বেলালদা ছিলেন হীরে বসানো ব্যতিক্রম

  মা সু দ ক রি ম

০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘দেশ-কাল-সমাজ-সংসার, যুদ্ধবিগ্রহ, পরমাণু আবর্জনা, যোনি, ব্যাঙের ছত্রাক, শ্যাওলা-গুল্ম, ঘাস-লতাপাতা-ফুল, সৌরপল্লীর যাবতীয় সবকিছু কবিতার ভোজ্য। আমি কেবল ক্রমাগত ঠুকরে চলেছি।’

এই অসাধারণ পঙ্ক্তিমালা, কী দারুণ অভিব্যক্তি, যা একজন বেলাল চৌধুরী অন্তরে ধারণ করে তার সাহিত্যজগতের যাবতীয় চিন্তাচেতনা বিশ্লেষণ করেছেন এবং বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অগ্রভাগের একজন সঙ্গী হয়েছেন নিজের লেখনীর দ্বারা।

কবি বেলাল চৌধুরীকে কোনো বিশেষণে আখ্যায়িত করার প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। তিনি একদিকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। বাংলা সাহিত্যের জগতে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়ার জন্য সেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করেন লেখালেখি।

তিনি মূলত গদ্যের লেখক হলেও নিজেকে খুঁজে পান পদ্যের মধ্যেই। বেলাল চৌধুরীর জন্ম বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনীতে হলেও বাবার রেলওয়ের চাকরির সুবাদে জীবনের একটি সময় কেটেছে চট্টগ্রামে। তাই তার লেখনীতে যেমন এসেছে কর্ণফুলী নদীর কথা, তেমনি পাওয়া যায় বঙ্গোপসাগরের বুক বেয়ে কত জল প্রবাহিত হয়ে গেছে এবং তাতে কোথাকার জল কোথায় গড়িয়েছে তার বৃত্তান্ত। তবে বাবার চাকরির কারণে তার লেখনীতে বারবার উঁকি দিয়েছে রেলওয়ের কথা, যেমনটি তিনি তার স্মৃতি থেকে বিলীন হতে দেননি তার স্মৃতিবিজড়িত অনেক স্মৃতি।

একসময় কলকাতাকে সাংস্কৃতিক চর্চার তীর্থস্থান মনে করা হলেও ঢাকার অবদান কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বাংলা ভাষা সাহিত্যের রাজধানী ছিল একসময় কলকাতা। বিশেষ করে অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে যখন বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটে তখন তো বটেই, এমনকি বিশ শতকেরও প্রথম চারটি দশক বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষের কলকাতা। আর আধুনিক বাংলা কবিতার বিকাশে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিহারী লাল হয়ে জীবনানন্দ, বিষ্ণুদে, সুধীন দত্ত, অমিয় চক্রবর্তী প্রমুখ তিরিশি কবিদের কাল পর্যন্ত কবিতারও রাজধানী ছিল ভারতের কলকাতা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত ২৩ বছরের পাকিস্তানি শাসনামলে বাংলাদেশের সাহিত্য দুটি ধারায় বিভক্ত হয়েছিল এ কথা ঠিক। তবে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার যে আকাক্সক্ষা পূর্ব বাংলার কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মীদের মনে তীব্র হয়ে উঠেছিল তাতে প্রগতিশীল সাহিত্যের ধারাই সমৃদ্ধ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া গবেষকরা প্রায় সবাই আমাদের সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্গত মনে করেন না। যে কারণে বাংলা কথাসাহিত্যের আলোচনা বা ইতিহাসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরীর মতো দেশবরেণ্য লেখকরা অনুপস্থিত।

একজন মানুষের জীবনে কত রকমের আড্ডা আছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। এর মধ্যে নেশা ও পেশাভিত্তিক আড্ডাটাই সম্ভবত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দেখা যায় এ দুটিই হাতে হাত রেখে চলে। বেলাল চৌধুরী কৈশোরে ও যৌবনে এরই ঘোরে পড়েছিলেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ঊষালগ্নে বেশ ক’টি স্থানই এসব কর্মকা-ের কেন্দ্রস্থল ছিল। আর তাই পাটুয়াটুলিতে বেগম ও সওগাত অফিসে আড্ডা হতো পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের। বাদ যায়নি বিউটি বোর্ডিং।

ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং হতে চেয়েছিলেন রেলইঞ্জিনের ড্রাইভার কিংবা নীল পোশাক পরা নাবিক। কিন্তু শেষ অবধি নিজের অজান্তেই হয়ে গেলেন সাহিত্যের কারিগর। একদিন আর দশজনের মতো বেলাল চৌধুরীও গিয়েছিলেন কলকাতায়। তিনি প্রথম বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই অনুভব করেছিলেন কঠিন বাস্তবের অভিঘাত। কালক্রমে মিশে গেছেন বা বলা যায় নিজেকে মিশিয়ে একাকার করে দিয়েছেন কলকাতার রক্তবাহী ধমনি কালান্তরের সঙ্গে অস্থিমজ্জার প্রতিটি কোষে কোষে। যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বলে আর কিছু নেই। তাই তার দিন-রাতের অর্ধেকটাই কেটেছে কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে। এই কফি হাউসের সুবাদে পরিচয় হয়েছিল অনেক নামিদামি মানুষের সঙ্গে। এর মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, সুবোধ সরকার, বিনয় মজুমদার উল্লেখযোগ্য। তা ষাটের দশকের মাঝামাঝি হবে। সুবোধ সরকার কবি বেলাল চৌধুরীর বিশেষ বন্ধু ছিলেন। বন্ধুর এই প্রয়াণে বলেন, ‘চাঁদ থেকে নেমে এসে, চন্দ্রপথে ঊনআশি বসন্ত হেঁটে, পুনরায় চাঁদে গেলেন বেলালদা। এখন বুঝলাম চন্দ্রজাতক তুমি পারস্যের বালি আর পদ্মার পানিসহ চন্দ্রভুক হতে এসেছিলে। কারোর নিন্দা করতেন না তিনি। কবিরা এ-ওর নামে নিন্দা করে নিন্দার ডিভানে শুয়ে অমৃত লেখেন। বেলালদা ছিলেন হীরে বসানো ব্যতিক্রম। আপনি এই খারাপ সময়ে কী রেখে গেলেন? আপনি রেখে গেলেন সেই বন্ধুত্বের জ্যোৎস্নাকে। ওটাই আপনার কবিতা। ওটাই আমাদের গঙ্গা, আমাদের পদ্মা।’

একটা ছন্নছাড়া সময়ের ভেতরেই কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন কৃত্তিবাশ। ১৯৭৪-এ দেশে ফেরা। সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত এই দীর্ঘ এক যুগ তার হাত ধরেই ভারত বিচিত্রা সমৃদ্ধ হয়েছে। এ দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে আমরা পেয়েছি বেলাল চৌধুরীর উপস্থিতি।

এই তো মাত্র এক মাস আগের কথা। প্রথমে সেগুনবাগিচায় যত্রতত্র খোঁজাখুঁজি তারপর বাড়ির পাশের আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। না, কথা হলো না। চিকিৎসকের কড়া নির্দেশ, কথা বলা যাবে না। ভালো না থাকলেও যেই মানুষটি হাসিমুখে ভালো আছি বলতেন, সেই মানুষটি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন নিথর হয়ে। সাহিত্যজগতে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করলেও জীবনযুদ্ধে এখন কবি চলে গেলেন আকাশের ঠিকানায়। হে সাহিত্যের কারিগর, আপনার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে