x

সদ্যপ্রাপ্ত

  •  বিকালের মধ্যেই বিদ্যুৎ বৃদ্ধির ঘোষণা আসছে: বিইআরসি

বয়ঃসন্ধির পর

  লতিফ জোয়ার্দার

১০ নভেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেশ অনেক সময় ধরে অন্ধকারে তাকিয়ে আছি। নারকেলের চিরুপাতায় মৃদু হাওয়ার দোলা। খোলা জানালায় বিষণœ চোখ আমার। মাঝে মাঝে ধেইয়ে আসছে হাসনাহেনার তীব্র গন্ধ। কিছু জোনাকী অবলিলায় আমার ঘরে আসছে, আবার কখনো ফিরে যাচ্ছে তারা। এমন তো কতদিন হয়। কত অন্ধকার চোখের তারায় এলোমেলো হয়। কত বেদনার লিপি এসে সামনে দাঁড়ায়। আমি ঠিক বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে নিজেকে যেমন অচেনা মনে হয়। এই যে আলো আধারীর খেলা, কখনো আমার ভেতর বাহির একাকার করে দেয়। আমি যেন প্রজ্জ্বলিত মোমের আগুন হয়ে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকি। কেন যে এমন হয় আমার! এ প্রশ্নের উত্তর জানি না আমি। ত্রিশ বছর দীর্ঘসময় মনে হলেও। এখন আমার কাছে মনে হয় তার অভিমানগুলো ছিল ত্রিশ কোটি বছরের। আমি যতবার প্রার্থনায় নত হই। আমার সামনে কেবলমাত্র তাকেই দেখি। এ কারণে মাঝে মাঝে আমি বেশ শরমে থাকি। এ কারণে মাঝে মাঝে আমাকে লজ্জা পেতে হয়। আমার এবাদত, আমার কাছে ভুল মনে হয়। আমি চোখ মেলে তাকালেই কেবল তাকেই দেখি। আমি সুরা ভুলে যাই, মোনাজাত ভুলে যাই। প্রতিনিয়ত সেই নারী আমাকে অস্থির করে। একদিন যে আমার বুকের অধরে বসেছিল। যে মানবী আমার এবাদত ভুল করে দেয়। সেই প্রিয়তার জন্য আমার অন্তরআত্মা কেঁদে ওঠে। তার জন্য এক মায়াবী রাতের কাছে ছুটে যাই আমি। আমার ঈশ্বর আরাধনার ভিতর যে রমণী বসে থাকে।

তখন বয়ঃসন্ধি পার করেছি মাত্র। মাঝে মাঝেই সোনালি আবেগ এসে ভিড় করত। গ্রামের পথঘাট মাড়িয়ে একাকিত্ব নিয়ে ফিরে যাওয়া সূর্যটার দিকে কখনো একভাবে তাকিয়ে থাকতাম। কিছু সময় পরই সন্ধ্যা এসে ফিরে চলে যেত। রাত্রীকে মনে হতো যন্ত্রণার অবয়ব। এখানে সেখানে ছোপ-ছোপ অন্ধকার। বৃক্ষের ছায়াগুলো যেন ভূতের গলি। তার অল্প কিছুদিন পর, এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার পর নতুন একটা জগৎ দেখতে পেলাম আমি। গ্রাম থেকে শহরে প্রত্যাবর্তন আমার। এক কামড়ায় কয়েকজন মিলে-মিশে থাকি আমরা। আলোহীন স্যাঁতসে্যঁতে পলেস্তারা খসা একটা দ্বিতলা বাড়ির নিচতলাতে থাকি আমি। কলেজে অসংখ্য নতুন মুখের সঙ্গে দেখা হলো, পরিচয় হলো আমার। তাদের কেউ কেউ অল্প দিনেই বন্ধু হয়ে গেল। কবিতার সঙ্গে মিতালী ছিল বলে! যারা কেবলমাত্র কবিতার পাঠক, লেখালেখি পছন্দ করে তারাই বেশির ভাগ আমার বন্ধু তালিকায় যুক্ত হলো। সেই দুরন্ত সময়ে বড় বেশি আড্ডাবাজ হয়ে যেতে থাকলাম আমি। এ শহরের ওলিগলিগুলো চষে বেড়াতাম। সেই বয়সেই সাহিত্য পত্রিকা করার জন্য ব্যাকুল হলাম। অথচ তখনো লিটলম্যাগ কী বুঝিনি। পত্রিকা প্রকাশ করার জন্য, টাকা পয়সার যোগান হবে কিভাবে জানি না। নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন জনতা ব্যাংকে একশত টাকার একটা ডিপিএস করেছিলাম। সেদিকে চোখ পড়লো আমার। কারণ যেভাবেই হোক না! পত্রিকা তো প্রকাশ করতেই হবে।

পত্রিকার নাম নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয়নি। আমার বাড়ির সামনেই মরা কমলা নদী। মায়ের মুখ থেকে এ নদীর অনেক গল্প শুনেছি। একসময় যৌবন ছিল কমলার। থৈ-থৈ জলে নেচে বেড়াতো সে। কমলার সঙ্গে একাকী কতদিন কত কথা হতো আমার। এত এত কথা হতো আমাদের, তারপরও আমাদের কথা শেষ হতো না। একসময় জমিদারদের নৌকার বহর যেত তার বুক চিরে। এই নদীতেই একদিন পাট বোঝাই নৌকা, ধান বোঝাই নৌকা বন্দরের দিকে ছুটে যেত। সেই কমলার নামে আমার সম্পাদনায় সাহিত্য পত্রিকার যাত্রা শুরু হলো। তখন দিনে দিনে আমার বন্ধু সংখ্যা বাড়তে থাকলো। সাংস্কৃতিক চর্চা করি বলে কলেজের প্রায় সবাই আমাকে চিনতো। কত উচ্ছল দিন ছিল আমার। আর সেই সময় হঠাৎ করেই একদিন পরিচয় হয়েছিল বীথির সঙ্গে। কলেজের বাড়ান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের কথা হয়েছিল। বীথির এক বান্ধবী পড়তো আমার সঙ্গে। তার মাধ্যমেই আমাদের পরিচয়। বীথি পড়তো অন্য আরেক কলেজে। একদিন হঠাৎ করেই আমাদের কলেজে এসেছিল তার বান্ধবীর খোঁজে। একসঙ্গে ক্লাসে বসেছিল। প্রথম দেখাতেই চোখ ফেরাতে পারিনি আমি। এক অদ্ভুত সুন্দরের দিকে চেয়ে চেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম সেদিন।

পথ থেকে পথে, হৃদয়ের অব্যক্ত কথামালা গুলো যখন ফেরি করে বেড়াই আমি। তখন পিছনের অনেক স্মৃতির জঞ্জাল এসে ভিড় করে। তারপরও ছুটে চলি! মাঝে মাে ঝ নিজেকে প্রশ্ন করি, আমার গন্তব্য কোথায়? আবার কখনো মনে হয়, আমি তো কোনো এক সুদূরের পথযাত্রী। জন্মের পর থেকেই ছুটে চলেছি মৃত্যুর কাছে। তার রূপ আমি দেখেনি। তার অনেক গল্প শুনেছি। সেই মৃত্যুই আমাকে একদিন বিভাজনের সাগরে ভাসবে। সব মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে আমি আবার ফিরে যাব অন্ধকারে। হয়তো যে ভাবনা উদয় হয় আমার মনে, সে ভাবনার কোনো উত্তর নেই আমার কাছে। আমার কেবলি মনে হয়, আমি তো একদিন ছিলাম না। মনে হয় এই পৃথিবীর রূপ আমি দেখিনি। হয়তো আবার থাকবো না আমি। হয়তো আবার হারিয়ে যাব। নয়তো আবার ফিরে যাব। এই যে আমার থাকা, না থাকার দিনগুলির কোলাহল। আমার অব্যক্ত মনের ব্যঞ্জনা। সুরের জীবন থেকে সুরহীন নৈঃশব্দের দিনগুলিতে, তোমাকেই চাইবো আমি। তোমাকেই খুঁজবো আমি। আমার এ সকল কথামালাগুলো আমার কাছেই ফিরে এলো যেন। আমি চোখ তুলে তাকিয়ে তাকে আর দেখতে পেলাম না। আমার সামনে থেকে কখন যে চলে গেছে সে, কিছুই বুঝতে পারিনি আমি। অতঃপর আমার বুকের ভিতর অসীম শূন্যতা। নীলগিরির সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছি আমি।

যদিও তারপর আমাদের আর দেখা হয়নি। বীথির খালার বাসা ছিল কাচারী পাড়ায়। সেখানে গিয়ে দেখি নতুন ভাড়াটিয়া উঠেছে। বীথি আর এই শহরে থাকে না। তার খালাও ছিল এই শহরে নতুন অতিথি। হয়তো চাকুরির সুবাদে নতুন কোনো শহরে অতিথি হয়েছে আবার। বীথি ফিরে গেছে তার বাবা-মায়ের কাছে। একদিন যার বসবাস ছিল এই বুকে। অথচ একদিন তাকেই হারিয়ে ফেললাম আমি। তখন কেবলি আমার মনে হতো তার সঙ্গে আর দেখা না হলে! আমি হাতের মুঠোয় মৃত্যুকে নিয়ে আসতে পারি। পৃথিবীর সব মায়ার বন্ধন ছিন্ন করতে পারি। ছিন্নপত্রের মতো হারিয়ে যেতে পারি। সব আয়োজন করে গভীর রাত্রীতে আমি একদিন আকাশের নক্ষত্র হতে চাইলাম। অতঃপর গভীর ঘুম। আমার মনে হলো, এ ঘুম হয়তো আর কোনোদিন ভাঙবে না। আমি আর কোনোদিন জাগবো না। এই মাটিতে আর কোনোদিন আমার পায়ের স্পর্শ পড়বে না। কিন্তু কীভাবে যেন সে যাত্রায় আমার ঘুম ভাঙলো। আমি ভারী চোখের দৃষ্টি দিয়ে আমার মাকে দেখতে পেলাম। মায়ের চোখে তখন অবিরত জলের ধারা।

অতঃপর কত কত দিন চলে গেছে। এতদিনে তার কথা, সেভাবে আর মনে হয়নি আমার। প্রথম উষ্ণতার কথা। প্রথম ভালো লাগার কথা। প্রথম কাছে আসার কথা। প্রথম মুগ্ধ হওয়ার কথা। প্রথম কোনো নারীর জন্য হাতের তালুতে হৃদ-স্পন্দন নিয়ে আসার কথা। সেই কতদিন আগের কথা। বয়ঃসন্ধিক্ষণ পেরিয়ে প্রথম যৌবনের কথা। সে এখন কোথায় আছে! কেমন আছে কিছুই জানি না আমি। কিছুই মনে করতে চাই না আমি। গভীর রাত্রী তখন। চোখে একটুও ঘুম নেই আমার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প পড়তে পড়তে চোখের কান্তি এলো। মনে হলো ঘুমের আয়োজনের আগে একবার ফেসবুকে ঢু মেরে আসি। নতুন তিনটি ফেন্ড রিকুয়েস্ট এসেছে আজ। আমি তাদের ভালো করে দেখে নিলাম। একজনকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হলো আমার। তার ফেসবুক প্রফাইলে প্রবেশ করে চমকে উঠি আমি। সেই বীথি! আমার প্রথম যৌবন যার কাছে পড়ে আছে আজও। সে নতুন করে আজ আবার আমার বন্ধু হতে চায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে