x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

বিবিধ হুমায়ূন আহমেদ

  ইফতেখার মাহমুদ

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিটিভিতে প্রচারিত ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকটি খুবই জনপ্রিয় ছিল। ছোট্ট মেয়ে টুনি গল্পের শেষে অসুখে মারা যায়। লোকে খুব চেয়েছিল টুনি বাঁচুক। পত্রিকায় লেখা হতো। শুনেছি লেখকের কাছে অনুরোধ জানিয়ে নানান চিঠি আসত।

একবার এক সাংবাদিক হুমায়ূন আহমেদকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটি না হলে হতো না?

হুমায়ূন আহমেদ যা উত্তর দিলেন তা মোটামুটি এ রকমÑ না, হতো না! টুনির মৃত্যুতে শোক আছে মানি, কিন্তু সত্যও তো আছে। আবার বিদেশ থেকে রোগ সারিয়ে ফিরে এলে টুনি বাঁচত হয়তোÑ কিন্তু শুধু অর্থাভাবে মেয়ের চিকিৎসা করাতে না পারা মতিঝিলের ঝুপড়িতে থাকা এজি অফিসের পিয়ন বাবাটির সাত বছরেই মরে যাওয়া কন্যাটির জন্য রোজ সকালের যে গোপন কান্না, তার তখন কী হবে? সেই দুঃখে আমার দায় আছে। বিদেশে গেলেও রোগ সারে না, টাকায় সব সময় মানুষ বাঁচানো যায় না। লোকে মারা যায়, তাই মারা যায়। ঐ বাবাটিকে বলতে চাই, এ মৃত্যুর জন্য তুমি দোষী নও। আমার হাত আলতো করে আমি সেই কাঁধে রাখতে চেয়েছি। মহাকাব্যের ‘শোক’ আমার নয়, ‘ছোটগল্পের’ দুঃখতেই সই।

নিজের আনন্দের জন্য লিখি বলে একটা কথা হুমায়ূন আহমেদ প্রায় প্রায়ই বলতেন। ‘এইসব দিনরাত্রি’ নাটকের টুনি যেভাবে মারা যায়, বাকের ভাইও, লোকদের হাজার রকম আবেদন, দাবি সত্ত্বেও মারা যান। বাকের ভাইকে বাঁচিয়ে না রাখা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয় দর্শকদের মনে। অনেকেই হুমায়ূনকে নিষ্ঠুর লেখক বলতে থাকেন।

হুমায়ূন আহমেদও আর লেখকের মতো নিয়তিতাড়িত লেখক। বেচারা কেন যে বলেন, নিজের আনন্দের জন্য লিখি। আসলে তার কোনো স্বাধীনতা নেই, নিজের আনন্দ তো আনন্দ নয়, সে তো তীব্র দুঃখ আর বেদনামাখা এক অনির্বচনীয় বোধ। লেখকের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। তিনি কিছুই বেছে নিতে পারেন না। না আনন্দ না দুঃখ।

দুই.

অন্যের মতো না হলেই কেবল একজন অনন্য। বেলী ফুল গোলাপের মতো হলে তার নাম আলাদা করে বেলী হতো না। মনীষীদের কথাও তাই, যেমনই হও, অন্যের মতো হয়ো না। ভিন্ন বলেই তিতা হয়েও করলার স্বাদগ্রহীতা আছে।

হুমায়ূন আহমেদ কথাটা বুঝেছিলেন। প্রথমত তিনি বাংলা সাহিত্যের তার আগে জন্ম নেওয়া আর কোনো লেখকের মতো নন। এজন্য যে ভয়াবহ যন্ত্রণায় ভুগতে হয়, এটাও তিনি মেনে নিয়েছিলেন। নিজেকে বদলাননি।

নিজের মতো হওয়ার সবচেয়ে বড় যাতনা হলো বারবার লোকে বলবে যে তুমি তো অমুকের মতো নও। হুমায়ূনকেও শুনতে হয়েছে তার লেখায় এটা নেই, ওটা নেই। ওরকমটা হলো না, সেরকম নয় এসব ইত্যাদি। মানিক, তারাশংকর, বিভূতি, বুদ্ধদেব এদের কারো মতো নও তো তুমি।

যদিও ভালো নিজেই তুলনামূলক শব্দ, যদিও সে ক্রমশ বদলায়, সমকাল তা বুঝতে চায় না। ওদের মতো ভালো লেখক না হয়ে হুমায়ূন আহমেদকে একজীবন কাটাতে হয়েছে।

বাকি জীবন এখন তার পাঠকের। তারা দেখে যাবে, যা হুমায়ূনও দেখেননি।

তিন.

হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন বলেই যে কথা সত্যি, এর চেয়ে বাজে যুক্তি আর নেই। বাজে যুক্তি বলার কারণ এই যে, অনেক বিষয়েই তিনি একেবারে উল্টো রকমের দুই কথা বলেছেন। এমনকি তার নিজের ব্যাপারেও হুমায়ূনের নিজের কথা যাচাই না করে গ্রহণ করাটা বোকামি হবে। পরস্পরবিরোধী কথা কম নেই তার। দুটো উদাহরণ উল্লেখ করছি।

প্রথমটি হলো, হুমায়ূন আহমেদ এক লেখায় উল্লেখ করছেন, ‘সত্যিকার অর্থে রবীন্দ্রনাথ প্রথম পড়ি আমি যখন ক্লাস সিক্সের ছাত্র। থাকি বান্দরবান। বাবা সেখানকার পুলিশ লাইব্রেরির জন্য বই কিনেছেন। বইগুলোর একটি হলো সঞ্চয়িতা, আরেকটি হলো গল্পগুচ্ছ। আমি গল্পগুচ্ছ কবজা করে ফেললাম ...। আমার পড়া রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্পের নাম ‘নিশীথে’। একটি ভূতের গল্প অথচ কোথাও ভূত নেই। আমি এখনো অবাক হয়ে ভাবি, ভূত ছাড়া ভূতের গল্প লেখার মতো ক্ষমতা আর কতজনের আছে!’ (বসন্ত বিলাপ, প্রথমা)।

কেউ কেউ হয়তো মনে করতে পারবেন, হুমায়ূন আহমেদ তার ‘আমার ছোলেবেলা’য় একটু অন্যরকম লিখেছেন, ‘...ষষ্ঠ শ্রেণীর একটি বালকের সেই লেখা পড়ে আমার সাহিত্যিক বাবা মুগ্ধ হয়ে গেলেন। শুধু মুগ্ধ নাÑ প্রায় অভিভূত হবার মতো অবস্থা। জলপ্রপাতবিষয়ক রচনার কারণে উপহার পেলামÑ রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ। গল্পগুচ্ছের প্রথম যে গল্পটি পড়ি তার নাম ‘মেঘ ও রৌদ্র্র’। পড়া শেষ করে অনেকক্ষণ কাঁদলাম। তারপর চোখ মুছে আবার গোড়া থেকে পড়া শুরু করলাম। আমার নেশা ধরে গেল।’ (আমার ছেলেবেলা)।

এবার দ্বিতীয়টির কথা বলি। মধ্যাহ্ন উপন্যাসের প্রথম খ-ের ভূমিকায় লিখলেন, ‘আমি লিখি নিজের খুশিতে।’

নাসির আলী মামুনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি এ রকম বলেছিলেন, নিজের আনন্দের জন্যে লিখি। অবশ্যই নিজের আনন্দের জন্য লেখেন তিনি। কিন্তু অন্য আরও কারণও থাকতে পারে। সেটা তুচ্ছও নয়।

মধ্যাহ্ন উপন্যাসের দ্বিতীয় খ-ে, বামফ্ল্যাপে লিখলেন, ‘ধন্যবাদ পাঠকদের, যারা আগ্রহ নিয়ে মধ্যাহ্ন প্রথম খ- পড়েছেন। তাদের আগ্রহের কারণেই দ্বিতীয় খ- লিখতে শুরু করেছিলাম।’

আমাদের মাঝে মাঝে মনে হয়, হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভালোভাবে যাকে দাঁড় করানো যায় তার নাম হুমায়ূন আহমেদ।

চার.

‘জীবন তার মঙ্গলময় হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করেছে জয়নালকে।’Ñ এ রকম অসংখ্য বাক্য হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন। সৌভাগ্য না লিখে, লেখা হয়েছে ‘জীবন মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে’। জীবনের যে দুখানা হাত আছে, সে যে মানুষেরই মতো, কখনো কখনো স্নেহশীল, দয়ালুÑ এ রকম ভঙ্গি হুমায়ূনের লেখায় লেখায় ছড়িয়ে আছে। পড়তে পড়তে অদ্ভুত লাগে। জীবনের হাত ধরে হাঁটছি যেন। যেন আমি আর আমার জীবন দুজন।

আর একটা প্রিয় বিষয় ছিল বৃক্ষ। ‘যশোহা বৃক্ষের দেশে’Ñ হুমায়ূন আহমেদের আমেরিকা ভ্রমণ নিয়ে লেখা। কোকা-কোলার দেশ আমেরিকাকে এক বিশেষ গাছের দেশ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, সহজ সরল কোনো কথা নয়।

গাছ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের বিশেষ আগ্রহ প্রথম থেকেই ছিল। ‘অন্যভুবন’ নামের উপন্যাসটায় মূলত মানুষদের গাছেদের মতো হয়ে যাওয়ার গল্প লেখা হয়েছে। লেখক মিসির আলীর বিয়ে দিয়ে ফেলেছিলেন এই উপন্যাসেই। যতদূর মনে পড়ছে, ‘অচিনবৃক্ষ’ নামে গাছকে ঘিরে তার একটা আশ্চর্য গল্প আছে।

‘বৃক্ষকথা’ নামে তার একটা আলাদা বইও আছে। ঔষধি গাছেদের নিয়ে। অন্যদিন পত্রিকায় যখন ছাপা হচ্ছিল তখন, একেকটা গাছের বিবরণ শেষে একটা করে গল্প জুড়ে দিচ্ছিলেন তিনি। গাছের কথা পড়ানোর জন্য গল্পগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছিলেন।

আর নুহাশপল্লী­ তো মূলত গাছেদের ভুবন। একা হতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ আসলে গাছেদের কাছাকাছি এসেছিলেন। শেষদিকে তিনি গাছেদের সাথে অনেক সময় কাটাতেন, তিনি গাছেদের সাথে কথাও বলতেন। বাংলা ভাষায় আর কোনো লেখককে কি পাওয়া যায় যিনি গাছের সাথে এরকম গভীর একাত্মতা অনুভব করেছেন?

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে