ক্যানসার প্রতিরোধ করা যায়

  ডা. মোহাম্মদ আছাদুজ্জামান বিদ্যুত

১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ক্যানসার একটি মরণব্যাধি। এ রোগে শুধু আমাদের দেশের মানুষই আক্রান্ত হয় না, বিশ্বব্যাপী এ রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৬ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এখনই এ রোগ প্রতিরোধ করতে না পারলে এবং এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ২ কোটি ৬০ লাখ ও মারা যাওয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যারা মারা যাচ্ছে, এদের ৭০ শতাংশই আমাদের মতো গরিব দেশগুলোর মানুষ।

কিন্তু ক্যানসার মানেই যে মৃত্যু নয়, এ কথা আমরা অনেকেই জানি না। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েও অনেক বছর সুস্থভাবে বেঁচে আছেন, এমন লোকের সংখ্যা মোটেও কম নয়। শুধু তা-ই নয়, ক্যানসার রোগটি প্রতিরোধ করা যায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য। এক-তৃতীয়াংশ ক্যানসার শুরুতেই নির্ণয় করতে পারলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

গবেষণায় দেখা গেছে, ধূমপানের কারণেই ৩৩ শতাংশ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। এমন কোনো ক্যানসার নেই, যেটির সঙ্গে ধূমপানের সম্পর্ক নেই। বিশ্বে ১৩ লাখ মানুষ মারা যায় ফুসফুস ক্যানসারে। এ ক্যানসারের ৯০ শতাংশই ধূমপায়ী। সিগারেট-বিড়িতে ৬৫ ধরনেরও বেশি ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারেÑ এমন পদার্থ থাকে। অধূমপায়ীরা ধূমপায়ীদের মাধ্যমে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন।

মদ্যপান করলে মুখ, গলা, যকৃৎ, খাদ্যনালি ও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। ৪ শতাংশ ক্যানসারের জন্য দায়ী মদ্যপান। পান-সুপারি, জর্দা, তামাক পাতা বাংলাদেশে মুখ ও গলা ক্যানসারের অন্যতম কারণ। শারীরিক পরিশ্রমের প্রতি অনীহা, ফাস্টফুড, শৈশব থেকে খেলাধুলার প্রতি অনীহায় বাড়ছে স্থূলতা রোগ। শুধু মোটা হওয়ার কারণে নারীর শরীরে দেখা দিচ্ছে জরায়ুর ক্যানসার, স্তন ক্যানসার, খাদ্যনালি ও পায়ুর ক্যানসার। খাবারে ভেজাল, প্রিজারভেটিভ ও রঙিন খাবার, কম পরিমাণে ফলমূল ও শাকসবজি, আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া এবং অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত মাংস বা খাবার গ্রহণের কারণে বেড়ে যায় ক্যানসারের ঝুঁকি। মোট ক্যানসারের ৩০ শতাংশই খাবারের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, যৌনরোগ, বায়ুদূষণের কারণে বেড়ে যাচ্ছে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা।

আমাদের দেশে আর্সেনিক সমস্যার কারণেও মানুষ ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে থাকে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করা উচিত নয়। যারা গার্মেন্টস ও অন্যান্য কারখানায় কাজ করেন, তাদের মুখে মাস্ক পরা উচিত। এক্স-রে বা অন্য ধরনের রেডিয়েশন থেকে দূরে থাকতে হবে। স্তন ক্যানসার, পায়ুপথের ক্যানসার ও জরায়ুমুখ ক্যানসার শুরুতেই নির্ণয় করা সম্ভব হলে এ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া সম্ভব। জরায়ুমুখ ক্যানসারে ভায়া পরীক্ষার মাধ্যমে শুরুতে নির্ণয় করা যায়। সরকারি সদর হাসপাতাল, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নির্বাচিত ইউনিয়ন সাব সেন্টারে এ পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয়। এ ছাড়া প্যাপ স্মেয়ার করা যেতে পারে। স্তন ক্যানসার নির্ণয়ে প্রতিমাসে মাসিক শুরুর ৭-১০ দিন পর বা মাসিক শেষ হওয়ার ৩ দিন পর নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা স্তন ক্যানসার শুরুতে নির্ণয়ে অনেক ভূমিকা রাখে। স্তন পরীক্ষার সময় স্তনে কোনো অস্বাভাবিকতা, শক্ত চাকা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। যকৃতের ক্যানসার থেকে রক্ষা পেতে হেপাটাইটিস টিকা দিয়ে নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিনটি টিকা দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। আমাদের দেশে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত টিকা নেওয়ার ব্যাপারে চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

লেখক : মেডিক্যাল অনকোলজি অ্যান্ড ক্যানসার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা

চেম্বার : আলোক হেলথ কেয়ার হসপিটাল লিমিটেড, মিরপুর ১০, ঢাকা

০১৯১৩০৭৬২৩৬, ০১৯১৫৪৪৮৪৯১

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে