে যখন বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়, তখন চোখের পানির বাষ্পীভূত হওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। চোখের পাতার গ্রন্থি থেকে এক ধরনের তৈলাক্ত নিঃসরণ হয়, যা এই বাষ্পীভূত হওয়া প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে এবং টিয়ার সংরক্ষণের চেষ্টা করে। যারা আগে থেকেই শুষ্ক চোখ বা ড্রাই আই রোগে ভুগছেন অথবা যাদের চোখে টিয়ারের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম, তারা এ সময়ে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারেন। পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি;ের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি প্রযোজ্য। কারণ এ বয়সে চোখের পানি এমনিতেই কমে যায়। নারীদেহে হরমোনের ভারসাম্যের পরিবর্তনও চোখের পানি ঘাটতির একটি কারণ হতে পারে ।

সাবধানতা বলতে শীতে গা ঢেকে রাখার পাশাপাশি লোশন বা মশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে, যা বাষ্পীকরণের মাত্রা কমাতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া এ সময়ে যেসব নারী যারা চোখের শুষ্কতায় ভুগছেন, তাদের ধিঃবৎ ঢ়ৎড়ড়ভ সধশব ঁঢ় পরিহার করা ভালো। কারণ এ প্রসাধনটি চোখের তৈলাক্ত নিঃসরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে টিয়ারের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। শীতে অনেকেই গরম কাপড়ে গা ঢেকে টিভি বা মোবাইল ফোন কিংবা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে অলস সময় কাটান। এটিও ড্রাই আই বা চোখের শুষ্কতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ ব্যাপারেও সবার সাবধান হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ সময় বেশি বেশি পানি পান করতে হবে।

আমাদের সময় : ড্রাই আই ছাড়া আর কোনো চোখের সমস্যা দেখা দিতে পারে কি?

ডা. মো. ছায়েদুল হক : শীতে শরীরের উপরিভাগ বা ত্বকের মতো চোখের আবরণ বা খাদ্যনালি কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসনালির আবরণ ইত্যাদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। রোগজীবাণু, বিশেষ করে ভাইরাস প্রতিরোধে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে এ সময়ে ভাইরাল কনজাংটিভাইটিস বা চোখের প্রদাহ কিংবা চোখ ওঠা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া যারা বরফ অঞ্চলে বেড়াতে যাবেন, তাদের অবশ্যই আল্ট্রা ভায়োলেট প্রতিরোধক সানগ্লাস ব্যবহার করতে হবে। কারণ বরফ থেকে প্রতিফলিত রোদের আলোয় আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে, যা চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ সময়ে স্পোর্টস ইনজুরি, যেমনÑ ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে অনেক খেলোয়াড় কর্কে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, যা চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনে। এ ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, বিশেষ করে প্লাস্টিকের ফ্লাওয়ার বা কর্ক দিয়ে খেলা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়।

আমাদের সময় : শীতে চোখ বা দৃষ্টি ভালো রাখতে খাবারের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি?

ডা. মো. ছায়েদুল হক : চোখের যতেœ বা দৃষ্টি ভালো রাখতে অবশ্যই খাবারতালিকায় খাদ্য উপাদানগুলোর মধ্যে ভিটামিন-এ, সি, ই এবং সেলেনিয়াম রাখা প্রয়োজন। কারণ এগুলো চোখের জন্য খুব উপকারী। আর এসব ভিটামিন ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ শাকসবজির মধ্যে অন্যতম হলোÑ পালংশাক, ব্রকলি ও গাজর, মিষ্টিকুমড়া (পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ এবং ই রয়েছে), টমেটো ও কমলালেবু (পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-সি রয়েছে)। অন্যান্য ঋতুর তুলনায় শীতকালে এ খাবারগুলো অনেক বেশি পাওয়া যায়। তাই সবার এ সুযোগ গ্রহণ করা উচিত।

আমাদের সময় : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ডা. মো. ছায়েদুল হক : আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে