এখনো এক আতঙ্কের নাম ডেঙ্গুরোগ

  ডা. অমৃত লাল হালদার

১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবার শুরু হয়েছে ডেঙ্গুজ্বরের মৌসুম। প্রতিদিন অনেক রোগী আসছে। কারো কারো ভর্তিও লাগছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশিরভাগই খুব দ্রুত খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মোটামুটি সবার জানা, এডিস মশকির মাধ্যমে এ রোগ হয়। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত কোনো রোগীকে কোনো এডিস মশকি কামড়ালে সে নিজেও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যায়। এ মশকি যখন আরেকজন সুস্থ ব্যক্তিকে পুনরায় কামড়ায়, তখন সুস্থ মানুষটিও ডেঙ্গুরোগে আক্রান্ত হয়। তাই ডেঙ্গুরোগবাহিত মশকির কামর থেকে দূরে থাকলেই শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ রোগের কোনো টিকা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

প্রতিরোধই প্রধান : সাধারণত বর্ষার সময় দিনের বেলা, বিশেষ করে সন্ধ্যার আগে এবং ভোরে এডিস মশকি কামড়ায়। তাই দিনের বেলা ঘুমাতে চাইলে মশারি টাঙিয়ে নিতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবশ্যই মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে আবার রোগীকে কোনো মশকি না কামড়ায়। নিজ দায়িত্বে বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বাড়ির আশপাশে এমন কোনো অব্যবহৃত জিনিস রাখা যাবে না, যাতে পানি জমতে পারে। যেমনÑ ভাঙা ফুলের টব, অব্যবহৃত কৌটা, ভাঙা ফুলদানি, ভাঙা বেসিন, অব্যবহৃত টায়ার, ডাবের খোসা, মুখ খোলা পানির ট্যাঙ্ক, প্লাস্টিকের প্যাকেট, পলিথিন ইত্যাদি।

উপসর্গ : বেশি জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথা, চোখে, জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধিতে, মাংসপেশি অথবা হাড়ে ব্যথা। হামের মতো র্যাশ বা ফুসকুড়ি নাক, দাঁতের মাড়ি থেকে অল্প রক্তপাত ইত্যাদি সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরের লক্ষণ। লক্ষণগুলো রোগীর বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। ছোট বাচ্চা ও প্রথমবার আক্রান্তদের থেকে বয়স্ক, শিশু ও দ্বিতীয়বার আক্রান্তদের মধ্যে রোগের তীব্রতা বেশি হয়। সাধারণত ৩-৭ দিনের মধ্যেই জ্বরের তাপমাত্রা কমতে থাকে। তবে তীব্র পেটব্যথা ও ক্রমাগত বমি, ত্বকে লাল দাগ, নাক ও মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়লে, বমির সঙ্গে রক্ত এলে, কালো বা আলকাতরার মতো পায়খানা হলে, ত্বক ফ্যাকাসে, ঠা-া ও স্যাঁতসেঁতে হলে, শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

চিকিৎসা : এই রোগের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তাই রোগের লক্ষণগুলোর ওপর চিকিৎসা দেওয়া হয়। সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন। পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার (খাবার স্যালাইন, ঘরে তৈরি টাটকা জুস, শরবত, ডাবের পানি, চিড়ার পানি, ভাতের মাড় ইত্যাদি) দিন। স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানিতে কাপড় ভিজিয়ে শরীর বারবার মুছে দিন। মাথায় পানি, কপালে জলপট্টি দিন। জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ট্যাবলেট বা সিরাপ খাওয়ানো যায়। কিন্তু রোগীকে অ্যাসপিরিন, স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক বা এ জাতীয় ওষুধ দেবেন না।

কিছু ভুল ধারণা : ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে অনেক রকম ভুল ধারণা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন আসে তা হলোÑ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে কিনা? তাদের ধারণা, শিশুর হয়তো ডেঙ্গুজ্বর হবে। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। মায়ের দুধের সঙ্গে ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুর ভাইরাস শিশুর শরীরে যেতে পারে না। তবে শিশুটিকে যদি ডেঙ্গুজ্বর আক্রান্ত মশা কামড় দেয়, তা হলে শিশুটিরও ডেঙ্গুজ্বর হতে পারে। ডেঙ্গুজ্বর একটা ছোঁয়াচে রোগ, আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করলে বা সঙ্গে থাকলে অথবা যতœ করলে, একসঙ্গে খাবার খেলে তারও ডেঙ্গু হয়ে যাবে, আক্রান্ত রোগীকে পৃথক করে রাখা উচিতÑ এমন ধারণা সম্পূর্ণই ভুল। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীকে স্পর্শ করলে, একই বিছানায় ঘুমালে, একই তোয়ালে কিংবা একই কাপড়চোপড় ব্যবহার করলে, একই গ্লাস বা প্লেট ব্যবহার করলে অন্যদেরও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি উপসর্গ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে ছয়-সাত দিন পর্যন্ত মশার জন্য সংক্রামক হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ এ সময়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো এডিস মশকি কামড় দিলে সে-ও ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণুবাহক হয়ে পড়বে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেলে তখন আর এটি হবে না। তাই এ সময়ে আক্রান্ত রোগীকে মশারির নিচে রাখা যেতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, একবার এ জ্বর হলে বাকি জীবন আর কখনো হবে না। এ ধারণা সত্য নয়। কারণ ভাইরাসের যে কোনো এক প্রজাতি দিয়ে একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে ওঠার পর ভবিষ্যতে ভাইরাসের সেই প্রজাতির মাধ্যমে আর আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। কারণ রোগীর আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তবে বাকি তিনটি প্রজাতির যে কোনো একটি দিয়ে আক্রান্ত হতে পারে। তবে কেউ যদি পৃথকভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রজাতি দিয়ে জীবনে চারবার আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তা হলে বাকি জীবন আর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত নাও হতে পারেন, যা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু বাতাসে ছড়ায়Ñ এমনও ভাবেন অনেকে। আসলে শুধু ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্ত এডিস মশকির কামড়েই কোনো ব্যক্তি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। কাজেই বাতাসে ডেঙ্গুজ্বরের জীবাণু উড়ে বেড়ানোর সুযোগ নেই। অনেকে আবার খাওয়ানোর ব্যাপারে ভুল জানেন। ডেঙ্গুরোগীকে শুধু স্যালাইন কিংবা শুধু তরল খাওয়ানো যাবে আর কিছু নয়। আসলে সবই খাওয়ানো যাবে, তবে তরল খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

লেখক : শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ

আবাসিক চিকিৎসক, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহীম মেডিক্যাল কলেজ (মহিলা ও শিশু হাসপাতাল), সেগুনবাগিচা, ঢাকা

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে