x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

‘সিরিয়াস সাহিত্য’ বনাম ‘হুমায়ূন আহমেদ’

  চন্দন আনোয়ার

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘সিরিয়াস সাহিত্য’ ও ‘জনপ্রিয় সাহিত্য’Ñ এ প্রসঙ্গ এবং একে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আজকের নয়, দীর্ঘকালের। জনপ্রিয় লেখকের বই বুঁদ হয়ে পড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ পাঠক। সংখ্যায় লঘিষ্ঠ সিরিয়াস পাঠক এ জনপ্রিয়তাকে আবার সুদৃষ্টিতে দেখে না। কারণ জনপ্রিয় সাহিত্য অর্থই মুখরোচক খাবারের মতো শিল্পমূল্যবর্জিত সাময়িক উন্মাদনা সৃষ্টিকারী বিশেষ কিছু, যা কালের নিষ্ঠুর প্রহারে টিকবে না। দুই বিপরীতমুখী শিবিরে বিভক্ত লেখক-পাঠক। তবে কালে কালে কিছু দুর্লভ প্রতিভার জন্ম হয়, এ বিভক্তি তার ক্ষেত্রে অর্থহীন হয়ে পড়ে। অনেক জনপ্রিয় লেখকের লেখা সিরিয়াস সাহিত্য হিসেবে পঠিত হয়, আবার অনেক সিরিয়াস লেখাও জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। অনেক সিরিয়াস সাহিত্য যেমন পাঠকের অভাবে হারিয়ে যায়, তেমনি আবার জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যের কালোত্তীর্ণ হওয়ার দৃষ্টান্তের অভাব নেই। কারণ একজন জনপ্রিয় সাহিত্যিক তার প্রজন্ম, সময়, সমাজটাকে খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করেন। তিনি জানেন ব্যক্তির ও সমাজের আন্তঃসম্পর্কের নানান গতিপ্রকৃতি। ফলে খুব সহজেই সমাদর পায় তার লেখা গল্প-উপন্যাস বা কবিতা-গান। সমকালীন চাহিদা, সময়, সমাজের ওপরে জাল ফেলে নিজের এমন একটি বাস্তব ও মায়াময় জগৎ তৈরি করেন একজন জনপ্রিয় লেখক, সেই জগতের মানুষের প্রেম, ভালোবাসা, ঘৃণা-বিদ্বেষ, লাভ-লোভ, গ্রহণ-বর্জন-প্রত্যাখ্যান, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির মধ্যে বাস্তব জগতের ব্যক্তিমানুষ আয়নার ছবির মতো নিজেকেই দেখতে পায়। আর তখন লেখকের সৃষ্ট জগৎ আর ব্যক্তি তার নিজের জগতের মধ্যে কোনো পার্থক্য খুঁজে পান না। এ কারণে একজন জনপ্রিয় লেখকের একটি বই একবার পড়লে বাকি জীবনের জন্য সেই লেখকের বই পড়া তার জন্য নেশার মতো হয়ে যায়। কারণ প্রতিটা লেখাতেই সে তখন নিজেকে খুঁজে ফেরে। এই খুঁজে ফেরার নেশা মানুষের চিরন্তন। তাই এক অর্থে, জনপ্রিয় লেখাও চিরন্ততাকেই ধারণ করে। বাংলাদেশের সাহিত্যে শুধু নয়, পশ্চিমবঙ্গসহ সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলাভাষী মানুষের কাছে ‘জনপ্রিয়’ শব্দটি নতুন একটি প্রশ্ন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশের সাহিত্যের স্মরণাতীতকালের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ অনেকটা অসময়েই মারা গেলেন।

এতটা শক্তি ও সামর্থ্য রাখেন যে লেখক, তার দেশ ও জাতির প্রাণের মানুষে পরিণত হয়েছেন যে লেখক, তিনি এবং তার লেখাকে কী করে সিরিয়াস সাহিত্য নয় বলে দূরে ঠেলি? নিজের কাছে সৎ থাকতে হলে স্বীকার করতেই হবে, সিরিয়াস বা ক্লাসিক সাহিত্য হচ্ছে না বলে মোটের ওপর হুমায়ূন আহমেদকে প্রত্যাখ্যান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অবহেলাই করে আসছে সিরিয়াস সাহিত্যের মুষ্টিমেয় লেখক, পাঠক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপকরা। সারা বছর যে লেখকের বই ১০০ জন পাঠকের কাছে যায় না বা পাঠক গ্রহণ করে না, আর যে লেখকের একটি বই-ই ২৫ লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছায়, এই দুই লেখকের তুলনা করা উচিত কি অনুচিত এ প্রশ্ন কার কাছে করা যায়? ভীষণ দ্বিধা আমার নিজেরই মধ্যে। সাহিত্য যদি মানুষের জন্য হয়, তবে মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষিতবোদ্ধার কাছে নয়, তৃণমূলের মানুষের কাছে, সব বয়সের, সব মত-পথের মানুষের কাছে লেখকের লেখাটি পৌঁছাতে হবে, মানুষকে পড়তে বাধ্য করতে হবে। একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখকের চিন্তাকে সর্বজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তার লেখা জনপ্রিয় হওয়ার বিকল্প নেই। তবে সেই জনপ্রিয় লেখাটি যেন একবার ব্যবহার্য বস্তুর মতো একবার পাঠেই শেষ না হয়। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তার চিন্তার টেকসই একটি ভিত তৈরি করে দিতে হবে, যেন মানবসমাজের বিবর্তনের ধারায় তার চিন্তাটি কাজে আসে।

হুমায়ূন আহমেদ শারীরিকভাবে মারা গেছেন, তার সৃষ্টিকর্মও একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, এখন জনপ্রিয়তার প্রশ্নটি মূল্যায়িত হবে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মূল্যায়ন তো আছেই, মৃত্যুর পর তিনদিনের ব্যবধানে তাৎক্ষণিক যে মূল্যায়ন হচ্ছে, দুই বাংলার শীর্ষ জনপ্রিয় ও সিরিয়াস লেখক, যেমন হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুশ শাকুর, শওকত আলী, সেলিনা হোসেন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ইমদাদুল হক মিলন, এভাবে নাম উচ্চারণ করলে প্রায় সকল খ্যাতিমান, স্বল্পখ্যাতিমান লেখকের নাম উচ্চারণ করা যাবে, তারা প্রত্যেকেই হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতাকে সামনে নিয়ে ঘাড় গুঁজে নির্বাকেই প্রায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, বাংলাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে গেছেন। নিজস্ব একটি ভুবন তৈরি করেছেন, সেই ভুবনের স্বাতন্ত্র্যই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। এঁদের অনেকেই এতকাল চোখ-কান-নিশ্বাস বন্ধ করে একবাক্যে বলে দিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদ সস্তা জনপ্রিয় লেখক, তার লেখা কোনো কিছুই হচ্ছে না। ঈশ্বরগুপ্তের মতো বিরাট বড় প্রতিভা যেমন ইয়ার্কিতেই ফুরিয়ে গেছে, তেমনি হুমায়ূন আহমেদ বিরাট বড় প্রতিভা ও সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাসাহিত্যে এসেছিলেন, কিন্তু সস্তা জনপ্রিয়তার অন্ধমোহে পড়ে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়েছে। তার লেখা বালক-তরুণদের পাঠ্য, সিরিয়াস পাঠকের পড়ার যোগ্য নয়। কোটি কোটি মানুষের জনরুচির কথা মাথায় নিয়ে লেখেন যে লেখক, তার লেখায় স্বভাবতই ধ্রুপদী সাহিত্যের উপাদান থাকার কথা নয়। অর্থাৎ হুমায়ূন আহমেদের প্রধান প্রতিপক্ষ তার অসম্ভব জনপ্রিয়তা।

কী গল্প-উপন্যাস, কী নাটক-চলচ্চিত্র, সব কিছুতেই তার নিজস্ব স্টাইল, অতি সাধারণ ভাষা ও সংলাপ, অতিসাধারণ মানুষের গল্প। আর এই অতিসাধারণই অসাধারণ হয়ে ধরা দেয়। তাই তার রচিত একটি নাটকের একটি চরিত্রের ফাঁসি রদ করার দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেই চরিত্রটিও আবার বখাটে ও মস্তান। তার উপন্যাসের কাল্পনিক চরিত্র হিমু বা মিছির আলি কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। হিমুকে ঘিরে তরুণ প্রজন্মের যে উন্মাদনা, নিজেকে হিমু ভাবার প্রবণতা, তার পেছনেও একটি যুক্তি আছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বেকার যুবক স্বপ্ন ভাঙা-গড়ার খেলার প্রতিচ্ছবি পায় আপাত দৃষ্টিতে উদ্ভট, কিন্তু অস্বাভাবিক নয়, এমন একটি কাল্পনিক চরিত্র হিমুর মধ্যে। এসব সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নের সময় এসেছে। ধীরে ধীরে মূল্যায়িত হবেই। যা টেকার তা টিকবে, যা টিকবার নয় তা হারিয়ে যাবে, মহাকালের এই অমোঘ বিধানের বাইরে নন হুমায়ূন আহমেদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে