থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগেই রক্ত পরীক্ষা করতে হবে

  দুলাল হোসেন

১১ মে ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১১ মে ২০১৮, ০৮:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

থ্যালাসেমিয়া একটি জটিল বংশগত রোগ। দেশের প্রায় পৌনে দুই কোটি লোক থ্যালাসেমিয়ার বাহক। থ্যালাসেমিয়ার বাহক নারী ও পুরুষের মধ্যে বিয়ে দেওয়া না হলে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার দুলাল হোসেন

আমাদের সময় : থ্যালাসেমিয়া কী?

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম : থ্যালাসেমিয়া হচ্ছে রক্তস্বল্পতাজনিত বংশগত রোগ। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকার মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন থাকে। আলফা ও বিটা দুটি চেইন রয়েছে। যদি এর একটি চেইন ডিফেকটিভ থাকে, তা হলে ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন হয়ে যায়। ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন হওয়ার কারণে রক্তের সেলগুলো ৩ মাস বাঁচার কথা থাকলেও সেটি লাইফটাইম হয়ে যায় ৪০ দিন। যখন ৩ মাসের স্থলে ৪০ দিন হয়ে যায়, তখনই রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। আর রক্তশূন্যতা দেখা দিলে তাকে রক্তে দিতে হয়। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত লোককে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রক্তে দিতে হয়। তবে এটি কোনো ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শ, বাতাস, পানি, খাবার, কাপড়-চোপড় কিংবা অন্য কোনো কিছুর সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায় না। দেশে থ্যালাসেমিয়ার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে, ১০ থেকে ১২ শতাংশ লোক থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী হিসেবে রয়েছে। আমাদের সচেতনতার অভাবে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাবা-মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী হলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে থাকে। বাবা ও মায়ের যে কোনো একজন থ্যালাসিমিয়ার বাহক বা রোগী হলে তাদের সন্তান আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না। তাই বিয়ের আগে বর ও কনের রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত তাদের উভয়ই থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী কিনা। যদি দুজন বাহক বা রোগী হয়, তা হলে বিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

আমাদের সময় : থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা সম্পর্কে বলুন।

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম : থ্যালাসেমিয়া সাধারণত দুধরনের হতে পারে। আলফা থ্যালাসেমিয়া ও বিটা থ্যালাসেমিয়া। আলফা থ্যালাসেমিয়া রোগের উপসর্গ মৃদু আর বিটা থ্যালাসেমিয়ার রোগের উপসর্গ অনেক বেশি। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তদের জন্য দুধরনের চিকিৎসা রয়েছে। এর একটি হচ্ছেÑ রক্ত কমে গেলে শরীরে নতুন রক্ত দেওয়া আর দ্বিতীয় হচ্ছে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন (প্রতিস্থাপন) করা। তবে আমাদের যে চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে, সেটি হলো রোগীর শরীরের রক্ত কমে গেলে রক্ত দিয়ে রাখা। ফলে রোগীর দেহে কিছুদিন পর পর রক্ত দিতে হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে নিয়মিত রক্ত দিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে রাখা যে কোনো পরিবারের জন্য খুবই কষ্টকর। আবার এ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও আছে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আক্রান্ত মানুষকে রক্ত দিতে হয়। নিয়মিত রক্ত দেওয়ার কারণে রোগীর শরীরে আয়রন জমে যায়। যে আয়রন ভেঙে দিতে আবার অন্য ওষুধ প্রয়োগ করে আয়রন রোগীর দেহ থেকে বের করে আনতে হয়। এ ছাড়া শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হয় না। সেজন্য গ্রোথ ডিটেকশন করতে হয়, থাইরয়েড ডিটেকশন করতে হয়। এগুলো করতে করতে লাইফটাইম পেয়ে থাকে ৩০-৪০ বছর। এটির উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন। এটি দেশের চারটি হাসপাতালে হয়ে থাকে। এ চিকিৎসা পদ্ধতি খুবই ব্যয়বহুল। ফলে সবার পক্ষে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন করা সম্ভবও হয় না। তা ছাড়া বোনোম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের ক্ষেত্রে যিনি দাতা, তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হয়, তিনি বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনের জন্য উপযুক্ত কিনা।

আমাদের সময় : থ্যালাসেমিয়ার প্রতিরোধ সম্পর্কে বলুন।

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম : থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে। এ কাজে সরকারকে বিশেষভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার যদি আইন করে বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের সময় রক্ত পরীক্ষা রিপোর্ট জমা দেওয়ার বিধান বাধ্যতামূলক করে দেয়, তা হলে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী শনাক্ত হয়ে যাবে। যদি দেখা যায়, বর ও কনে থ্যালাসেমিয়ার বাহক, তা হলে বিয়ে বাতিল করতে হবে। আইন করে দেওয়ার পর কাজিরা যদি রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়া বিয়ে পড়ানো বন্ধ রাখেন, তা হলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে এবং থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে।

বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি হাসপাতাল ও ইয়ুথ ক্লাব অব বাংলাদেশের তথ্যানুযায়ী, বাবা ও মা দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাদের সন্তান ৫০ শতাংশ বাহক, ২৫ শতাংশ রোগী এবং বাকি ২৫ শতাংশ সুস্থ হিসেবে জন্ম নিতে পারে। আর বাবা-মায়ের একজন বাহক ও একজন সুস্থ হলে তাদের সন্তান ৫০ শতাংশ সুস্থ এবং ৫০ শতাংশ বাহক হিসেবে জন্ম নিতে পারে। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে ছেলে ও মেয়ের রক্ত পরীক্ষা করে দুজন বাহকের মধ্যে বিয়ে দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে।

আমাদের সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম : আপনার মাধ্যমে আমাদের সময়ের সব পাঠককে ধন্যবাদ।

 

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে