নাসির আহমেদের কবিতা

শিল্পবোধ ও সময়চেতনা

  সোহরাব পাশা

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনপরবর্তী বাংলাদেশে যে স্বল্পসংখ্যক প্রতিভাবান কবি মেধা ও তারুণ্য দিয়ে বাংলা কবিতার মূলধারা আরও বেগবান ও সম্প্রসারিত করেছেন, নাসির আহমেদ তাদের মধ্যে অন্যতম। কবিতা, নাটক, কাব্যগীতি, শিশুসাহিত্য, সাংবাদিকতা, কলাম-রচনা, সাহিত্য সম্পাদনা ইত্যকার বহুমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন ও কৃতীবৈচিত্র্যে ঋদ্ধ এক পাটাতন নির্মাণ করেছেন তিনি। তবে সৃষ্টিকলায় বহুমাত্রিক বিচরণ সত্ত্বেও শেষ বিচারে কবি হিসেবেই তিনি বিশিষ্ট। নাসির আহমেদ সমকালীন কবিতায় বিশিষ্টতায় উজ্জ্বল। তার কবিতায় একদিকে যেমন নগরজীবনের দ্বন্দ্ব, সংক্ষোভ, জটিলতা, যন্ত্রণা, বৈদগ্ধ ও কোলাহল অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে আবহমান গ্রামবাংলার লোকজ ঐতিহ্য ও চালচিত্র বিশ্বস্ত দলিলরূপে উপস্থাপিত হয়েছে।

মূলত রোমান্টিক কবি নাসির আহমেদ। তার আবেগ ও সংবেদন তিনি শৈল্পিক সংযমে পরিশীলিত রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন।

প্রেম ও নারী নাসির আহমেদের কবিতায় ব্যাপক এলাকাজুড়ে আছে। বিরহের মাধুর্য তার কবিতায় অন্যরকম সৌরভ ছড়ায়। একটু নিদর্শন : ‘তাকিয়ে আছো আমার দিকে তুমি/আমিও কিন্তু মুগ্ধ অপলক/ভাঙছে বুকে বৈঠা ছলাৎ ছলাৎ/চোখের ভিতর উড়ছে শাদা বক’। (তোমার জন্য অনিন্দিতা)। নাসির আহমেদ প্রকৃতিপ্রেমিক কবি। প্রকৃতি ও পরিবেশচেতনা তার অনেক কবিতায় উপস্থাপিত হয়েছে। একটি দৃষ্টান্ত : ‘বহুদূর থেকে আজ এসেছি এখানে এই জোনাক বাগানে/দীর্ঘ ধুধু পথে সুরকি-কাঁকরে/বিক্ষত পায়ের চিহ্নে পথের দূরত্ব লেখা আছে/ছায়াহীন রৌদ্রের থাবায় পোড়া ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে/এতদিনে এসেছি তোমার কাছে/ও অরণ্য! জ্যোৎস্নাস্নাত রাত্রির প্রতিমা/রাশি রাশি পাতার মখমলে আমাকে আবৃত করো/পোড়া পিঠে মেখে দাও মমতার সবুজ ভেষজ/ধুয়ে যাক দীর্ঘশ্বাসগুলো’/ (বৃক্ষমঙ্গল-১/বৃক্ষমঙ্গল)।

আধুনিক মানুষের ট্র্যাজেডি এই, অনিবার্য নিয়তি তার একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতাবোধ। বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতাবোধের অকরুণ তাপে দগ্ধ ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট আধুনিক মন। এই নৈঃসঙ্গবোধের নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ ঘটে চলে কবির অন্তর্গত সত্তায়। নিঃসঙ্গতাও বেদনার হলাহল পান করে কবি হয়ে ওঠেন নীলকণ্ঠ।

আমাদের রাষ্ট্রজাতির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ প্রধানতম ঘটনা। শৃঙ্খল মুক্তির জন্য একটি জাতির রক্তক্ষয়ী জীবনপথ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা ও তার গৌরবময় ঐতিহ্য তার কবিতায় স্বাক্ষরিত ‘মৃত্যুকে লঙ্ঘন করে যারা এই নশ্বর জগতে/স্বপ্নকেই আলিঙ্গন করে, তারা পারে ছিঁড়ে আনতে অতল দীঘির সেই/লাল পদ্ম এবং দৈত্যের পাহারা থেকে/জীবনের একমাত্র প্রিয় স্বাধীনতা’ এনে দিয়েছে। (মা বলতেন/আমি স্বপ্ন তুমি রাত্রি)

নাসির আহমেদ সমকালসচেতন কবি। সময়চেতনা তার কবিতার এক উল্লেখযোগ্য দিক : ‘ঘৃণা আমার চেতনার শান্ত জলাশয়ে ছেড়ে দিয়েছে বিষধর সাপ’। নষ্ট সময় আর সময়যন্ত্রণার অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছে তার কবিতা। তবে অবিশ্বাসী সময়ের সংকটে আক্রান্ত হয়েও কখনো হতাশায় মুষড়ে পড়েন না তিনি। অন্ধকার সময় জয় করে আলোকিত উদয়ের পথে প্রত্যাশার হাত বাড়িয়ে দেন। কবি বলেন : ‘সূর্যসেনের উত্তরাধিকারী আমি। সালাম ও বরকতের বংশধর/আমি যুদ্ধজয়ী বীরের সন্তান। দাঁড়াও আমার পক্ষে/হে স্বদেশ, হে নগর!/এসো হত্যা করি সর্বগ্রাসী এই অন্ধকার।.....’ (বিধ্বস্ত শহর ছেড়ে যেতে যেতে/ বি.শ. ছেড়ে যেতে যেতে)

মৃত্যু মানবজীবনের এক অনিবার্য নিয়তি। জীবনের বহুতল স্পর্শ করতে করতে কবি নাসির আহমেদ মৃত্যুবোধে প্রবলভাবে তাড়িত হন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে এসেছেন এ কবি। তাই মৃত্যুচেতনা তার কবিতার এক প্রধান অনুষঙ্গ। মৃত্যু এক ধ্রুব সত্য বলে কবির কাছে প্রতিভাত হয় : ‘তবু যেতে হবে নির্জনতার মতো নিঃশব্দ নির্মল সাদা জুঁইয়ের সন্ধানে/পথ বহুদূরে, যেতে হবে বেলাবেলি, সীমিত সময়/এই বেলা স্তব্ধতাকে চাই, যেন নির্বাক সত্যকে আঁকড়ে ধরি/যেহেতু জেনেছি যেতে হবে একান্তে, নিঃসঙ্গ যেতে হবে।’

শিল্প ও সাহিত্যের জগতে কালের ঐতিহ্য ও ঐশ্বর্য নিথের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। নাসির আহমেদ তার কবিতায় বিভিন্ন অনুষঙ্গে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মিথকে সফলভাবে প্রয়োগ করেছেন। উদাহরণ (ক) ‘লালনের মরমী গানের মতো কেঁদে ওঠে সেই কবেকার পাখির ছানা খোঁজা ভর দুপুরের বুনো ছন্দ.....’/ (খ) ‘অন্যেরা পায় বন্যেরা পায় তোমাকে আফ্রোদিতি!’ (গ) ‘তবে কি আমার গ্রিক-নিয়তি/আমিও কোন দুঃখী ঈদিপাস?’ ইত্যাদি এবং আরও অনেক। নাসির আহমেদ ছন্দনিষ্ঠাবান কবি। বাংলা কবিতায় প্রচলিত প্রায় সব ছন্দেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। উপমা, রূপক, প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণে তিনি অনায়াস দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে