বেলাল চৌধুরীর নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়

  হা সা ন অ রি ন্দ ম

০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পাঠকের কাছে বেলাল চৌধুরীর (জন্ম ১৯৩৮) প্রধান পরিচয় তিনি একজন কবি। তিনি সত্তরোর্ধ্ব বয়সে রচনা করেন আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’। কবি, সম্পাদক, লেখক, সাংবাদিক, সর্বোপরি মানুষ বেলাল চৌধুরীকে চেনার ও বোঝার জন্য এক অবিকল্প আকরগ্রন্থ এটি। ভূমিকায় বইটিকে তিনি আত্মজীবনী না বলে মূলত স্মৃতিকথা বলতে চেয়েছেন। কারণ আস্ত একটা জীবনের সব কথা খোলামেলা বলা যায় না। তিনি মনে করেন স্মৃতিলিপির একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সম্ভব, যা ডায়েরি বা জার্নাল থেকে ভিন্ন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘স্মৃতিচারণমূলক রচনায় অনেক সময় লেখক নিজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি না হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তো বটেই, তদুপরি ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত আর সে নিজে হয়তো রচনাটির নগণ্য চরিত্র।’ [ভূমিকা]

শৈশব থেকে কবি বেলাল চৌধুরীর জীবন বিপুল বৈচিত্র্যে ভরপুর। তিনি জীবৎকালের বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম, ফেনী, সন্দ্বীপ, লাকসাম, কুমিল্লা, ঢাকা, কলকাতা প্রভৃতি স্থানে কাটিয়েছেন। সেসব স্থানের প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব প্রভৃতির কথা উঠে এসেছে বেলাল চৌধুরীর বইয়ে। এ গ্রন্থের প্রথমেই পাওয়া যায় চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ। সেখানে কেটেছে কবিজীবনের প্রত্যুষকাল। রেলওয়েতে তার পিতার চাকরিসূত্রে বেলাল চৌধুরীরা থাকতেন নন্দনকাননের দ্বিতল বাড়িতে। লেখকের দৃষ্টিতে চট্টগ্রাম ছিল ছিমছাম আর পরিচ্ছন্ন, রাস্তাঘাটে পাহাড়ি ছাপ। এ শহর যেমন সূর্যসেন, প্রীতিলতার মতো বীর-বিপ্লবীর পদভারে মুখরিত ছিল, তেমনি হয়তো তারই জের ধরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশক্ষেত্র হিসেবেও এর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

বেলাল চৌধুরীর শৈশব-কৈশোরের জীবনে রেলের ভীষণ প্রভাব। তিনি খুব ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতেন রেলইঞ্জিনের ড্রাইভার হবেন। ইঞ্জিনের ড্রাইভার তার কল্পনাবিলাসকে জাগিয়ে দিত। তার মনে হতো ‘না জানি কোন সুদূর কল্পলোকের রাজপুত্তুর যে পঙ্খিরাজ ছুটিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে দেশ-দেশান্তরে।... দুধারের টেলিগ্রাফের তারে বসে দীর্ঘপুচ্ছ ফিঙে, হঠাৎ উড়াল দিচ্ছে মাছরাঙা, কখনো দেখা যায় এক ঠ্যাঙে ঠায় দাঁড়ানো ধ্যানমগ্ন বক, দূরের আকাশে উড্ডীয়মান বকপাঁতি। কখনো মাঠভরা রোদ্দুর, কখনো মেঘলা আকাশ চিরে ঝিলিক দিচ্ছে বজ্রবিদ্যুৎ, মরে আসছে দিনের আলো।’ [১৩-১৪]

ছোটবেলা থেকেই নানা উপায়ে ভালো ভালো গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা হাতে এসেছে বেলাল চৌধুরীর। বাড়িতে ছিল পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ। তার আসাম বেঙ্গল রেলওয়েতে চাকুরে পিতার প্রচুর বই কেনার অভ্যাস ছিল। কুমিল্লা অবস্থানকালে বেলাল চৌধুরী তিনটে লাইব্রেরিতে আসা-যাওয়া করতেন। উগ্র নেশার মতো পড়ার বইয়ের আড়ালে তিনি বাইরের বই পড়তেন। ছোটবেলায়ই তার লেখায় হাতেখড়ি। তবে সে লেখা শুরু হয়েছিল পয়সার বিনিময়ে অন্যের জন্য প্রেমপত্র লিখে দিয়ে। আর সেই অভিজ্ঞতাই তাকে কবিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তার লেখা প্রথম কবিতা ‘কত চেনা’ ছাপা হয় ইত্তেহাদ সাময়িকীতে।

‘কত লাকসাম কত বাতি’ অধ্যায়ে ওয়াহিদুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ওরফে লাকসাম দাদার বর্ণিল যেমন যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তা অনেকটা ছোটগল্পের মতো। বেলাল চৌধুরী বেশ কিছুদিন সন্দ্বীপে ছিলেন তার ফুপা সাবডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট কাজী সফিউদ্দিন আহমদের বাড়িতে। উচ্চশিক্ষিত জনাব আহমদের বাড়িতে উন্নত সাংস্কৃতিক পরিম-ল পেয়ে যান বেলাল। ওই গৃহে নিয়মিত দেশ-বিদেশের পত্রিকা-ম্যাগাজিন আসত। তখন প্রায় প্রতিটি পত্রিকায় শিশুদের জন্য একটি বিভাগ ছিল। ফুপার উৎসাহে বেলাল প্রতিটি পত্রিকার শিশুপাতার সদস্য হতেন। বেলাল চৌধুরী যেখানেই গিয়েছেন সেখানকার প্রকৃতি ও মানুষকে আপন করে নিয়েছেন, খুঁজেছেন সে স্থানের ঐতিহ্য, গৌরব এমনকি নামের উৎপত্তি। সন্দ্বীপ সম্পর্কেও তিনি এই অংশে মূল্যবান ও চমকপ্রদ সব তথ্য হাজির করেছেন পাঠকের সামনে। তার জীবনের কুমিল্লাপর্বও সূচিত হয় সেই ফুপার সূত্রেই। সন্তানের মঙ্গল কামনায় তার মা নিজের বুক খালি করে ছেলেকে তুলে দেন ফুপুর কাছে। সেখানে যেমন পেয়েছেন ফুপু-ফুপার স্নেহ, তেমনি গ্রন্থপাঠের জন্যও অনুকূল পরিবেশ।

ফেনীতে অবস্থানকালে তরুণ কবির পরিচয় হয় মাহবুবুল হকের সঙ্গে। তিনিই তাকে ঢাকায় নিয়ে অবজারভারের সালাম সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এ পত্রিকার মালিক ছিলেন পাকিস্তানের সে সময়কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী। তার ইচ্ছামাফিক ফেনী থেকে প্রকাশ করা হবে পল্লীবার্তা নামক পত্রিকা। এর সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয় বেলাল চৌধুরীকে। ফলে নাটকীয়ভাবে অতি অল্প বয়সেই তিনি সম্পাদক হওয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

ঢাকার সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসে বিউটি বোর্ডিংয়ের নাম কিংবদন্তিতুল্য। সঙ্গত কারণেই ষাটের দশকের এই কবি রচিত স্মৃতিকথায় গুরুত্বের সঙ্গে এ স্থানের প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে ‘আমাদের যৌবরাজ্যের সৌন্দর্যখনি বিউটি বোর্ডিং শিরোনামে।’ বেলাল চৌধুরী মনে করেন বাঙালির কাছে আড্ডা হলো গা-হাত-পা ঢেলে, ছড়িয়ে, নাওয়া-খাওয়া ভুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সুখস্বপ্নে বিভোর থাকা। আড্ডার জন্য দরকার মেজাজের সঙ্গে প্রচুর প্রাণশক্তি আর বেদম বাকশক্তি। এ ক্ষেত্রে ঢাকার কবি শহীদ কাদরী ছিলেন এক অতুলনীয় আড্ডাবাজ, এ পরিচ্ছেদে যার উল্লেখ দীর্ঘ পরিসরজুড়ে।

কমিউনিস্টপন্থি রাজনীতি করেন এই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বেলাল চৌধুরীকে বেশকিছু কাল কারাভোগ করতে হয়েছিল। তিনি ফেনী, কুমিল্লা ও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এই বন্দি জীবনযাপন করেন। সেখানে অনেক খ্যাতনামা মানুষের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। কবি স্পষ্ট বলেছেন, কারাবাসে না গেলে জীবনের পাঠ তার অসম্পূর্র্ণ থাকত।

কবি বেলাল চৌধুরীর তারুণ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয়েছে কলকাতা নগরীতে। সেখানে বহু নামকরা কবি-লেখকের সঙ্গে তার হৃদ্যতা সৃষ্টি হয়। তিনি এক সময় রীতিমতো কলকাতার প্রেমে পড়ে যান। জড়িয়ে পড়েন সুখ-দুঃখের নিবিড় বন্ধনে। কলকাতার ‘বাংলা কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। উৎপল কুমার বসু, দীপক মজুমদার, তারাপদ রায়, সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় গুপ্ত এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা কবিরা তাকে স্বীকৃতি দেন।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের অকৃপণভাবে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর কথা রয়েছে একটি অধ্যায়ে। পাকিস্তানি শাসকরা পৃথিবীবাসীকে বোঝাতে চাইছিল কিছু দুষ্কৃতকারী গোলমাল করছে, তাদের শায়েস্তা করা হয়েছে, অন্যথায় পাকিস্তানজুড়ে শান্তি বিরাজ করছে। এক সময় আশঙ্কা করা হচ্ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম আবার মাওবাদীদের হাতে চলে না যায়। পরাশক্তিদের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়াও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। এ পরিস্থিতিতে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিবাহিনীর পাশে এসে দাঁড়াল।

দেশ স্বাধীনের কিছুকাল পর বেলাল চৌধুরী ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পত্রিকাটিকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। শুরুতেই তার মাথায় ছিল ৬৪ পৃষ্ঠার কাগজে যথাসম্ভব নিজস্ব শিকড়সন্ধানীর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা। গল্প, কবিতা, প্রচ্ছদ পরিচিতি, সম্পাদকীয়, ফিচার, নিবন্ধ সবকিছুতেই তিনি স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে সচেষ্ট ছিলেন।

বেলাল চৌধুরীর কর্মজীবনের একটি বড় সময় অতিবাহিত হয়েছে ‘ভারত বিচিত্রা’র সম্পাদকরূপে কাজ করে। পত্রিকাটি ভারতীয় হাইকমিশন কর্তৃক ভারতীয় জনগণের শুভেচ্ছাস্বরূপ প্রকাশিত হয়। ১৯৮৫ সালের মার্চ মাসে তিনি এখানে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে নানা অম্লমধুর অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয় তার। এ সময় বিভিন্ন হাইকমিশনারের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি, ওই কর্মকর্তাদের স্বভাব-চরিত্রও ছিল বিচিত্র। ভারতের খ্যাতনামা লেখকদের পাশাপাশি এপার বাংলার শওকত ওসমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুজ্জামান, আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী ছিলেন এই পত্রিকার নিয়মিত লেখক।

লেখক বইটির সমাপ্তি টেনেছেন সুন্দরবনসংক্রান্ত একটি অধ্যায় দিয়ে। বহু সঙ্গী আর বিরাট বহর নিয়ে সুন্দরবন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বিবৃত হয়েছে এখানে। সুন্দরবন গিয়েও এর ইতিহাস, এই অরণ্য নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা প্রভৃতি বিষয়ে কবির অনুসন্ধিৎসা জেগে ওঠে।

এ গ্রন্থে বর্ণনায় সর্বত্র কালানুক্রমিক রীতি রক্ষিত হয়নি। লেখক অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন-তারিখ হয়তো সচেতনভাবেই এড়িয়ে গিয়েছেন। বইটির ভাষা সহজ-সাবলীল। আবার প্রায়ই পাঠকরা এতে কাব্যিক ভাষার সাধ পায় : ‘ট্রেন ছুটে চলেছে দুরন্ত গতিতে। ত্রাসতাড়িত পাখিরা কুলায় ফেরার পথে। স্টেশনে ঢোকার মুখে লাইন বদলের তীব্র ঝনৎকার। ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে দূরের গ্রামরেখা। দূরে কোথাও ছিটেফোঁটা আলোর বিন্দু দেখা দিয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে। দিনের কলরব থেমে নেমে আসছে রাত নিশুতি।’ পৃ: ১৪]

আকরগ্রন্থ : বেলাল চৌধুরী : নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১০

  • সর্বাধিক পঠিত
  • সর্বশেষ

ই-পেপার

সর্বাধিক পঠিত

  • অাজ
  • সপ্তাহে
  • মাসে