রো কে য়া সা খা ও য়া ৎ হো সে ন

জাগরণে উদ্যমী এক নারী

  গোলাম কিবরিয়া পিনু

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন জন্মেছিলেন ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে, এক জমিদার পরিবারে। আনুমানিক ১৬ বছর বয়সে বিহারের অধিবাসী বিপতœীক ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সঙ্গে রোকেয়ার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তার নাম হয় রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন। তবে তিনি বেগম রোকেয়া নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯০৯ সালের ৩ মে সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেন মারা যান। আর রোকেয়া মারা যান ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে।

রোকেয়ার বাবার নাম জহীর মোহাম্মদ আবু আলী সাবের। তিনি মেয়েদের বাংলা শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। রোকেয়ার বড় বোন করিমুন্নেসা আর বড় ভাই ইব্রাহিম সাহেবের সহযোগিতায় বাংলা ও ইংরেজি শেখার সুযোগ পান রোকেয়া। এ ছাড়া আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষাও জানা ছিল তার। শৈশব থেকেই কঠোর পর্দাব্যবস্থায় বড় হয়েছেন তিনি। ব্রাহ্ম অথবা পাশ্চাত্য প্রভাবিত হিন্দু পরিবারে দু-চারটে ব্যতিক্রম হলেও মুসলমান পরিবারের কোনো মেয়ের পক্ষে তখন পর্দাপ্রথা ভেঙে বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না তেমন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ কখনো পাননি তিনি। রোকেয়া স্বগঠিত এবং স্বশিক্ষিত মানুষ। এর পেছনে ছিল তার ব্যাপক অধ্যয়ন ও আগ্রহ।

লেখক হিসেবে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন, সংগঠক হিসেবে রোকেয়া স্কুল প্রতিষ্ঠা, নারীর কল্যাণে সংগঠন প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছিলেন। বাঙালি, বাঙালি-মুসলমান, নারী শিক্ষা, নারী জাগরণ তার কর্মকা-ের মূল ভূমি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

রোকেয়ার জীবনে স্বামী সাখাওয়াৎ হোসেনের প্রভাব ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার সাহচর্যে এসেই রোকেয়ার জ্ঞানচর্চার পরিধি বিস্তৃত হয়। উদার ও মুক্তমনের অধিকারী স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় রোকেয়া দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন এবং ক্রমেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তার সাহিত্যচর্চার সূত্রপাতও ঘটে স্বামীর অনুপ্রেরণায়। তবে রোকেয়ার বিবাহিত জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রোকেয়ার গর্ভে দুটি কন্যা জন্মগ্রহণ করে এবং তারা অল্পবয়সেই মৃত্যুবরণ করে।

মৃত্যুর সময় সাখাওয়াতের সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ছিল ৭০ হাজার টাকা। স্বামীর মৃত্যুর পাঁচ মাস পর মাত্র পাঁচটি ছাত্রী নিয়ে রোকেয়া ভাগলপুরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের সূচনা করেন। কিন্তু সাখাওয়াতের পূর্বপক্ষীয় কন্যা এবং সেই কন্যার স্বামীর পীড়নে অল্পকালের মধ্যে তিনি ভাগলপুর ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের প্রথম উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। তবে বাধা পেলেও নিরুৎসাহ হননি তিনি। কলকাতায় গিয়ে এক বছর পাঁচ মাস পর, ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ তিনি আরেকটি বিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন করেন। স্কুলটির নাম ছিলÑ ‘সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। রোকেয়ার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯১৭ সালে এই স্কুল মধ্য গার্লস স্কুলে রূপান্তরিত হয়, পরবর্তী সময়ে ১৯৩১ সালে উচ্চ ইংরেজি গার্লস স্কুলে পরিণত হয়। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন কারণে এবং ছাত্রীসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে স্কুলটি কলকাতার নানা স্থানে স্থানান্তরিত করতে হয়।

সাখাওয়াৎ মোমোরিয়াল স্কুলে তফসিরসহ কোরআন পাঠ থেকে আরম্ভ করে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি, হোম নার্সিং, ফাস্ট এইড, রান্না, সেলাই, শরীরচর্চা, সংগীত প্রভৃতি সব বিষয়ই শিক্ষা দেওয়া হতো। স্কুল পরিচালনা ও পাঠদান অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বেগম রোকেয়া বিভিন্ন বালিকা স্কুল পরিদর্শন করতেন। পর্যবেক্ষণ করতেন সেসব স্কুলের পাঠদান পদ্ধতিও। কলকাতায় উপযুক্ত শিক্ষয়িত্রী নিয়ে আসেন তার স্কুলে। শিক্ষার ক্ষেত্রে রোকেয়ার নিবেদিত হওয়ার আরও ভূমিকা লক্ষ করা যায়, তার মধ্যে এমনি সচেতনতা ছিলÑ শিক্ষা ব্যতীত নারী, বিশেষ করে মুসলিম নারীর বিভিন্ন পর্যায়ে মুক্তি সম্ভব নয়। শিক্ষা বিস্তারে রোকেয়ার ভূমিকা সেইকালের নিরিখে শুধু তাৎপর্যই ছিল না, ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সাহসী আর উদ্যমী এক নারীর জীবন-সংগ্রামের গৌরবময় ভূমিকা।

রোকেয়া বাংলা ও নিখিল ভারত পর্যায়ে এক সংগ্রামী ও দৃঢ় সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করেন। নারী সমাজের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, কর্তব্যপরায়ণতা, দক্ষ নেতৃত্বের গুণাবলি সৃষ্টি এবং সমাজ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯১৬ সালে তিনি ‘আঞ্জমানে খাওয়াতীনে ইসলাম’ (মুসলমান মহিলা সমিতি) প্রতিষ্ঠা করেন। এটিই মুসলিম মহিলাদের কল্যাণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রথম সংগঠন। নারীদের সংগঠিত করার জন্য তিনি বিভিন্ন সংস্থার সদস্য ছিলেন। এসব সংগঠনের মধ্য দিয়ে রোকেয়ার সংগঠক জীবনের পরিচয় আমরা পাই। নারীর বিভিন্নমুখী সমস্যা সমাধানে সংগঠিত প্রয়াস প্রয়োজন বলেই তিনি তার প্রজ্ঞা সাংগঠনিভাবে কাজে লাগিয়েছেন। সমাজসংস্কারের জন্য নারীদের সংগঠন ও সাংগঠনিক কর্মকা- বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, এ অন্তর্দৃষ্টি তিনি অর্জন করেছিলেন সেই পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজে অবস্থান করেও, পরবর্তী সময়ে মুসলিম-নারী আন্দোলনে তার ভূমিকা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোকেয়ার সবচেয়ে বড় এক পরিচিতি তিনি নারী আন্দোলনের কর্মী। আপন অবস্থা ও চারপাশের অবস্থা উপলব্ধি করেছিলেন। তার মতে, উড়তে শেখার আগেই পিঞ্জরাবদ্ধ নারীদের ডানা কেটে দেওয়া হয়। এবং তারপর সামাজিক রীতিনীতির জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয় তাদের।

লেখক হিসেবে বিবাহের পরই রোকেয়ার আত্মপ্রকাশ। যতদূর জানা যায় নবনূর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধটি তার প্রথম মুদ্রিত রচনা (মাঘ, ১৩১০)। এটি প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে। মতান্তরে, তার প্রথম লেখা ‘পিপাসা’ (মহরম) প্রকাশিত হয় ইংরেজি ১৯০২ সালে, চৈত্র ও বৈশাখ ১৩০৮-১৩০৯ (যুগ্মসংখ্যা) নবপ্রভা পত্রিকায়। সমকালীন সাময়িকপত্রে মিসেস আরএস হোসেন নামে তার রচনা প্রকাশিত হতো। ভাগলপুরে বসেই রোকেয়া লেখেন তার একমাত্র ইংরেজি রচনা ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস, ১৯০৫ সালে। গ্রন্থাকারে এটি প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালে। ১৯০৫ সালে মতিচুর প্রথম খ- আত্মপ্রকাশ করে। রোকেয়ার সাহিত্যসাধনার সময় তিন দশক : ১৯০৩-৩২। অর্থাৎ তার ২৩ বছর বয়সে প্রথম আত্মপ্রকাশ (‘নিরীহ বাঙালী’। নবনূর, মাঘ ১৩১০) থেকে মৃত্যুর আগের রাত্রি পর্যন্ত (‘নারীর অধিকার’। মাহে-নও মাঘ ১৩৬৪)। নবনূরে তার গদ্য-পদ্য প্রচুর প্রকাশিত হয়। নবনূর, সওগাত, মোহাম্মদী, নবপ্রভা, মহিলা, ভারতমহিলা, আর-এসলাম, নওরাজ, মাহে নও, বঙ্গীয় মুসলামন সাহিত্য পত্রিকা, ঞযব সঁংধষসধহ, ওহফরধহ খধফরবং সধমধুরহব প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন।

তিন দশকের সাহিত্যসাধনায় রোকেয়ার রচনা কম নয়। তিনি লিখেছেনÑ ছোটগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও শ্নেষাত্মক রচনা, অনুবাদও করেছেন। তার জীবদ্দশাতেই প্রকাশিত হয় পাঁচটি গ্রন্থ : মতিচুর (১ম খ- ১৯০৪, ২য় খ- ১৯২২), ঝঁষঃধহধ’ং উৎবধস (নকশাধর্মী রচনা, ১৯০৮) পদ্মরাগ (উপন্যাস, ১৯২৪), অবরোধবাসিনী (নকশাধর্মী গদ্যগ্রন্থ, ১৯৩১)।

স্বামীর অকালমৃত্যু, স্কুল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার ফলে রোকেয়ার সাহিত্যজীবন কিছুটা বিঘিœত হয়েছে; কিন্তু তাকে দমিত হতে দেখা যায়নি, বরং পরবর্তীতে রোকেয়াকে অনেকখানি সাহিত্যনিমগ্ন হতে দেখা যায়। স্কুলের শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও সাহিত্যচর্চা ছাড়েননি তিনি কখনো।

পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত কিন্তু ‘পুস্তাকাকারে-অপ্রকাশিত’ রোকেয়ার ১৬টি বিভিন্ন ধরনের ‘প্রবন্ধ’, সাতটি কবিতা এবং ‘ছোটগল্প ও রস রচনা’ শিরোনামে ছয়টি বিচিত্র রচনাও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রোকেয়া রচনাবলিতে স্থান পেয়েছে। মতিচুর, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী, সুলতানার স্বপ্ন প্রভৃতি গ্রন্থে রোকেয়ার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বপ্নের বিভিন্ন দিক উন্মোচিত হয়েছে। এসব লেখায় নারীর স্বাতন্ত্র্য ও বহুমুখী ভূমিকানির্ভর জীবনের রূপরেখা তিনি প্রকাশ করেছেন। প্রচলিত সামাজিক অবস্থানে নারীর বন্দিত্ব ও অসহায়ত্ব এসব লেখায় যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি নারীর স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বের প্রকাশও ঘটেছে। রোকেয়ার লেখা সপ্রাণতা ও সজীবতা নিয়েও উজ্জ্বল।

উনিশ ও বিশ শতকের প্রথমে যেসব নারী লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের মধ্যে রোকেয়া ছিলেন গভীরভাবে সমাজসচেতন ও যুক্তিবাদী, অন্যদিকে সমাজ পরিবর্তনে একনিষ্ঠ সংগঠক হিসেবে ছিলেন উজ্জ্বল পথিকৃত। সমাজ-সাহিত্য-নারী বিষয়ে এগিয়ে থাকা একজন মানুষ হিসেবে তার উত্তর প্রজন্মের নারীরা তার কাছ থেকে পেয়ে আসছেন অনুপ্রেরণা ও সংগ্রাম-অধিকার-জাগরণের প্রেষণা, যা এখনো এক প্রধান উৎসমূল।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে