বৈশাখ ও হালখাতা

  শ হী দ ই ক বা ল

১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্মৃতিটা সরব হয়, যখন ‘হালখাতা’র চিত্রকল্প চোখের সামনে ভাসে। বৈশাখ আর হালখাতা পরিপূরক। এ নিয়ে বছর ঘুরে নানারকম লেখালেখি হয়। পেছনে ফিরেও যান অনেকে। অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলান। নতুনদের জানান, কীভাবে পাড়ায়-মহল্লায় একসময় কেটেছে হালখাতার ওসব দিন। তখন বছরান্তে আয়-ব্যয়ের হিসাব শেষ করে, দোকানি পাশের কোনো আটপৌরে ঘরে মিষ্টান্ন ভোজের সুযোগ করে দেন। এ মিষ্টি খাওয়ানোটা দোকানির অশেষ আনন্দ। তার বাকি পরিশোধ হয়েছে। বছরের হিসাব আজ শেষ। তাই তার এ আনন্দমাখা ভোজ। ভোজের পর বেরিয়ে শলাপরামর্শও চলে। পরিশোধকারী বলেন, হালখাতা করলাম। একে অন্যের সঙ্গে দেখা, চোখ ফেলা ও কুশল বিনিময় করা। তবে এর সময়সীমা মাত্র একদিন। পহেলা বৈশাখ, হালখাতার দিন। ওই দিন কোনো বাকি হয় না। কেউ তা চায়ও না। কারণ আজ পহেলা বৈশাখ। বৌনি দরকার। এভাবে হালখাতা আর বৈশাখ একাকার হয়ে যায়, ওতপ্রোত হয়। ইদানীং এসবের চর্চা কমে গেছে। নগরায়ণ বা বিশ্বায়ন অনেক কিছুর ধারায় একেও গ্রাস করেছে, পুঁজি-বাণিজ্যে তলিয়ে গেছে আমাদের সমষ্টিমুখর সময়গুলো। হারিয়েও গেছে। হেরেও গেছে বুঝি। ফলে এ প্রজন্ম হালখাতা বুঝবে না। বোঝার সুযোগ নেই। কিন্তু এ কৃষ্টি যে পুরোপুরি মুছে গেছে, তা নয়। যেমনÑ বৈশাখের জনজীবনে আবার তা ফিরে এসেছে, ব্যাপকভাবে এসেছে। বিস্তার হয়ে উঠছে। অবলম্বনও করছে মানুষ। এ হালখাতা বৈশাখের আর লিখিত জীবনের। কিন্তু অলিখিত হালখাতাটার দর কেমন? কবে কোন সময় মানুষ প্রজাতির জন্ম, তারপর তার ক্রমবৃদ্ধি, চিন্তার বহিঃপ্রকাশ! ক্রমেই সভ্যতা আর শ্রেণি তৈরি। রামায়ণ-মহাভারত বা ইলিয়ড-অডিসির যুগেও মানুষ ছিল। অন্ধ হোমার কী এক জীবনের মোহে লিখেছিলেন মহাকাব্য? শুধু ব্যাসদেবের নাম করলেও অনেকজন মিলিয়ে যে মহাকাব্য নশ্বর পৃথিবীতে এলোÑ তাও কম নয়। আর গুপ্ত ও মৌর্য যুগেও তো কত সহজ মানুষের কথা জানা যায়। আছেন অশোক বা আলেকজান্দার কিংবা বোকা কালিদাসও। এদের কী এ পৃথিবীর জন্য কোনো অলিখিত হালখাতা নেই? তারা কী শুধু এক একটি সৃষ্টির ভেতর দিয়েই বেঁচে আছেন! মনে হয় না। কারণ একদিন তো এ পৃথিবীতে রেনেসাঁ এসেছিল। তাও আয়-ব্যয়ের হিসাবের ভেতরে নিরূপিত। বিগত ছয়-সাতশ বছরে পৃথিবীতে সবল আর দুর্বলের যুদ্ধ চলেছে। সবলরা শ্রেণি তৈরি করেছে। দুর্বলদের ওপর সবলদের কত কী পাওনা! আর কতভাবে দুর্বল সবল হওয়ার চেষ্টা করেছে। দুর্বলকে ঠকানোর জন্য সবলের কত পাঁয়তারা। আবার দুর্বলও নতকণ্ঠে অবনত। সেটি যখন ক্ষমতাধররা গ্রহণ করে, তখন দুর্বলও নত থাকে এবং নিতে নিতে সবটুকু যখন শেষ, তখনো সে দুর্বলের কাছে বকেয়া কিছু রেখে দেয়Ñ যে হিসাব সে ধারাবাহিক অত্যাচারের ভেতর দিয়ে নিতে থাকে। এমনি করে জগৎজুড়ে মার খায় দুর্বল। এসব তো এ জীবনের অলিখিত হালখাতা। এর কোনো পরিমাপ নেই। শেষও হওয়ার নয়। হিসাব-নিকাশ যেমনই হোক, আমরা মানুষ জাতি এখন অতি বড় ব্যবসায়ী। মনে ও মগজে, চিন্তায় ও প্রকাশে। কিন্তু তা কেন? এ বৈশাখ ও হালখাতার সংস্কৃতির সঙ্গে জড়ানো আছে আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ। সে মূল্যবোধটুকু তো পুরনো হয় না। দেনা চুকে যায় কিন্তু সম্প্রীতি রয়ে যায়; আবার কৃষ্টির ধারা প্রবহমান থাকে, মূল্যবোধের যাথার্থতার ওপরে। কেন আজ লেনদেনের প্রশ্নে সবল-দুর্বলের কথা আসছে? এটা তো সত্যি, সমাজে পার্থক্যটা কমছে না। আমরা সেটি নানা উপায়ে বাড়িয়ে তুলেছি। আর যত বাড়াচ্ছি, তত তার শ্বাসরুদ্ধকর বিকৃত মুখ তৈরি হচ্ছে। পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব বড় হচ্ছে। বেদনা বাড়ছে। ভোগ বাড়ছে। আর আমরা নিয়ত একাকী হচ্ছি। এ একাকিত্ব আর বিচ্ছিন্নতা কতদূর? এর মধ্যে কি কোনো আন্তরিকতা বা মোহন সুখ পাওয়ার ব্যাপার আছে? নেই। নতুন প্রজন্ম শুধু শর্টকাট পথ খোঁজে। নিজের পাওয়া বা লাভ বোঝে। কিন্তু মহৎ হওয়ার জন্য শুধু নিজের মধ্যে তা সীমিত থাকলে চলে কী? তাতে কি সংস্কৃতিবান হওয়া যায়। মানুষ হওয়া যায়? মূল্যবোধের সংস্কৃতির জন্ম দেওয়া যায়? হালখাতা কিন্তু একরকম সেই লেনদেনের অর্থেও বাইরের দায় ও দায়িত্বের আন্তরিকতার সমর্থন দেয়। খাতা নিয়ে খাজাঞ্চি বসে আছেন। নতুন ধূপের গন্ধ বাতাসে মিলাচ্ছে। সাজানো হয়েছে নতুন স্বপ্নÑ যেখানে ফুরোবে আজ সব লেনদেন। তার বিনিময়ে মিষ্টিমুখও চলবে। এটা হয়তো সহজ শোধ। হয়তো তা তুচ্ছ করে দেখা। তুচ্ছতার পরিমাপও বটে। কিন্তু এর বাইরে কী কোনো মাহাত্ম্য নেই? না থাকলে আজ তা আমাদের মনে আসত না। সেসব মুখর দিনের হালখাতা আর বৌনিকরণের দিনের কথা, সেটায় শহর-গ্রাম ছিল না। বৈশাখের উৎসবের সঙ্গে সর্বত্র, সর্বস্তরে ছিল তার মাখামাখি। আন্তরিকতা সবটুকু ছাপিয়ে দিত। অন্তরঙ্গ মুহূর্ত সৃষ্টি হতো। সবাই মিলত। অন্যে মিলাত। আপন-পর ভেদ নেই। ন্যায় ও শাসন একরকম হয়ে ফিরত। মানুষের মধ্যে নানারকম মূল্যবোধ গড়ে উঠত। পারস্পরিক লেনদেনের ভেতরেও স্ফূর্তিটা তৈরি হতো। এই স্ফূর্তিই সমাজের স্তরে প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ফেলে। সমাজের মানুষের ভেতরে ন্যায়বোধ তৈরি করে। আর আদান-প্রদান লেনদেন তো শুধু লাল টালি বইয়ের ভেতরে নয়, একটা কৃষ্টির মাপকাঠিও বটে। তার মধ্যেই শেখা ও করার অনুশীলনটা চলে। বড়দের কাছ থেকে ছোটরা পায়। ফলে সমাজে একটা পরিশুদ্ধতার পরিবেশ তৈরি হয়। সেখানে লেখাপড়া বা লেখাপড়া-অতিরিক্ত মূল্যবোধ সৃষ্টি হয়। এই পরিবেশ থেকেই প্রশ্ন আসেÑ আমি কী, কেমন ইত্যাদি। ফলে সমাজে যে উৎসবের নাচন ওঠে, তা তখন সর্বস্তরের মানুষকে এক করে ফেলে। সবল-দুর্বলের প্রশ্নটিও তাতে ভাটা পড়ে যায়। ভুলে যায় হিংসা-বিদ্বেষ। বিপরীতে ঔদার্য গড়ে ওঠে। গ্রহণের সামর্থ্য তৈরি হয়। ছোট-বড় খোঁজাটা আর তখন থাকে না। সেটি মিলে গিয়ে অন্তরের টানটুকু বড় হয়। পহেলা বৈশাখ তো প্রতীকীমাত্র। হালখাতাটাও তাই। কিন্তু এর মধ্যে জীবনের গতি ও প্রবাহ তৈরি হয়। তখন প্রশ্নও আসে না, পৃথিবীতে সক্রেটিসের মৃত্যু বা প্লেটোর জীবনাবসান স্বাভাবিক হলো না কেন? গ্যালিলিও কেন ওভাবে দ-িত হলেন? হ্যাঁ, সত্য ও ন্যায়ের প্রচারকরা সমাজে আক্ষরিক লেনদেন কখনো বোঝেননি। তাদের জীবনের হালখাতার রঙ ছিল আলাদা। তাদের পাওয়া-না পাওয়ার বিচার মানুষ বা সমাজ করতে পারেনি। ফলে অনেককাল পর তারা বেঁচে যান। অমরত্ব পান। তাই কবি সিকান্দার আবু জাফর বলেছিলেনÑ ‘প্রায় দুহাজার চারশ বছর আগে সক্রেটিস নামে এক ব্যক্তি হালখাতার বকেয়া পাওনার জের যাতে আর না টানা হয়, যাতে একটা সামঞ্জস্য আনা যায়, তার জন্য নতুন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন। মানুষকে সদ্গুণসম্পন্ন হওয়ার জন্য তিনি ফতোয়া দিয়েছিলেন। তার ফিরিস্তিতে সাতটি সদ্গুণের উল্লেখ ছিলÑ বাস্তব সম্পর্কে জ্ঞানস্পৃহা, মিথ্যার নামে ঘৃণা এবং সত্যানুরক্তি, ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি বিমুখতা, অর্থ সম্বন্ধে ঔদাসীন্য, উচ্চমন্যতা ও বদান্যতা, ন্যায়ানুরক্তি এবং ভদ্র আচরণ, নিয়মানুগ ছন্দোবদ্ধ জীবনযাত্রা। তার বুদ্ধির ক্ষেতে শক্তিমানের ইচ্ছানুযায়ী ফসল ফলাতে রাজি হননি। ফলে শক্তিমান একদিন তার অস্তিত্ব মুছে ফেলে দিল। কিন্তু সরাসরি তা করল না। শক্তিমানেরও কৈফিয়তের প্রয়োজন হয়। কাজেই সক্রেটিসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বিচারে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে কানুনমাফিক তাকে প্রাণদ- দেওয়া হলো। সক্রেটিস নিজের সত্যের ওপর টিকে রইলেন এবং শক্তিমানের দেওয়া শাস্তির বিষ নিজের হাতে পান করলেন।’ এটি একটি শিক্ষা। এ শিক্ষাটা সমাজে এখনো জরুরি এবং বাংলা নববর্ষের মৌল চেতনার মধ্যেও তা নিহিত। তাই হালখাতার নিয়ম আমাদের কৃষ্টিরই অংশ। প্রযুক্তির যে তা-ব আমাদের সমাজে চালু হয়েছে, তাতে সংস্কৃতির অনেক কিছু হয়তো ভেসে গেছে। এ ভেসে যাওয়ায় কারো কিছু না এসে গেলেও প্রকৃত ঐতিহ্যটি তো ধরে রাখতে হবে। সেটিই তার কেন্দ্র। বাঁচিয়ে রাখার সুতো। তবে তা আমাদের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যধারা বজায় রেখে চালিত এবং তা প্রবহমান রাখতে হবে। তাই প্রতিবছর যে হালখাতার প্রসঙ্গ আসে, তা ফিরে আসে কিছু কর্তব্যবুদ্ধি ও চেতনাশক্তির ভেতর দিয়ে, যা সমকালীনতায় নবায়ন করা জরুরি। তবে এ নবায়নের পথে বড় বাধা হচ্ছে বাণিজ্য-পুঁজি। কিন্তু অবশ্য তার প্রতিরোধÑ এ বৈশাখ। সেটি কায়েম করতে হবেÑ এককভাবে নয়, বৃহৎ পরিসরে এবং নববর্ষের উৎসবই তার সঠিক পথ দেখাতে পারে। সেটির তাৎপর্য ওই সর্ববিস্তারী ও সর্বপ্রান্তিক সমাজের ভেতরে এবং এই বুঝতে পারার শক্তিটি অকৃত্রিমভাবে করে দিতে পারে পহেলা বৈশাখ। এটিই বৈশাখ ও হালখাতার ঐতিহ্যিক শক্তি।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে