হলিস্টিক পদ্ধতিতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

  অদ্বৈত মারুত

২৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৮, ১০:১০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগটি থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। তবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নিয়ন্ত্রণের প্রধান শর্ত হলোÑ রোগীকে নিয়ম-নীতি মেনে জীবনযাপন করতে হবে। অর্থাৎ তার খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে, ওজন ঠিক রাখার জন্য টোটাল ক্যালরি ঠিক রেখে খেতে হবে। এক্সচেঞ্জ ডায়েট সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। প্রচলিত ওষুধের বিকল্প হিসেবে হলিস্টিক চিকিৎসা পদ্ধতি এ ক্ষেত্রে বেশ কার্যকর। এই বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কথা হয় হলিস্টিক হেলথ কেয়ারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অদ্বৈত মারুত

আমাদের সময় : ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতির বাইরে বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে হলিস্টিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই।

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : হলিস্টিক মানে হলো হোল বডি। আমাদের শরীরের তিনটি অংশ। আত্মা, মন ও শরীর। বাইরে থেকে কেবল শরীরটা দেখি এবং শরীরের আমরা চিকিৎসা দিয়ে থাকি। ওষুধ দিয়ে শারীরিকভাবে উন্নতি লাভ করা যায়। কিন্তু আত্মা ও মনের কোনো উন্নতি ঘটে না। এতে অসংক্রামক রোগ ক্রমে বাড়তে থাকে। আজ থেকে ৫০ বছর আগে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ অনেক কম ছিল। এখন অনেক বেড়ে গেছে। ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক, উচ্চ রক্তচাপ এসব ব্যাধি ক্রমে বাড়ছে। যদি প্রতিরোধ করতে হয়, তা হলে ওষুধের পাশাপাশি আত্মা, মন ও শরীরের উন্নতি করতে হবে। যখন আমরা পুরো শরীরটায় উন্নতি ঘটাতে পারব, তখন শরীর ঠিক হবে। হলিস্টিক পদ্ধতিতে রোগগুলো প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা সম্ভব। এই পদ্ধতিটি অনেক আগের। মুনি-ঋষিরা পাহাড়ে বসে ধ্যান করতেন। ধ্যান করে মস্তিষ্ক যদি স্থির করা যায়, মানসিক চাপ যদি কমানো যায়, মানসিক চাপের নিঃসরণ যদি কমানো যায়, তবে রোগগুলো কমে যাবে।

আমাদের সময় : তার মানে রোগগুলোর মূল কারণ অনেকটাই মানসিক...

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : সব কিছুর মূলে হলো মানসিক চাপ। এটি আগে কমাতে হবে। পাশাপাশি কিছু শারীরিক কাজকর্ম করতে হবে। ব্যায়াম করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। অর্থাৎ যে তিনটি কারণে এ রোগগুলো হচ্ছেÑ মানসিক চাপ, কম কাজ করা এবং ফাস্টফুড খাওয়াÑ এগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব হলে রোগীর উন্নতি হবেই।

আমাদের সময় : কিসের মাধ্যমে এ পদ্ধতি করা হয়ে থাকে?

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : প্রথমেই এ ক্ষেত্রে আত্মার উন্নতি করতে হয় মেডিটেশনের মাধ্যমে। মনের উন্নতি ঘটে কতগুলো নিউরোবিক বিষয়ের মধ্য দিয়ে। আর শরীরের উন্নতি ঘটাতে কিছু যোগব্যয়াম, প্রাণায়াম, মেডিটেশন এগুলোর মাধ্যমে। আত্মা, মন ও শরীরের উন্নতি করতে পারলে অসংক্রামক রোগ, যেমনÑ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, মাইগ্রেন, ব্যাকপেইন এগুলো প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা যায়।

আমাদের সময় : ডায়াবেটিস রোগীকে এ ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিকারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন?

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : প্রায় পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ। এর অন্যতম কারণ হলো মানসিক চাপ। কারণ আমরা যত সভ্যতার দিকে এগোচ্ছি, যত উচ্চ সমাজ মেনে চলছি, আমাদের মানসিক চাপ দিন দিন ততই বেড়ে চলেছে। দ্বিতীয় কারণ হলো, আমরা কাজকর্ম খুব কম করি। তৃতীয় কারণ হলো, আমরা বেশি বেশি খাওয়া-দাওয়া করি। এসব কারণে সমস্যাগুলো দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে ওষুধ যিনি খান বা খাবেন, তাকে এক্ই সঙ্গে কিছু ব্যায়াম করতে হবে। যেমনÑ মানসিক চাপের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক রয়েছে। কারণ মানসিক চাপের যে হরমোন এগুলো বাড়লে ডায়াবেটিসও বেড়ে যায়। যত ওষুধ খাওয়ানো হয়, মানসিক চাপ যদি না কমে, হরমনের নিঃসরণ যদি না কমানো যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এই মানসিক চাপ কমাতে কতগুলো পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মেডিটেশন। মনের উন্নতি করতে প্রয়োজন নিউরোবিক ব্যায়াম। শরীরের জন্য কিছু যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, আকুপ্রেশার এগুলো করি। এতে ডায়াবেটিস ক্রমে কমে আসে।

আমাদের সময় : এটির কার্যকারিতা কতদিন?

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : হলিস্টিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এ পদ্ধতিটি একটু ধামাচাপা পড়ে গেছে। রোগ নিরাময়ে কার্যকরী বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কৃত হলেও উন্নত বিশ্ব এখন দেখছে ওষুধ দিয়ে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। ওষুধের পাশাপাশি হলিস্টিক পদ্ধতি গ্রহণ করা উচিত। এ চিকিৎসা সারাজীবন করা যায়। কারণ ব্যায়াম করতে অসুবিধা নেই। ধ্যান করতেও সমস্যা নেই। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ অনিরাময়যোগ্য রোগ। আজীবন থাকবে। যত দিন মানুষ বাঁচবে, নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে যদি ওষুধ কম খেয়ে থাকা যায়, তা হলে অনেক ভালো। এমন অনেক রোগী রয়েছে, যারা ইনসুলিন নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। যে রোগী নিয়মকানুন বেশি মেনে চলেন, তার উন্নতি তত বেশি হয়। এর মানে জীবনযাপনের ধরনের একটি উপায় বলে দেওয়া।

আমাদের সময় : রোগীদের এ ক্ষেত্রে খাবার-দাবারের তালিকাটা কেমন?

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : এখন আমরা ফাস্টফুড, জাঙ্কফুড খেতে অভ্যস্ত। এগুলো বাদ দিয়ে আমাদের প্রাকৃতিক খাবার খেতে হবে। যেমনÑ আগে ঢেঁকি ছাটা চাল ছিল। এখন সব আঁশ জাতীয় খাবার আমরা বাদ দিয়ে দিচ্ছি। এতে আমাদের এ রোগগুলোর প্রকোপ বেড়ে যাচ্ছে। খাবারের মধ্যে বিশেষ করে প্রাকৃতিক খাবার, যেমনÑ শাক খেতে হবে, সবজি খেতে হবে, মাছ খেতে হবে এবং পুষ্টিকর সবই খেতে হবে। শুধু লাল মাংস, গরু, খাসি, ঘি ছানা এগুলো বাদ দিয়ে খেতে হবে। এই যে আমরা উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা করি, মনের চাপ যতক্ষণ পর্যন্ত না কমানো হবে, এ উচ্চ রক্তচাপ কখনো নিয়ন্ত্রণে আসবে না। হলিস্টিক পদ্ধতির মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে।

আমাদের সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস : আপনাকেও।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে