রকিবুলের ডায়েরির যেটুকু আমি পড়েছিলাম

  ইফতেখার মাহমুদ

০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আর ম্যারেজ ডে বলে একটা বিশেষ দিনের কথা চালু ছিল বাড়িতে। বাবার মৃত্যুর পর সেই দিনটা হলো আরেকটা দুঃখের দিন। ঈদের দিন যেমন বিশেষ করে মনে পড়ত বাবাকে, তেমনি এই দিনটাও। মার মুখটা ভার হয়ে থাকত। আমরাও কিছু একটা বিষণœতার মতো অনুভব করতাম।

আচ্ছা, বাবা মারা গেলে কি মায়ের জন্য কোনো ওয়েডিং অ্যানিভারসারি থাকে? তাদের বিয়ে তো ভেঙে যায়নি। অবশ্য জোড়া ভেঙে গেছে। পার্টনার আউট হয়ে গেছে। জোড়াভাঙা পাখি কি যোগ অঙ্কে কাজে লাগে না?

আস্তে আস্তে এসব দিন ছাড়া দিনের বেলা বাবাকে মনে করার কথা ভুলে যেতে থাকলাম। না, কথাটা ঠিক হলো না বোধহয়। মাঝেমধ্যে বাবা চলে আসতেন আমাদের জীবনে।

বড় আপার অপারেশনের সময় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম।

আপার ছেলেমেয়েরা, মেয়ের জামাই, নাতি-নাতনি সবাই দাঁড়িয়ে আছে আপাকে ঘিরে। ওটিতে নেবে আপাকে। ওই মুহূর্তে আপা হাউমাউ করে ওঠেÑ ‘বাবা, বাবাগো, দেখে যাও, তোমার টুনিকে এরা কই নিয়ে যায়Ñ ও বাবা, কোথায় গেলা তুমি? ও আমার বাবাগো? Ñ

আপার বিলাপ থামে না। যেহেতু দূরত্ব ক্ষীণ করে দেয় সবকিছুকেই। আপার কথারাও দূরে যেতে যেতে ক্রমেই মলিন হয়ে ওটির ভেতর ঢুকে যায়।

বাবার কথা তখন শক্ত করে মনে পড়েছিল সবার। আমাদের সব ভাইবোনের কাছে অসুখের সময় একমাত্র সুখের নাম বাবা। জ্বর হলে এখনো আমার বাবাকে মনে পড়ে।

আমি বাবার কথা খুব একটা কাউকে বলি না। বোনদের সঙ্গেও না। শীতের ভোররাতে নামাজের জন্য বাবা যখন উঠতেন, আমার ঘরে আসতেন একবার করে। মশারিটা সরিয়ে আমার কপালে হাত রেখে বলতেনÑ ‘রকিবুল, ঘুম হয়নি বাবা? রাতে যে কাশি হচ্ছিল, সিগারেট খাস না বাবা!, সিগারেট খাস না বাবা!’

আমার ইচ্ছে হতো বলি, এত বড় ছেলের বাবারা আর এসব কথা বলে না। আমি কিছু বলতাম না। কিন্তু ঘুমের ভান করতে করতে ঘুমিয়ে পড়তাম। বাবা চলে যেতেন।

তার কি মনে হতো আমি বড় হইনি?

তার কি আসলেই মনে থাকে না যে, আমার একবার বিয়ে হয়েছিল। সংসার ছিল। আমার যমজ ছেলেমেয়েরা আমাকে বাব্বা বলে ডাকত। বাবা কি আসলেই জানে না, জেসমিনের আরেকটা বিয়ে হয়েছে। বাচ্চারাও বড় হচ্ছে। লন্ডনে যে বাড়িতে ওরা থাকে, তার রঙ লাল। অনেক ফুলে ভরা রঙিন বাগান আছে ওদের। জেমির ছোট্ট একটা সাইকেল আছে। ছবিতে দেখেছি আমি।

বাবার কেন মনে থাকে না, আমি তার সন্তান হলেও আমার সন্তানদের বাবা। দুজন বাবা, বাবা হিসেবে পরস্পর সহকর্মীর মতো। আমি কিছু বলিনি কোনোদিন। বাবা কেন বুঝত না সে কথা। নাকি আসলে বাবারা কোনোদিন ছেলে-বাবার কলিগ হয় না? কে জানে।

যে কথা বলার জন্য এত কথা লিখে ফেললাম।

কিছুদিন থেকে দেখছি, আমার চেহারাটা বাবার মতো হয়ে যাচ্ছে। আমি শেভ করা বন্ধ করার পর মিলটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আয়নায় দাঁড়ালে মনে হয়, বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন। মাঝেমধ্যে অদ্ভুত একটা ইচ্ছে হয় আমার। বাবা যদি আয়না থেকে কিছু আমাকে বলত। বাবা কি জানে আমি কান পেতে থাকি? আমার মনে হয়, আমি ভালো করে কান পাতলে ঠিকই একদিন শুনতে পাব।

কিংবা একদিন ভোরে যদি বাবা এসে বলেÑ ‘কাশিটা তো কমতেছে না রকিবুল। বাবা, সিগারেট খাওয়া কমা’,Ñ আমি ঠিক করে রেখেছি বলবÑ ‘বাবা আমি ষোলো বছর হলো সিগারেট খাই না। ষোলো বছর, বুঝেছেন? আর, কাল রাতে একটু বাতাস ছিল। বাসের জানালায় বসেছি, ঠা-ার জন্য এই কাশি। শুধু শুধু চিন্তা করাটা আপনার অভ্যেস?

বাবাকে তো আমি তুমি করে বলতাম, নাকি আপনি করে? একবার মনে হচ্ছে, আপনি করে বলতাম। আরেকবার মনে হচ্ছে তুমি করে।

আমি ভোরবেলায় জেগে উঠি। শুয়েই থাকি। একের পর এক বাবার কথা মনে আসে। আসুক, আমি বাধা দিই না।

একবার বোমবাস্টিং খেলার সময় বাবলাগাছের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমি পড়ে গেছি, মাথা ঘুরে বোধহয় অজ্ঞান হয়ে গেছি। সেই সময় বাবা বাড়িতেই ছিল। আমাকে কোলে করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল বাবাই। আমি তখন ফোরে পড়ি। চোখ খুলে দেখি আমি বাবার কোলে। কী যে লজ্জা লাগছিল। আশপাশে সবাই ছিল। পরে ওরা কী বলবেÑ তা ভেবেই আমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। নেমেও যেতে পারছিলাম না। বাবা শক্ত করে আমাকে ধরে ছিল।

ইদানীং আমার ফাঁকা ফাঁকা লাগে। কেউই আমাকে ধরে নেই। মনে হয়, খালি পড়ে পড়ে যাচ্ছি যেন। তবু আমি পড়ে যাই না। ভোরবেলা করে জেগে উঠি ঠিকই। কিছুই তবু ঘটে না, কেউ আসে না। জানি, কেউই আসবে না। তবুও আমি অপেক্ষা করি।

Ñরকিবুল হাসান। পীরগঞ্জ, রংপুর। ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
  • নির্বাচিত

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে