লোকসংস্কৃতি এবং বাঙালিত্ব

  বী রে ন মু খা র্জী

১৩ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্যেক জাতির আত্মপরিচয়ের মূলে থাকে সেই জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি। সমাজে বসবাসরত মানুষের কথাবার্তা, চলাফেরা, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া, উৎসব, লোক-বিশ্বাস, আচার-আচরণ, ধর্ম-দর্শন, নিত্যব্যবহার্য তৈজসপত্রসহ যাপনের এসব প্রপঞ্চের ছোঁয়ায় ঋদ্ধ হয় সংস্কৃতি। বাঙালি জাতিও এর ব্যতিক্রম নয়। বাঙালির জীবনসত্তায় বহমান যে সংস্কৃতি, তা বাঙালির আদিরূপ থেকে উত্থিত। বাঙালির আদি-সংস্কৃতির আরেক নামই লোকসংস্কৃতি। হাজার বছর ধরে বাংলার গ্রামীণ মানুষের আচার-আচরণ, জ্ঞান, বিশ্বাস, চলাফেরা, আত্মজিজ্ঞাসা, পাল-পার্বণ, উৎপাদন, কৃষি-অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাসসহ যাপনের নানা দিক বাঙালি সংস্কৃতিকে মহিমান্বিত ও নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি বেগবানও করেছে। কৃষিনির্ভর বাংলার স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামই এই লোকসংস্কৃতির আধার। আবার মানুষের জীবনাচারে তার নিজস্ব সংস্কৃতির বিস্তৃতি ব্যাপক এবং এর শিকড় যাপনের গভীরে প্রোথিত হলেও পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো, মানুষের নানা মৌলিক চাহিদার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে বিবর্তিত হয়ে আধুনিক সংস্কৃতি-সভ্যতার জন্ম দেয়। সমাজে বসবাসরত মানুষের হাতেই সভ্যতা-সংস্কৃতির নির্মাণ চলে ধীরগতিতে। সংস্কৃতি-সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মিশ্রণ ঘটে ভিনদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির। আবেগপ্রবণ বাঙালি জাতি এটিকে সহজভাবে গ্রহণ করে বাংলায় মিশ্র-সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হাজার বছরের ঐতিহ্য ঋদ্ধ এই বাংলা ভাষাভাষী জনপদ শাসন করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ। যাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এ ভূ-ভাগ শাসনের ফলে বাঙালির রক্তধারায় ওই সব জনগোষ্ঠীর কিছু না কিছু উপাদান মিশ্রিত হয়েছে। যে কারণে বাঙালিকে বর্ণ-সংকর জাতি হিসেবে প-িতরা মনে করে থাকেন। সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টিতে বাঙালিরা মূলত অষ্ট্রিক-ভাষা ঋদ্ধ অস্ট্রেলীয় শ্রেণির উত্তরসূরি। নৃতাত্ত্বিক গবেষকদের মতে, দ্রাবিড়, আলপীয়, আর্যভাষী নর্ডিক, মঙ্গোল, তুর্কি, মোগল, পাঠান এসব বহিরাগতের রক্তও মিশেছে বাঙালির দেহে। যে কারণে গঠন ও আকৃতিতে বাঙালি জাতি ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মিশ্র রূপের প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় বাঙালিরা আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর দেহাবয়বের মিশ্ররূপ হিসেবে স্বীকৃত। এ সত্ত্বেও বাংলার লোকসংস্কৃতি কৃষি জলবায়ুনির্ভর মানুষের ক্রমিক জীবনাচারের সমন্বিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। বাঙালির আর্থসামাজিক অবস্থা, জীবনাচার ও ভূয়োদর্শনের যথার্থ প্রতিফলন দৃশ্যমান হয় লোকাচারের প্রতিটি অনুষঙ্গে। উৎসব, ধর্মীয় বিশ্বাস, বিবাহ, ক্রীড়া, পাল-পার্বণসহ জীবনের নানা ক্ষেত্রে চলমান আনন্দ-বেদনার আলেখ্যই লোকসংস্কৃতিকে শিল্পসুষমায় আলোকিত এবং উজ্জ্বল সৌন্দর্যে চিত্রিত করে। গ্রামীণ জনপদেই লোকসংস্কৃতির পরিশীলিত চর্চা হয়ে থাকে। আবার আদিম-সংস্কৃতির সঙ্গে লোকসংস্কৃতির প্রচ্ছন্ন যোগাযোগ ও সহমর্মিতা থাকায় লোকজীবনের গল্পগাথা, বিবাদ-গালি, হাস্যরস, ক্রীড়া-বিনোদন, বিবাহ, মেলাসহ নানা পার্বণ-অনুষ্ঠানের ভেতর দিয়ে লোকসংস্কৃতির প্রকৃত স্বরূপ প্রতিভাত।

গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে, ‘লোকায়ত বাঙলার উদার মানবিক জমিনের অধিবাসী বাঙালি জনগোষ্ঠী চিরকালই ভাব-বিদ্রোহী, মিলনপ্রয়াসী এবং সমন্বয়পন্থী’ (লোকসংস্কৃতি বিবেচনা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ; আবুল আহসান চৌধুরী, পৃ. ৪)। যে কারণে বাঙালি লোকজীবনে ব্যবহৃত আবাস-আসবাব থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাসও প্রায় অভিন্ন। যদিও দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশ বিভক্তি, ধর্মীয় অসহনশীলতা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির উত্তরণে বিদেশি সংস্কৃতির ওপর প্রবল আগ্রহসহ নানাবিধ কারণে বাংলায় বসবাসরত মানুষকে মিলনপ্রয়াসী ধারা থেকে অনেকটা বিচ্যুত হতে দেখা যায়। এ উপমহাদেশে মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বী হিন্দু সম্প্রদায়, সনাতন ভাবধারায় চলমান বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সম্প্রদায়, ইসলাম ধর্মবলম্বী মুসলমান এবং আদিবাসি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। দ্বিজাতিতত্ত্বের কারণে হিন্দুদের ‘হ্যাঁ’কে মুসলমানরা ‘না’ এবং মুসলমানদের ‘হ্যাঁ’কে হিন্দুরা ‘না’ বলতেই বেশি অভ্যস্ত। সঙ্গত কারণে প্রশ্ন হতে পারে, বর্তমান বাংলার লোকসংস্কৃতিকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ যৌথ জীবনচর্চার সমন্বিত রূপ হিসেবে দাঁড় করানো কতটা যুক্তিযুক্ত? তবুও বাঙালির আদি বৈশিষ্ট্য অন্বেষণে দেখা যায়, ধর্মীয় বিভাজনের আগে বাঙালিসমাজ প্রায় একই ভাবধারা ও জীবনাচারে অভ্যস্ত ছিল। খড় বা ছনের দোচালা ঘর, পাটকাঠির বেড়া, বাড়িতে এক চিলতে উঠোন, মাটির গোয়ালঘর, কাঠের তৈরি খড়ম পায়ে হাঁটা, নারকেলের মালা দিয়ে তৈরি হুক্কা ব্যবহার, ধুতি, গামছা, আটপৌরে তাঁত শাড়ি এসবই মূলত গ্রাম্য কৃষিজীবনের বাস্তুগৃহের সাধারণ চিত্র। স্যার ই. বি টাইলর সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘জ্ঞান-বিজ্ঞান, আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতিবোধ, আইন-কানুন এবং অনুশীলন ও অভ্যাস এবং অন্যান্য সব সম্ভাবনা যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসেবে আহরণ করে তাই সংস্কৃতি’ (সংস্কৃতি ও সংস্কৃতিতত্ত্ব, বুলবন ওসমান, পৃ. ১৩)। অতএব বলা যায়, বাংলার লোকজীবনের প্রাত্যহিক প্রয়োজন ও চাহিদা থেকে সংস্কৃতির আরেক অংশ শিল্পকলার সূচনা ও বিকশিত হয় গ্রামীণ জনপদেই। গ্রামীণ পরিবেশ ঘিরেই এই শিল্পকলা নানা ধারায়, নানা মাত্রায় প্রবহমান। ঋতুভিত্তিক বা ধর্মীয় পাল-পার্বণ সংশ্লিষ্ট মেলা, বিনোদন, সন্ধ্যায় পুঁথিপাঠ, কীর্তন ইত্যাদি অনুষ্ঠানাদিতে বাংলার আর্থসাংস্কৃতিক চেতনার প্রতিফলন দেখা যায়। এ ছাড়া বছরের বিশেষ সময় যেমন, পৌষে গো-অর্চনা, পিঠা উৎসব, ভাদ্রে নৌকাবাইচ, বৈশাখে ফল উৎসবসহ, বিভিন্ন ধর্মীয় মেলা ও সাধুসন্তের আগমন ঘিরে লোকজীবনে অনুষ্ঠিত উৎসবে কলাগাছের তোরণ তৈরি এবং সাজ সজ্জা শিল্পবোধ ও শিল্পসচেতনতার সাক্ষ্য বহন করে। গ্রামের মেঠোপথে গরু বা ঘোড়ার গাড়িতে ধুলো উড়িয়ে কিংবা নদীতে পালতোলা ডিঙি নৌকায় নাইয়র যাওয়ার দৃশ্য যে চিত্রকল্প তৈরি করে, তা গ্রামনির্ভর শিল্পচেতনার একটি বিশেষ অংশ। এ ছাড়া মাটির দেয়ালে নকশা-আল্পনা, লক্ষ্মীপট, মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্রে দেবদেবীর চিত্র অঙ্কন, সূচিশিল্পীদের নকশা করা কাঁথা, আসন ইত্যাদির মধ্যে গ্রামনির্ভর লোকশিল্পীদের শিল্পচেতনা ও শিল্পের প্রতি বৈদগ্ধতা প্রকাশিত হয়। এসব সামগ্রী গ্রাম্য শিল্পীদের শিল্পবোধের প্রকৃত পরিচয় বহন করে; যা ক্রমেই বিবর্তিত, বিকশিত হয়ে আজকের আধুনিক শিল্পকলা বা শিল্পমাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে।

লোকসংস্কৃতি চর্চার ভেতর দিয়েই বাঙালির আত্মানুসন্ধানের সূচনা করেছেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ থেকে শতাধিক বছর আগে তিনি বলেছিলেনÑ ‘আমাদের দেশ প্রধানত পল্লীবাসী। এই পল্লী যখন আপনার বাড়ির মধ্যে বাহিরের বৃহৎ জগতের রক্তচলাচল অনুভব করিবার জন্য উৎসুক হইয়া উঠে, তখন মেলাই তাহার প্রধান উপায়। এই মেলাই আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান।’ আবার লোকবিজ্ঞানী আশুতোষ ভট্টাচার্য বলেন, ‘বাংলার সংস্কৃতি বাংলার পল্লীতেই জন্ম ও পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছে। সেই জন্য আজ যে নাগরিক সংস্কৃতি এ দেশের ওপর স্পর্দ্ধিত শির উন্নত করিয়া দাঁড়াইতে চাহিতেছে, তাহা কিছুতেই জাতির মর্মমূলে নিজের শিকড় প্রবেশ করাইতে পারিতেছে না। ... অতএব কল্যাণ্যের পথে সমাজকে যাহারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাহেন, ধ্বংসোন্মুখ পল্লীজীবনের মধ্যেই এখনও তাহাদিগকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির মৌলিক উপাদানের সন্ধান করিতে হইবে।’

বলার অপেক্ষা রাখে না, বাঙালির লোকসংস্কৃতির মূলধারাটি প্রবল জীবনাগ্রহ থেকে উৎসারিত। সামাজিক নানা অন্যায়-অনাচারের বিপক্ষে লোকসং¯ৃ‹তির সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চেতনাও পাওয়া যায়, যা মানবিক চেতনাকেও শানিত করে। প্রকৃতপক্ষে জীবনঘনিষ্ঠতা ও সমাজসংলগ্নতা বাংলার লোকসংস্কৃতিতে একটি জীবনবাদী আবহ ও ভিন্ন দ্যোতনা যোগ করেছে। এই প্রবহমান সংস্কৃতির মূল অনুসন্ধান করলেই বাঙালির প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যাবে।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে