চোখের জ্বালাপোড়া বা আই স্ট্রেইন

  ডা. মো. সায়েদুল হক

১৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারাদিন কাজ শেষে যখন শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। কেউ ঘুমিয়ে বিশ্রাম নেই। আবার কেউ সোফা বা বিছানায় এমনিতেই একটু অলস সময় কাটাই, যাতে শরীর আবার ফ্রেশ হয়ে ওঠে। এতে শরীর চাঙ্গা হলেও চোখ বেশি লাভবান হয় না। কারণ চোখ এবং মস্তিষ্ক কেবল ঘুমালেই বিশ্রাম পায়। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি মানুষের কায়িক পরিশ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে চোখের কাজ। সারাদিন বসে বসে কম্পিউটার, মোবাইল টিভি দেখার পাশাপাশি এখন পড়াশোনাও অনেকটা স্ক্রিননির্ভর হয়ে উঠছে। অর্থাৎ মানুষ এখন সারাদিন মস্তিষ্ক এবং চোখের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। চোখও ক্লান্ত হয়। তারও বিশ্রাম দরকার। আমরা বিষয়টি বুঝতে পারি না বা অবহেলা করে পার পাওয়ার চেষ্টা করি। ফলে দিনশেষে দেখা যায়, চোখ জ্বালাপোড়া করছে। সঙ্গে চোখব্যথা, চোখ লালচে হয়ে আসা, চোখে শুষ্কভাব দেখা দেওয়া অথবা পানি ঝরতে থাকে। অনেক সময় ঝাপসা দেখি। এটি হলো চোখের স্ট্রেস বা ক্লান্তি বা আই স্ট্রেইন। দীর্ঘদিন এমনটি চলতে থাকলে এর সঙ্গে যুক্ত হয় মাথাব্যথা, ঘাড়ব্যথা, এমকি পিঠব্যথা। কম্পিউটারে দীর্ঘক্ষণ কাজ করায় উদ্ভূত এ উপসর্গগুলো একত্রে কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোমও বলা হয়। সারাদিন বইয়ে চোখ রাখলে বা লেখালেখি করলে চোখ যতটা ক্লান্ত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্লান্ত হয় কম্পিউটার, মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল স্ক্রিনে চোখ রাখলে।

ডিজিটাল স্ক্রিনে ক্লান্তি আসার কারণ : ডিজিটাল স্ক্রিনে কাজ করার সময় কতগুলো অতিরিক্ত বিষয় কাজ করে। প্রথমত ডিজিটাল স্ক্রিন থেকে আলো রিফ্লেক্ট করে। স্ক্রিনের কন্ট্রাস্ট গ্লেয়ার ইত্যাদি ফোকাস করতে বা দেখতে অসুবিধা হয়। চোখকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। দ্বিতীয় কারণ হলো, হাতের আঙুল। আঙুল হলো শরীরের যে কোনো অঙ্গের চেয়ে একটি ব্যতিক্রম অঙ্গ। আঙুলের নড়াচড়ার মাধ্যমে খুবই সূক্ষ্ম কাজ সাধিত হয়। একই কারণে আঙুলের সূক্ষ্ম ও ত্বরিত কাজগুলো সামাল দিতে মস্তিষ্কেরও অনেক বেশি যতœ নিতে হয়। যখন একজন দ্রুতগতিতে কম্পিউটারে টাইপ বা অনুরূপ কাজ করে, তখন মস্তিষ্কে এক ধরনের তা-ব চলতে থাকে। আমরা অবশ্য এটা অনুভব করি না। মস্তিষ্ক যত বেশি পরিশ্রম করে, তত বেশি এক ধরনের কেমিক্যাল নির্গত করে। ফলে মস্তিষ্ক এবং চোখ দ্রুত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক ও চোখ সচল রাখতে বর্জ্যসম এ কেমিক্যাল দ্রুত শরীর থেকে বের করে দিতে হয়। এ কাজটি দ্রুত করে রক্তপ্রবাহ। কম্পিউটারে কাজ করার সময় কেবল হাতের আঙুল ছাড়া শরীরে সব অঙ্গ প্রায় নিষ্ক্রিয় থাকে। এটি রক্তপ্রবাহ সøথ করে দেয়। ফলে বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যাপারটি বাধাগ্রস্ত হয়। তৃতীয় বিষয়টি হলো, চোখের পলক। কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের পলক ফেলার হার কমে যায়। পলক ফেলার মাধ্যমে চোখের পাতা চোখের উপরিভাগ ভেজা রাখতে সাহায্য করে। কোনো কারণে এ পলক ফেলার হার কমে গেলে চোখ শুষ্কতায় ভোগে। ফলে চোখ জ্বালাপোড়া, চোখব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।

যদিও আই স্ট্রেইন মারাত্মক কোনো ক্ষতি বয়ে আনে না। তবু এটি খুবই অস্বস্তিকর এবং কাজে বেশ বিঘœ সৃষ্টি করে। সতর্ক হয়ে এ সমস্যাটি অনেকাংশে পরিহার করা যায়। ডিজিটাল স্ক্রিন (কম্পিউটার, মোবাইল, টিভি ট্যাব ইত্যাদি) ব্যবহারে কতগুলো বিষয় মেনে চলতে হবে। যেমনÑ কিছুক্ষণ পর পর কাজে বিরতি দেওয়া, স্ক্রিনে কোনো ধুলাবালি বা আঙুলের ছাপ ইত্যাদি থাকলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করে নেওয়া, কম্পিউটার জানালার পাশে রেখে কাজ না করা, ঘরে স্বাভাবিক আলোর ব্যবস্থা রাখা। এ ছাড়া লাইট যেন সরাসরি স্ক্রিনে না পড়ে, এমনভাবে স্ক্রিন সেট করতে হবে। ল্যাপটপ বা কম্পিউটার যা-ই হোক, ব্যবহার করার সময় খেয়াল রাখতে হবে, যেন এটি চোখের লেভেলের নিচে থাকে। স্ক্রিনের দূরত্ব চোখ থেকে ২০-২৬ ইঞ্চি অথবা হাত আন্দাজ হওয়া উচিত। বসাটা যেন আরামদায়ক হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ঘর অবশ্যই ধূমপানমুক্ত রাখতে হবে। সোফায় হেলান দিয়ে বা যেনতেনভাবে বসে বা শুয়ে কাজ না করা, বিশেষ করে যাদের ঘাড় বা পিঠব্যথা আছে।

সর্বোপরি নিয়মিত এক্সারসাইজ এবং পর্যাপ্ত ঘুম খুবই সহায়ক। অনেক সময় আর্টিফিসিয়াল টিয়ার ব্যবহার করতে হয়। এরপরও সমস্যা থাকলে একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখিয়ে প্রয়োজনে ব্যবস্থাপত্র নিতে হবে।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন

প্রাক্তন সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল, আইডিয়াল আই কেয়ার সেন্টার, ৩৮/৩-৪, রিং রোড, শ্যামলী, আদাবর, ঢাকা। ০১৯২০৯৬২৫১২, ০১৮৪৭০৯২৬৯২

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে